কী হচ্ছে কী চাই

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

অরিত্রির আত্মহত্যায় ‘বিব্রত’ ভিকারুননিসা

কী হচ্ছে কী চাই

রহমান মুফিজ ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

print
কী হচ্ছে কী চাই

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবারও বিক্ষোভ করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখা ও শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। গভর্নিং বড়ি ও অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং অরিত্রিকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে অধ্যক্ষের শাস্তি নিশ্চিত করাসহ ছয় দফা দাবি নিয়ে বেইলি রোড শাখার প্রধান ফটকে সকাল থেকেই তারা অবস্থান নেয়। তবে দাবি মেনে নেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষকদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকালে কর্মসূচি স্থগিত করে ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অরিত্রিকে আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। বুধবার রাত ১১টার দিকে উত্তরা এলাকা থেকে তাকে প্রেপ্তার করা হয়। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সাঈদ ওই শিক্ষকের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে নেওয়ার আদেশ দেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অরিত্রির বাবা-মায়ের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার। গতকাল সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়ে তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, তিনি পদত্যাগেও রাজি আছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে আমার পদত্যাগের প্রয়োজন হলে আমি করব।’

এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর ছয় দফা দাবি সংবলিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ১. অধ্যক্ষের পদত্যাগ এবং ৩০৫ ও ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে অধ্যক্ষের শাস্তি নিশ্চিত করা, ২. প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মানসিক স্বাস্থ্যের বিবেচনা করে আলাদা যত্ন নিতে হবে। কোনোভাবেই শারীরিক ও মানসিক চাপ ও অত্যাচার করা যাবে না। ৩. কথায় কথায় বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া বন্ধ করে অন্যায় ডিটেনশন পলিসি বন্ধ করতে হবে। ৪. বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং কর্মরত সবার মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে মানসিক পরামর্শদাতা থাকতে হবে। শৃঙ্খলাভঙ্গকারী শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে হবে। ৫. গভর্নিং বডির সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। ৬. অরিত্রির মা-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্য অধ্যক্ষ ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

পরীক্ষার হলে মোবাইল নেওয়ার অপরাধে ভিকারুননিসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর বাবা-মাকে গত সোমবার স্কুলে ডেকে নিয়ে নানাভাবে অপমান করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অরিত্রির পরিবার থেকে দাবি করা হয়, গত রোববার স্কুলে পরীক্ষা চলাকালে অরিত্রির কাছে মোবাইল ফোন পাওয়ার পর তাকে আর পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি। পরদিন তার বাবা-মাকে নিয়ে আসতে বলে। অরিত্রি সোমবার বাবা-মাকে নিয়ে স্কুলে গেলে অধ্যক্ষের কক্ষে বিভিন্নভাবে তাদের অপমান করা হয় এবং অরিত্রিকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর অরিত্রি বাসায় এসে নিজের কক্ষের দরজা লাগিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেন।

সোমবার থেকে এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরাও। সোমবার থেকে তারা নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল। তাদের প্রতিবাদের মুখে নড়েচড়ে বসে পুরো শিক্ষা প্রশাসন। গত বুধবারই প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, স্কুলের বেইলি রোড শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক জিনাত আরা এবং শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই তিন শিক্ষকের এমপিও বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনায় ‘প্ররোচনার প্রমাণ’ পেয়েছে।

এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে র‌্যাব ও পুলিশকে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তারই জের ধরে বুধবার রাতে শিক্ষক হাসনা হেনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছে, আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে অধ্যক্ষকেও গ্রেপ্তার করতে হবে।

অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনাকে ‘হত্যা’ দাবি করে গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে তৃতীয় দিনের মতো বেইলি রোডে স্কুলের মূল শাখার ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে বুধবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিকারুননিসার সব শাখার ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। তবে গতকাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি স্থগিত করে ক্লাস-পরীক্ষায় ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র আনুশকা রায় শিক্ষকদের সঙ্গে টানা তিন ঘণ্টা বৈঠক শেষ করে এসে বিকাল ৫টার দিকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষকরা আমাদের ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ছয় দফার মধ্যে ১ ও ৫নং স্কুল আইনের বাইরে থাকায় সেগুলো স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষে মানা সম্ভব না। তবে বাকি সব দাবি মেনে নেওয়ায় আমরা কাল থেকে ক্লাসে ফিরে যাব।’

এদিকে বৈঠক থেকে বের হয়ে এক শিক্ষার্থীকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, আমরা অধ্যক্ষের পদত্যাগ, তাকে গ্রেপ্তার এবং পুরো গভর্নিং বডির পদত্যাগ চেয়েছিলাম। বৈঠকে কি সিদ্ধান্ত হয়েছে আমরা জানি না। তবে এখনো পর্যন্ত গভর্নিং বডির কাউকে পদত্যাগ করতে দেখা যায়নি। ভিকারুননিসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে-সে ধরনের শঙ্কায় আছি। যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নাও নেওয়া হয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের ওপর মানসিক নিপীড়ন চালানোর আশঙ্কাও রয়েছে। তবে আমরা দাবি জানিয়েছি, আন্দোলনরত কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

প্রতিষ্ঠানটির এক অভিভাবক বলেন, এটা আমাদের জন্য লজ্জার এবং একই সঙ্গে বিব্রতকর। আমার সন্তান এখানে পড়ে। তার ভবিষ্যৎও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ স্কুলের মানসম্মান যা ছিল তা ইতোমধ্যেই ক্ষুণ্ন হয়েছে। একের পর এক ঘটনা স্কুলটির অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত দেখিয়েছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার আজকের ঘটনা নয়। অরিত্রির আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে উঠে এলো।

কারাগারে ভিকারুননিসার শিক্ষক হাসনা হেনা
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রির আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনা। তাকে গতকাল বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সাঈদ এ শিক্ষকের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে নেওয়ার আদেশ দেন।

গত বুধবার রাত ১১টার দিকে উত্তরা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এরপর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক কামরুল হাসান তালুকদার। অপরদিকে তার জামিন চেয়ে আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জামিনের বিরোধিতা করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, জামিন পেলে পলাতক হয়ে মামলার তদন্তে তিনি বিঘ্ন সৃষ্টি করবেন। হাসনা হেনা পালিয়ে উত্তরার একটি হোটেলে আত্মগোপন করে ছিলেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাতি শাখার প্রধান জিনাত আখতার এবং অরিত্রির শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনার বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাতে পল্টন থানায় মামলা করেন অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারী।