ফিরতে অনিচ্ছুকদের পলায়ন

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জটিলতা বাড়ছে

ফিরতে অনিচ্ছুকদের পলায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

print
ফিরতে অনিচ্ছুকদের পলায়ন

বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তাদের অনিচ্ছার মুখে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। প্রত্যাবাসনের মুখে তারা ‘যাবো না, যাবো না’- বলে স্লোগান দেয়। এ সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত ইংরেজিতে লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে সংশ্লিষ্টরা। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তাদের ফেরত পাঠাবে না।

গত বছরের আগস্টে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক দমনপীড়নের মুখে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে ধাপে ধাপে পালিয়ে আসে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার ধকল পোহাচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন করে আসা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে দফায় দফায় সমঝোতা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। নানা বাহানায় দেশটি সময়ক্ষেপণ করেছে। আন্তর্জাতিক চাপে শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দেশটি সম্মত হলেও আপত্তি জানাচ্ছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারাই। তারা দাবি করছে, বাসোপযোগী ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। এ দাবিতে রোহিঙ্গারা স্বদেশে না ফেরার দাবিতে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে টেকনাফের উনচিপাং এলাকার ২২ নম্বর ক্যাম্পে জড়ো করার পর তারা না যাওয়ার কথা জানিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ওই ক্যাম্প থেকে আগামী তিন দিনে প্রত্যাবাসিত হওয়ার জন্য ২৯৮ জন রোহিঙ্গার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের জানানো হয়, তাদের জন্য অন্তত তিন দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিসহ বাসে করে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে তাদের নিরাপত্তার বিষয়ও। সংশ্লিষ্টরা রোহিঙ্গাদের বাসে ওঠার আহ্বান জানালে তারা আঞ্চলিক ভাষায় ন যাইয়ুম (যাবো না) বলে স্লোগান দেয়। এ সময়ে প্রদর্শিত প্ল্যাকার্ডে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ তুলে ধরা হয় পাঁচ দফা দাবি।

প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকাভুক্ত ছিল শরণার্থী ক্যাম্পের ১৬টি পরিবার। কিন্তু গতকাল সেই সব পরিবারের অধিকাংশের ঘর তালাবন্ধ অবস্থায় দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ‘জোরপূর্বক’ প্রত্যাবাসিত হওয়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা পালিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অনিশ্চয়তায় প্রত্যাবাসিত হওয়ার ভয়ে পালাচ্ছেন তারা।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ও পুনর্বাসন কমিশনার আবুল কালাম জানান, তারা সবরকম প্রস্তুতি নিয়েছিলেন; কিন্তু জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতিবেদন মোতাবেক রোহিঙ্গাদের পাঠানো তাদের অনুকূলে নেই। গত বুধবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানায়। তখনো রোহিঙ্গারা জানায়, বর্তমান অবস্থায় ফিরতে চায় না তারা। ফেরার আগে তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিশ্চিতের ওপর জোর দেয়।

গত মাসের শেষে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের পর জানানো হয়, নভেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, সত্বর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে বিবৃতি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি হবে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সংস্থাটির শরণার্থী অধিকারবিষয়ক পরিচালক বিল ফ্রেলিক বলেছেন, রোহিঙ্গাদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাবে। শরণার্থী শিবিরে সেনা মোতায়েন করার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, ভীত রোহিঙ্গা সম্প্রদায় প্রত্যাবাসনে আগ্রহী নয়।

উল্লেখ্য, গত মাসের শেষে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি করা জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের তৃতীয় দফা বৈঠকের পর ঠিক হয় চলতি মাসের মাঝামাঝি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হবে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে অস্থায়ী ক্যাম্পে ১৫০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে প্রত্যাবাসিত করা হবে। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ দুটি অস্থায়ী প্রত্যাবাসন ক্যাম্পও তৈরি করেছে। রোহিঙ্গারা আশঙ্কা করছেন, ফেরার পর তাদের আটক করে রাখা হবে।

অন্যদিকে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে তংপিয়ং লেটওয়া এলাকার অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন মিয়ানমারের অভিবাসন কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং চিকিৎসকরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, তারা প্রতিদিন শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছেন।