নীরব দর্শক যেন না হই

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

নীরব দর্শক যেন না হই

বর্ষবরণে ছায়ানটের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:০১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

print
নীরব দর্শক যেন না হই

প্রাণের জোয়ারে বিপুল উৎসবে বাঙালি বরণ করে নিয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬। গত রোববার পহেলা বৈশাখের প্রথম সকালে সারা দেশে ঢাক-বাদ্যি, গান ও নৃত্যের চিরায়ত আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব মানুষের মঙ্গল কামনায় আবাহন করা হয় নতুন বছরকে। নববর্ষের প্রধান আয়োজন রাজধানীর রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান থেকে সব অশুভ শক্তি, অমঙ্গল, অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অবিচল হওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে।

সেখানে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেছেন, ‘ওরা অপরাধ করে’-কেবল এ কথা না বলে প্রত্যেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করবার চেষ্টা করি। আর আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায় অত্যাচারের নীরব দর্শকমাত্র হয়ে না থাকি।’ বলেন, ‘প্রতিবাদে প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল-নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে...’

রোববার সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতায়ন ছায়ানট রাজধানীর রমনা বটমূলে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করেছে সম্মেলক কণ্ঠের সংগীতে। সেই সঙ্গে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সব অত্যাচার-অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার শপথ নিয়েছেন সবাই।

যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে প্রাণ হারানো নুসরাতের জন্য যখন ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ, সেই সময় ছায়ানটের বর্ষবরণের কর্মসূচিতে সব সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণের এই আহ্বান এলো।

রমনা বটমূলে বর্ষবরণের কথন পর্বে ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘চোখ মেললে কিংবা কান পাতলে নিত্যই শিশু, নারী, বল-ভরসাহীন মানুষ তথা সমগ্র মানবতার ওপর নির্মম আচরণের সংবাদ, নিয়ত মার খাচ্ছে সমাজের ধারণা। কোথায় যাচ্ছি?...নিষ্কলুষ শিশু সন্তান কোনো সমাজবাসীর অত্যাচারের শিকার হয় কী করে? সমাজ কি পিতামাতা, ভাইবোন, সন্তান-সন্ততির গৃহ আর প্রতিবেশী নিয়ে গঠিত শান্তি নিবাস নয়? বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী অমানুষদের আত্মসুখ সন্ধানের ফলে নির্যাতনের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় না পরিবার। সমাজের কচিকাঁচা থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, সমাজের কোনো মানুষ। কিছু মানুষ কি পাষ- হয়ে উঠল!’

এ অন্যায়ের প্রতিবাদে এবার একাট্টা হওয়ার আহ্বান জানান সন্জীদা খাতুন। সবাইকে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করব, আমাদের ক্ষোভ জানাব, প্রতিবাদ জানাব, দেশে অনাচারের বিরুদ্ধে। ‘নুসরাত জাহান, তনু, সাগর-রুনি, মিতু-যেসব বিষয়ে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো খবর পেলাম না বিচারের, সেসব বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে এবং বিগত প্রাণগুলোর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকব।’ এই নীরব প্রতিবাদ শেষে ছায়ানট সভাপতি বলেন, ‘অত্যাচার অনাচার নিপাত যাক, জয় হোক সত্যের সুন্দরের।’

মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে
সবার সামনে মুখোশের মুখে রাজা আর রানী, মাঝে তাদের প্রজাকুল। বৃক্ষচূড়ায় মা পাখি আর ছানা, ডানা মেলেছে কমলা বরণ পেঁচা। তাদের পিছু পিছু এলো দুই মাথা ঘোড়া, জীবনবৃক্ষ, ষাঁড়, কাঠ ঠোকরা, টেপা পুতুল, বাঘ আর বক। বৈশাখের প্রথম সকালে রাজধানীর রাজপথে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে তারা বললেন, ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবদ্য’ রচনার বাণী থেকে ওই পঙ্ক্তিকে প্রতিপাদ্য করেই রোববার ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। সকালে রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজন শেষ হতে না হতেই চারুকলা অনুষদে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিও সারা হয়ে যায়। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ চলতে থাকায় এ বছর কিছুটা বদলে নেওয়া হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার পথ। সকাল ৯টায় অনুষদের সামনে থেকে শুরু হয় রঙের মিছিল। শাহবাগ মোড়, ঢাকা ক্লাব ঘুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। পরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে শেষ হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

বৈশাখী সাজে সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষের এই শোভাযাত্রায় সামনে- পেছনে ঢাকের বাদ্যের তালে তালে চলে নৃত্য, হাতে হাতে ছিল বড় আকারের বাহারি মুখোশ, শোলার পাখি আর টেপা পুতুল।

