সব সমীকরণ জয়ের

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

সব সমীকরণ জয়ের

রহমান মুফিজ ১০:৫০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮

print
সব সমীকরণ জয়ের

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা পুরোদমে শুরু হয়েছে গত সোমবার থেকে। এবারের নির্বাচনে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ মোট ৩৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট, বিএনপিনির্ভর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট এবং সিপিবি নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোট নির্বাচনের মাঠে রয়েছে। নির্বাচনে জয় ও প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিটি দল ও জোটের রয়েছে নিজস্ব সমীকরণ। এ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতা হচ্ছে প্রধান দুই জোট-মহাজোট এবং ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে। মহাজোট ও ১৪ দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি ও জেপি ছাড়া অন্য দলগুলো আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক ‘নৌকা’ নিয়ে নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছে। একইভাবে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলে দুজন প্রার্থী ছাড়া প্রত্যেকেরই নির্বাচনী প্রতীক বিএনপির ‘ধানের শীষ’।

আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচন করছে ২৫৮টি আসনে। মহাজোট শরিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয় ২৬টি আসন। এর বাইরে ৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির যৌথ প্রার্থী রয়েছেন। ১৪ দলীয় শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য ছাড়া হয় ৫টি, ইনু নেতৃত্বাধীন জাসদের জন্য ৩টি, জাতীয় পার্টির (জেপি) জন্য ২টি, তরিকত ফেডারেশনের জন্য ২টি, আম্বিয়া নেতৃত্বাধীন জাসদের জন্য ১টি আসন ছাড় দেওয়া হয়েছে। মহাজোটের নতুন শরিক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট পেয়েছে ৩টি আসন।
শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়ায় ২৯ আসনের বাইরে ১৩২ আসনে উন্মুক্ত প্রার্থী দিয়েছে জাপা। জাতীয় পার্টির নেতারা চূড়ান্ত মনোনয়নের দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আওয়ামী লীগ প্রথমদিকে জাতীয় পার্টির জন্য ৪০ থেকে ৪২ আসন ছাড় দেবে বলে মনস্থ করলেও পরে সে অবস্থান থেকে সরে আসে। এ জন্য জাতীয় পার্টি অসন্তোষও প্রকাশ করেছে। তবে মহাজোটের সিদ্ধান্ত মেনে তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবে বলে জানিয়েছে।
ভোটের রাজনীতিতে তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি জাতীয় পার্টি। এ দলটি ভোটের মাঠে এবং জোট রাজনীতিতে ‘ফ্যাক্টর’ হয়েই রয়েছে প্রায় তিন দশক। ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আছে তারা। সেই থেকে ক্ষমতার রাজনীতিতে একচ্ছত্র রয়েছে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট। এবারের নির্বাচনেও শেষ পর্যন্ত নানা সমীকরণ জাপাকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করেছে। আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই বলে আসছিল জাপার জন্য ৪০ থেকে ৪২ আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে কিন্তু শেষ মুহূর্তে ছাড় দিয়েছে ২৬ আসন। সূত্র বলছে, যেখানে শরিকদের শক্তি আছে সেখানে তারা নিজেদের প্রার্থী দিতে পারবে। আওয়ামী লীগ এসব আসনকে ‘উন্মুক্ত আসন’ হিসেবেই বিবেচনা করছে। এসব আসন থেকে যারাই জয়ী হয়ে আসবেন তাদেরই জোটের প্রার্থী হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। যদিও জাপার উন্মুক্ত ১৩২ আসনের প্রার্থী আওয়ামী লীগের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
আরেকটি সূত্র বলছে, জাপা যে আসনগুলোতে উন্মুক্ত প্রার্থী দিয়েছে তাতে তাদের তেমন একটা ভোট নেই। এমনকি অন্য শরিীকদেরও ভোটের হার খুব কম। ফলে ‘উন্মুক্ত আসন’ নিয়ে আওয়ামী লীগের বাড়তি মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই। গত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাপা ৩৪ আসন পেয়েছিল। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে। ফলে যে ২৬ আসন জাপাকে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর কয়েকটিতে ‘লাঙ্গল’ মার্কা নিয়ে জিতে আসা দুরুহ হয়ে উঠতে পারে।
