ভোটারের চোখ ইশতেহারে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

ভোটারের চোখ ইশতেহারে

কুন্তল দে ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৮

print
ভোটারের চোখ ইশতেহারে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আর ১২ দিন। বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও হামলার ঘটনা বাদে এখন রাজনৈতিক দলগুলো পুরোদমে প্রচারণার মাঠে। প্রার্থী ও সমর্থকরা ঘুরছেন ভোটারের দ্বারে দ্বারে। ভোট প্রার্থনা ও দোয়া চাওয়ার পাশাপাশি তারা ভোটারদের কাছে নানা রকম অঙ্গীকার করছেন। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণসংহতি আন্দোলনসহ কয়েকটি দল ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এসব ইশতেহারের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে ভোটারদের মূল আগ্রহের জায়গা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার নিয়ে। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার। এর এক দিন পরই আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থায় ইশতেহারের গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে কী কী করবে, রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় কি কি পরিবর্তন আনবে তা লিপিবদ্ধ থাকে ইশতেহারে। সেটার ওপর ভিত্তি করেই ভোটাররা কোন কোন প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে কাকে ভোট দেবেন তা নির্ধারণ করেন। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারের ওপর কম গুরুত্ব দেয়। ক্ষমতায় গিয়ে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের হারও কম। এরপরও কোন আসনে কাকে কোন দলের প্রার্থী করা হলো এ আগ্রহের পর ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় কৌতূহলের জায়গা ইশতেহারে দলগুলো কি কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেটার দিকে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহারে কিছুটা চমক দেখিয়েছে জাতীয় পার্টি। ‘গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮ দফা অঙ্গীকার নিয়ে এ ইশতেহার প্রকাশ করে দলটি। আট বিভাগকে আট প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসন প্রবর্তন ও দুই স্তরবিশিষ্ট সরকার গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবারের নির্বাচনে মহাজোটের কাছে ২৬ আসন পাওয়া জাতীয় পার্টি।
এবারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবার আগে ইশতেহার প্রকাশ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। ‘ভিশন মুক্তিযুদ্ধ-৭১’ শিরোনামে সিপিবি ৩০টি দফা ও ১৫১টি উপ-দফায় তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বর্ণনা করে। ইশতেহারে দলটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংবিধান, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের কথাও বলে এবারের নির্বাচনে ৮২ আসনে প্রার্থী দেওয়া বামপন্থী এ দলটি।
গণসংহতি আন্দোলন তাদের ইশতেহারে ভয়মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। এ জন্য প্রতিটি নাগরিকের জীবন-সম্পদ ও মর্যাদার সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। গুম-খুন-নিপীড়নের ঘটনার তদন্ত ও বিচারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে গণসংহতির ইশতেহারে।
বিএনপিপ্রধান জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহার প্রকাশ করবে আজ। রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে বেলা ১১টায় এ ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে গত অক্টোবর মাসে গঠিত হয় পরস্পর বিপরীত মতাদর্শের দল নিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্ট। গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে ৩৩টি বিষয়ভিত্তিক ইশতেহার ঘোষণা করবেন তারা। এ ইশতেহারে বিএনপির ‘ভিশন-২০৩০’ থেকেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্রে রেখে এ ইশতেহারের স্লোগান থাকছে ‘জনগণের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দাও’।
জানা গেছে, ইশতেহারে তরুণদের কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা থাকবে না, সরকারি চাকরিতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ছাড়া কোনো কোটা থাকবে না। এ ছাড়া ত্রিশোর্ধ্ব শিক্ষিত বেকারের জন্য বয়স্কভাতা চালুর প্রতিশ্রুতিও রাখছে জোটটি।
ঐক্যফ্রন্ট তাদের ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্তিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। দুদককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তারা দিচ্ছেন। এ ছাড়া  দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারে সরকারের অনুমতি বাতিল করার কথাও বলা হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করা হবে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতিও থাকছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে।
ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধানের ১১৫, ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিম্ন আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নিয়ে আসা, সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী না থাকা, বিরোধী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও সম্পৃক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে এ ইশতেহারে।
ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গিবাদ, কৃষি-কৃষক, নারী, প্রবাসীসহ মোট ৩৩টি বিষয়ে ভোটারদের কাছে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট।
টানা দুই দফা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহার প্রকাশ করবে আগামীকাল। উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্তি ও তরুণদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবারের ইশতেহারে। সাত অধ্যায়ে ভাগ করা ৬৪ পৃষ্ঠার ইশতেহারে ২১টি অঙ্গীকার রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আগামীকাল ১০টায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে এ ইশতেহার তুলে ধরবেন। ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ স্লোগান সংবলিত ইশতেহারে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় তরুণদের সম্পৃক্ত করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের ভিশন তুলে ধরা হয়েছে।
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনে বছর দুটি নিয়ে আওয়ামী লীগের বিশেষ পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে ইশতেহারে।
জানা গেছে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বিষয়গুলোকে মোট ৭টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দুই ভাগে অঙ্গীকার ও পটভূমি, তৃতীয় ভাগে থাকছে আওয়ামী লীগ সরকারের গত দুই মেয়াদের সাফল্যের চিত্র। চতুর্থ ভাগে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান গত ১০ বছরে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা স্থান পেয়েছে। এরপর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এরপর ওপরের ছয় অধ্যায়ের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে জাতির কাছে নৌকায় ভোট চেয়ে আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ইশতেহার।
ইশতেহারের অঙ্গীকারনামায় স্বাধীন বাংলাদের নির্মাতা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উদ্ধৃতিকে প্রতিপাদ্য করা হয়েছে- ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’
উন্নয়নের এ ইশতেহারে ২১টি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। এগুলো হলো আমার গ্রাম-আমার শহর: প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ; তারুণ্যের শক্তি-বাংলাদেশের সমৃদ্ধি : তরুণ-যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ; নারীর ক্ষমতায়ন; লিঙ্গ সমতা ও শিশু কল্যাণ; পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা; সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ নির্মূল; মেগা প্রজেক্টসমূহের দ্রæত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন; গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা; সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি; দারিদ্র্য নির্মূল; সর্বস্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি; সর্বস্তরে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; সার্বিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার; আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা; দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন; ব্লু-ইকোনমি তথা সমুদ্র সম্পদ উন্নয়ন; নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা; প্রবাসী কল্যাণ কর্মসূচি এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।