১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধী ভাবমূর্তি নিয়ে চারুকলা থেকে শুরু হয় পহেলা বৈশাখের এ আনন্দ শোভাযাত্রা। সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে তা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম পায়। বাঙালির বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’- এর অংশ।

পহেলা বৈশাখের সকাল থেকেই চারুকলা-টিএসসিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জনসমাগম বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজপথ পরিণত হয় বৈশাখের লাল-সাদা জনস্রোতে। গ্রীষ্মের খরতাপ উপেক্ষা করেই বাঙালি মেতে ওঠে উদযাপনে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যে। পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন ও সোয়াতের সদস্যরা অস্ত্র হাতে সামনে-পেছনে গড়ে তোলেন নিরাপত্তাবলয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসির সদস্যরাও ছিলেন তাদের সঙ্গে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য। এর একটি সম্মোহনী শক্তি আছে। মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের এটি একটি পথ। সে কারণে শোভাযাত্রা সব সময় চলমান থাকবে।’
বর্ণিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

গায়ে রঙিন পোশাক, মাথায় ফুলের মুকুট, খোঁপায় বেলি ফুলের মালা-কিশোরী, তরুণীদের এই সাজের সঙ্গে নতুন পাঞ্জাবিতে তরুণের দল। লাল-সাদা পোশাকে প্রাণোচ্ছল এসব নারী-পুরুষের পদচারণায় রোববার রং ছড়িয়েছে ঢাকায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। চারুকলার বকুলতলা, কলাভবনের সামনের বটতলাসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চ করে হয় বর্ষবরণের নানা অনুষ্ঠান।

নতুন বছরের সূর্য উঁকি দিতেই বৈশাখ বরণে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ভিড় করতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন এই উৎসবে। প্রিয়জন ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় কাটান তারা। দুপুর গড়িয়ে রোদ কমার সঙ্গে সঙ্গেই এই ভিড় উপচে পড়ে। বিকালে ক্যাম্পাসের টিএসসি, কলাভবন, অপরাজেয় বাংলা, চারুকলা ও কার্জন হল এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। গ্রামীণ খাদ্য-খাবার বিক্রিতে ব্যস্ত সময় কাটান দোকানিরা। টিএসসির সড়কদ্বীপ বসে বিভিন্ন ধরনের চুড়ির দোকান।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। আয়োজনের মধ্যে ছিল- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে নাটম-লে হয় নাটক, সংগীত ও হিজড়া সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের উদ্যোগে সকাল ৮টায় কলাভবনের সামনের ঐতিহাসিক বটতলায় ‘এসো হে বৈশাখ’ সংগীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষবরণ উৎসব শুরু হয়। উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান উৎসবের উদ্বোধন করেন।

পহেলা বৈশাখ ঘিরে ক্যাম্পাসে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়। ক্যাম্পাসের সড়কগুলোতে বসানো হয় সিসি ক্যামেরা। বিকাল ৫টার পর বহিরাগত সবাইকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করে প্রক্টরিয়াল টিম। ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি ছিল নিষিদ্ধ।

নিরাপত্তার বাড়াবাড়িতে কিছুটা ম্লান উৎসব
পহেলা বৈশাখ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি রকমের নিরাপত্তা বর্ষবরণ উৎসবকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন উৎসবে অংশগ্রহণকারীরা। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা বেরিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, যাতে অংশ নিয়েছেন নানা সাজে সজ্জিত নারী-পুরুষ-শিশুরা। উৎসবের অন্যতম আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রার চতুর্দিকে সোয়াত, ডিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও স্কাউট সদস্যদের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী গোটা আয়োজনের সৌন্দর্য ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে ম্লান করে দিয়েছে বলে জানান অনেকে। কারণ শোভাযাত্রার সামনের অংশে নিরাপত্তা বাহিনীর এমন অবস্থান ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ অনেকের। গতবারের মতো এবারেও শোভাযাত্রায় মুখোশ পরতে বা বেষ্টনীর বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই কড়াকড়ি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শোভাযাত্রায় অংশ নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

সুমাইয়া তাবাসুসম নামের একজন জানান, ‘আগে মঙ্গল শোভাযাত্রায় ভিড়ের কারণে দাঁড়ানোই যেত না। এবার মানুষ অনেক কম। তার চাইতে পুলিশ অনেক বেশি। মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের চাইতে পুলিশের সংখ্যাই বেশি। মনে হচ্ছে, এটা পুলিশের শোভাযাত্রা। এটা দেখেই তো ভয় লাগছে।’

নাদেজা ফাতেমা শিখা নামের একজন বলেন, ‘নিরাপত্তার দরকার আছে। সেই সঙ্গে উৎসবও স্বতঃস্ফূর্ত হতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তা যেন আমাদের উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা, যে আনন্দ, যে উৎসবমুখরতা সেটাকে ম্লান না করে দেয়।