বিদ্রোহীতেই বিপদ

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫

বিদ্রোহীতেই বিপদ

কুন্তল দে ১১:০৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

print
বিদ্রোহীতেই বিপদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোকে। উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ হলেও দলগুলোর সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে আসনপ্রতি গড়ে ১৪-১৫ জন নির্বাচনে আগ্রহী। তাদের মধ্যে অন্তত ৩-৪ জন প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়েও রয়েছেন। নির্বাচনী এলাকায় তাদের প্রভাব, জনপ্রিয়তা ও কর্মী-সমর্থক গোষ্ঠীও রয়েছেন। অনেক আগে থেকেই তারা প্রচারণাও শুরু করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক আসনে তো একজন প্রার্থীকেই দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

এর বাইরে জোটগত নির্বাচন হওয়ায় প্রধান দুই দলকেই শরিক ও মিত্র দলগুলোর জন্য বেশ কিছু আসন ছেড়ে দিতে হবে। এ অবস্থায় যারা মনোনয়নবঞ্চিত হবেন তাদের অনেকেই হতে পারেন বিদ্রোহী প্রার্থী। শেষ পর্যন্ত তাদের থামানো না গেলে বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিপদ হয়ে উঠতে পারে ভোটের ফলাফলের ক্ষেত্রে। যদিও দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি করা হচ্ছে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা নির্বাচন করে জিতে এসেছেন তাদের বিরুদ্ধে অতীতে কঠোর হওয়ার নজির খুব একটা নেই। বরং পরবর্তী সময়ে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে দল থেকে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার পর্ব চলছে। কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে প্রার্থী তালিকা। এবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে দলের সংখ্যাও বেড়েছে। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসায় এবার মহাজোটের মাধ্যমে নির্বাচন করবে দলটি। ১৪ দল, জাতীয় পার্টির বাইরে এবার যুক্তফ্রন্ট ও ইসলামপন্থী কয়েকটি দলও যুক্ত হচ্ছে আওয়ামী বলয়ে। শরিক ও মিত্র দলগুলোর জন্য বেশকিছু আসন ছাড়তে হবে দলটিকে। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, কমপক্ষে ৭৫টি আসন এবার শরিক ও মিত্রদের ছেড়ে দিতে পারে দলটি।

এর অর্থ প্রতি চারটি আসনের একটিই ছেড়ে দিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এসব আসনে আওয়ামী লীগেরই কয়েকজন করে মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। তাদের অনেকেই আগে থেকেই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা শুরু করেছেন। এসব আসনে শরিক বা মিত্র থেকেও দাঁড়ালেও মূল ভোটব্যাংক আওয়ামী লীগেরই। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও চাইছেন দলের থেকে কেউ এমপি প্রার্থী হোক। তারা মনে করছেন অন্য দল থেকে এমপি নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নানাভাবে বঞ্চিতও হতে হয়েছে।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভও আছে। এবারের নির্বাচনে মিত্র-শরিকদের ভাগ করে দেওয়া আসনগুলোর বেশ কয়েকটিতে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর ভোট। মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর। বাছাই ২ ডিসেম্বর ও প্রত্যাহার ৯ ডিসেম্বর। প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন প্রায় ৪ হাজার নেতা। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার পর্ব চলছে দলটিতে। এতজনের মাঝে প্রার্থী ‘বাছাই করা কঠিন কাজ’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে গত পরশু গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার পর্বে, যারা বিদ্রোহী হতে পারে তাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হবে।’ শেখ হাসিনা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে ছোট নেতা, বড় নেতা দেখা হবে না। জরিপে যারা এগিয়ে থাকবে তাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বরাবর সোচ্চার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেন, জনমত জরিপে যারা এগিয়ে তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে তার জন্য কাজ করতে হবে।

দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে যতই হুঁশিয়ারি দেওয়া হোক এবারের নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোগাতে পারে আওয়ামী লীগকে। বিশেষ করে শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন কেউ কেউ। তারা মনে করছেন, বিদ্রোহ করে যদি জিতে আসা যায় সে ক্ষেত্রে দল তাদের কাছে টেনে নেবে। নজির হিসেবে তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনের উদাহরণ টানছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ১৩ জন বিদ্রোহী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি না আসায় ‘একতরফা’ ওই নির্বাচনে জাফর উল্লাহ, মোস্তফা জামালের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা বিদ্রোহীদের কাছে ধরাশায়ী হন। দলীয় হাইকমান্ডের হুঁশিয়ারির পরও তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হন। পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দশম সংসদে তারা আওয়ামী লীগের এমপি হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম করেছেন।

গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন, জেলা-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি ছিল আওয়ামী লীগে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচিতও হয়েছেন। আবার বিদ্রোহীদের কারণেই অনেক জায়গাতে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এসব ক্ষেত্রেও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের পরও কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি দলটির পক্ষ থেকে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, গত নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। এবারের নির্বাচনে শিথিলতার কোনো অবকাশ নেই। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা সে দল থেকে হোক আর জোট থেকে হোক-সবাইকে তার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যারা মনোনয়নবঞ্চিত হবেন তাদের দলে নানাভাবে অ্যাকোমোডেশন করা হবে। ক্ষোভ-বঞ্চনা উপেক্ষা করে দলকে জেতাতে হবে। এরপরও কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে আওয়ামী লীগের দরজা। যে কোনো মূল্যেই বিদ্রোহীদের বিবাদ থামাতে মরিয়া তারা।

জোট ঐক্য দলে ত্রিশঙ্কু বিএনপি
দশ বছর পর নির্বাচনে এসেছে বিএনপি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিলেন তারা। গত কয়েক বছরে বিএনপি নেতাকর্মীরা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেও নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্তের পর ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে দলে। গত রোববার থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে শুরু হয়েছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি। চলবে আজ পর্যন্ত। প্রথম দুদিনে পঁচিশশর বেশি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে। তৃতীয় দিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর কিছুটা ভাটা পড়লেও ধারণা করা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত চার হাজারের কাছাকাছি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হতে পারে।

নির্বাচন ঘিরে সারা দেশেই বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে বেশ চাঙাভাব বিরাজ করছে। টানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন তারা। গড়ে প্রতি আসনে ১৫-১৬ জন প্রার্থী বিএনপির পক্ষ থেকেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর পর আবার এবারের নির্বাচনে দুই জোট রয়েছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছে বিএনপি। আর গত অক্টোবর মাসে সাত দফা দাবিতে ঐক্যজোটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারা। নিজ দল, জোট ও ঐক্য- এ তিনের মধ্যে আসন ভাগাভাগির সমীকরণে ত্রিশঙ্কু দশা বিএনপিতে।

২০ দলীয় জোটের সবচেয়ে বড় শরিক জামায়াত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিবন্ধন হারানোয় এবার দলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না তারা। তবে দলটির নেতারা ধানের শীষ অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চায়। বিএনপির কাছে কমপক্ষে ৪৫টি আসন তারা দাবি করেছে। জোটের অন্য দলগুলোও ৪০-টির মতো আসন দাবি করেছে। দরকষাকষিতে জামায়াতের সঙ্গে মিললে তারা ধানের শীষ প্রতীকেই নির্বাচন করবে, না মিললে জামায়াতের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটে যাবে।

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবে। এই জোটের দলগুলো শতাধিক আসন দাবি করেছে বিএনপির কাছে। শেষ পর্যন্ত দরকষাকষিতে তাদের জন্য কতগুলো আসন ছাড়তে হয় তা নিয়ে দুশ্চিন্তাতে রয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

এর বাইরে প্রতি আসনেই বিএনপির কয়েকজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। গতবার নির্বাচন করতে না পারায় এবার তারা নির্বাচনে যেতে মরিয়া। জোট ও ঐক্যকে বেশ কিছু আসন ছেড়ে দিলে বঞ্চিত হবেন অনেক ত্যাগী নেতা। এ ক্ষেত্রে তারা বিদ্রোহী প্রার্থীও হতে পারেন। ক্ষমতাসীনদের চাপে থাকা বিএনপির সে ক্ষেত্রে বাড়তে পারে নতুন বিপদ।