প্রতিবাদীই যখন খুন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯ | ৫ বৈশাখ ১৪২৬

প্রতিবাদীই যখন খুন

রহমান মুফিজ ১১:১২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৯

print
প্রতিবাদীই যখন খুন

প্রতিবাদই যখন মানুষের জীবনে মৃত্যুপরোয়ানা হয়ে আসে তখন প্রতিবাদের স্বাভাবিক ভাষা হারায় দেশ, সমাজ। ক্ষমতার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে দিন-দিন দানবীয় হয়ে ওঠে সামাজিক অবিচার ও সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সে বৃক্ষকে দেয় পুষ্টির জোগান। ফলে অবাধ হয়ে ওঠে অমানুষের রামরাজত্ব। আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলে সাধারণ মানুষ। শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়, থাকে না সামাজিক স্থিতিশীলতা।

গত কয়েক দশকে নানা সামাজিক অবিচার ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেশে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম নয়। দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে তাদের তালিকা। সে তালিকায় সর্বশেষ যোগ হলো নাটোরের লালপুর গোপালপুর পৌরসভার কাউন্সিলর জামিলুর রহমানের নাম। স্থানীয় যুবলীগ কর্মী জাহারুল ইসলাম খুনের বিচার চেয়ে গত রোববার লালপুর উপজেলা পরিষদের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কামারুজ্জামান কমলের ছেলে কাউন্সিলর জামিল। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে বক্তৃতা দেওয়ার একটু পরেই তাকে ঘটনাস্থলে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনা হতবাক করেছে স্থানীয়দের। গণমাধ্যমে এ খবর আসার পর স্তম্ভিত হয়েছেন সারা দেশের মানুষ।

অন্যায়-অবিচার-সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করার কারণেই যদি কোনো মানুষকে জীবন দিতে হয় তাহলে সমাজে সামাজিক নিরাপত্তা কোথায়-এমন প্রশ্নই করেছেন সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্র, সমাজ, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কারণ অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এরকম বহু উদাহরণ উঁকি দিচ্ছে-প্রতিবাদকারী যেখানে খুনের শিকার হয়েছেন আর সে খুনের বিচার হয়নি বছরের পর বছর।

অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই বলছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এ দেশে কথা বলতে গিয়ে খুন হয়েছিলেন কাজী আরেফের মতো জাতীয় নেতা। এ দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যে নেতার রয়েছে বীরত্বপূর্ণ অবদান, যিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসের অন্যতম সদস্য, জাসদের মতো রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, তাকে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা চলাকালে একদল সন্ত্রাসী গুলি চালিয়ে হত্যা করে তাকে। তার সঙ্গে সে দিন শাহাদাত বরণ করেছিলেন তৎকালীন জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরায়েল হোসেন ও শমসের মণ্ডল। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর যদিও কাজী আরেফ হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ২০১৬ সালে।

১৭ বছরে কাজী আরেফ হত্যার বিচার মিলেছিল। কিন্তু ১৬ বছরেও বিচার মেলেনি নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সাব্বির আলম খন্দকার হত্যাকাণ্ডের। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করার কারণে ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ চলাকালীন একটি অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে তিনি প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় সন্ত্রাসীদের তালিকা। তালিকা প্রকাশের জেরে তাকে হত্যা করা হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে নিজের জানাজায় উপস্থিত সবাইকে অগ্রিম আমন্ত্রণও জানিয়ে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার জানাজায় অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমার বক্তব্য শুরু করছি’। এর চার মাস পরই সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন সাব্বির আলম। সাব্বির ছিলেন তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকারের ছোটভাই। তিনি গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার অ্যান্ড ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসেসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক সহসভাপতি। সাব্বির আলম খন্দকারের বড় ভাই তৈমুর আলম খন্দকার বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের তৎকালীন বিএনপির এমপি গিয়াস উদ্দিনসহ ১৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। সে মামলা এখনো চলছে।