অপর একটি সূত্র বলছে জাপাকে দিয়ে ১৩২ আসনে উন্মুক্ত প্রার্থী রেখে মূলত নির্বাচনের ‘আপদকালীন’ সময় মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ বা মহাজোট। শেষ সময়ে এসে যদি কোনো কারণে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় সে সময় কোনো আসনে যেন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন না হয় সেজন্য ‘রেডিমেড’ প্রার্থী রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ শুধু নির্বাচনে জয়লাভই নয়, যে কোনো মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জেও জয়লাভ করতে চায়। তাই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
অপরদিকে নিজেদের জন্য ২৪২ আসন রেখে শরিকদের জন্য বিএনপি ছাড় দিয়েছে ৫৮ আসন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামকে ৭টি, জেএসডিকে ৪টি, নাগরিক ঐক্যকে ৪টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকে ৪টি আসন ছেড়ে দিয়েছে তারা। ঐক্যফ্রন্টের মোট ১৯ জন প্রার্থী লড়বেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে। এর বাইরে ২০ দলীয় জোট শরিকদের মধ্যে এলডিপিকে ৫টি, খেলাফত মজলিশকে ২টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ৩টি, জাতীয় পার্টিকে (কাজী জাফর) ২টি, বিজেপিকে ১টি, কল্যাণ পার্টিকে ১টি, এনপিপিকে ১টি, লেবার পার্টিকে ১টি, পিপিবিকে ১টি করে আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এদের মধ্যে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমেদ ছাড়া বাকি ১৬ জনই ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন। সব মিলিয়ে ২৯৮টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক থাকছে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী দলগুলোর।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি নেবে না এমন এক অনিশ্চয়তা ছিল গত অক্টোবর মাস পর্যন্ত। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়ে বিএনপি নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই নির্বাচনের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দুর্নীতি মামলায় সাজা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যখন কারান্তরীণ তখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যফ্রন্টই বিএনপিকে নির্বাচনের ধারায় ফিরিয়ে আনে। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এখন ড. কামালই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রধান নেতা বলে মানছেন বিএনপিসহ অন্য শরিক ও মিত্ররা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের দীর্ঘ ১০ বছরে শাসনামলের নানা সমালোচনায় সক্রিয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভোটারদের ব্যাপক জনসমর্থন পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গে একসঙ্গে জোট গড়ায় সমালোচনার মুখেও পড়ছে ঐক্যফ্রন্ট। অবশ্য জয়ের সমীকরণ মেলাতে গিয়েই জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছাড়া বেঁধেছেন কামাল হোসেনরা।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, ২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে মহাজোট একতরফা জিতে এসেছে বটে কিন্তু জনসমর্থন পায়নি। বিশেষ করে উন্নয়নের নামে মহাজোট সরকারের অব্যাহত লুটপাট, খুন-গুম, বিরোধী মত ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমনপীড়ন সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে চায়। এ জন্য বিএনপির নেতৃত্বের বাইরে একটি বড়সড় জোটের প্রত্যাশা ছিল সরকারবিরোধী শিবিরে। ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সে কৌশলে সফল হয়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের বাইরে সিপিবি নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক জোট অংশগ্রহণ করছে নির্বাচনে। তারা ১৩১টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে সিপিবির কাস্তে প্রতীকে ৭৪ জন, বাসদের মই প্রতীকে ৪৫ জন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকে ২৮ জন প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। ১৩১ আসনের বাইরে ১৪টি আসনে এ জোটের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। জোট সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনে তারা একটি বিকল্প শক্তির জানান দিতে চায়। ভোটের মাঠে প্রভাবক শক্তি না হলেও নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ নির্বাচন বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।