নিকট অতীতের কথাও স্মরণ করেছেন অনেকে। কয়েক বছর আগে ইভটিজিংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে বা প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়েছেন অনেকে। এর মধ্যে ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর ছাত্রীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটেদের হামলায় মারা যান নাটোরের কলেজছাত্র মিজানুর রহমান (৩৬)। একই বছর ২৬ অক্টোবর ফরিদপুরের মধুখালীতে মেয়েকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করে বখাটের হাতে নির্মমভাবে খুন হন চাঁপারানী ভৌমিক (৪৮)। দুর্বৃত্তরা তাকে মোটর সাইকেল চাপা দিয়ে মেরেছিল। ওই বছরই ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে খুন হন যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী মামুন হাওলাদার।

২০১৬ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বখাটের হাতে খুন হন শিক্ষক মজিবুর রহমান সর্দার (৬৮)। তার অপরাধ নিজের অষ্টমশ্রেণি পড়ুয়া নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করেছিলেন। গত বছর আগস্টে সাভারে এক কলেজ ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটেদের ছুরিকাঘাতে খুন হন ঢাকা মিরপুর কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী মারুফ খান। একই বছরের ৩ নভেম্বর ছোটবোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় রাজধানীর জুরাইনে দুর্বৃত্তের হামলায় প্রাণ হারান ছাত্রলীগ নেতা তনয় ইসলাম পাভেল।

এভাবেই অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়েছেন আরও অনেকে। প্রতি বছরই এ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের পাশাপাশি ক্ষমতাশালীদের ক্ষমতার হীনচর্চার ক্ষেত্র অবাধ করতে প্রতিবাদী যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হচ্ছে। ক্ষমতার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থাকার কারণে অপরাধের হোতাদের বিচারের আওতায় আনতেও ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। এর ফলে জেঁকে বসেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এতে আরও উৎসাহিত হচ্ছে অন্যায়, সামাজিক অবিচার ও সন্ত্রাস।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সড়ক দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এ স্মরাক ভাস্কর্যকে যে কোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই ও প্রতিবাদের জাজ্বল্যমান প্রেরণা হিসেবে নেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। কারণ ১৯৯২ সালের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবদমান দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে চলা সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদে মিছিল করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মঈন হোসেন রাজু। সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত ৯০-এর দশকে মঈন হোসেন রাজুর আত্মদানের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল শিক্ষাঙ্গনসহ দেশের বিভিন্নপ্রান্তে। সে লড়াইকেই এগিয়ে নিচ্ছেন বিরল প্রতিবাদী মানুষরা। কিন্তু দুর্বৃত্তের ক্ষমতার কাছে তারা বারবার পরাস্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা-এ পরাজয় আর কত?

অপরাধী আইনের আওতায় না আসায় উৎসাহ পায়
ডা. মোহিত কামাল
খুনের ঘটনার প্রতিবাদ করায় খুন হওয়া দুঃখজনক। এ ধরনের অপরাধ যারা করেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা খুন করাকে অপরাধ মনে করে না। অন্য কেউ যখন ভুল ধরিয়ে দেয় তখন সে ওই ব্যক্তিকেও আক্রমণ করে। সাধারণত এ ধরনের কাজ করে মাদকসেবীরা। এছাড়া অপরাধীরা নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে। বিভিন্ন সময়ে অপরাধ করেও তারা আইনের আওতায় আসে না। এ বিষয়গুলো এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেয়। আর একজন খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হলেই তাকে অপরাধী বলা যায় না; আদালতে তার দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরে তাকে অপরাধী বলা যাবে।

লেখক ও মনোশিক্ষাবিদ

 

সমাজ নির্মমতার দিকে ধাবিত হচ্ছে
মাহফুজুল হক মারজান

আমাদের পারিবারিক বন্ধন কমে যাচ্ছে। চিরায়ত সমাজ ব্যবস্থা থেকে নতুন সমাজ ব্যবস্থার দিকে আমরা যাচ্ছি। সমাজ যখন একটি অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানের দিকে যায় তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু বড় চিন্তার বিষয় হচ্ছে, আমরা যখন আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করব, তখন সমাজ নির্মমতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ বিষয়ে চিন্তা থেকেই যায়। সুতরাং এ বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। সমাজকে এ নির্মমতা থেকে দূরে রাখতে পরিবারকে সব থেকে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও শিক্ষার্থীদের এই নির্মমতা সম্পর্কে জানাতে হবে।

শিক্ষক, ঢাবি