নিম্ন-মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

নিম্ন-মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস

প্রীতম সাহা সুদীপ
🕐 ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২২

নিম্ন-মধ্যবিত্তের হাঁসফাঁস

জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পর চাল, মাছ-মাংস, শাক-সবজি, ডিমসহ দূরের পথে পরিবহন করতে হয় এরকম সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বেড়েছে চাকরিজীবীদের যাতায়াত ভাড়াও। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে সাধারণ মানুষের। সব মিলিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে।

গতকাল বুধবার ঢাকা শহরের কয়েকটি বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দোকানে দোকানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে আলোচনা করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ক্রেতারা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির আকস্মিক চাপে খরচের খাতায় ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পরিমাণের চেয়ে অনেক কম পণ্য কিনেও আয় আর খরচের হিসেব মেলানো যাচ্ছে না। বেড়েই যাচ্ছে ঋণের বোঝা। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে। এখানে তাদের কিছুই করার নেই।

জ্বালানির তেলের উত্তাপ সবজির বাজারে : কারওয়ানবাজার, শ্যামবাজার, সূত্রাপুর বাজার, রায় সাহেব বাজারসহ রাজধানীর ব্যস্ততম কয়েকটি বাজারে ঘুরে দেখা গেছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। গত কয়েক দিনে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে বিভিন্ন সবজির দাম।

বাজারে এক কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, যা আগে ছিল ১২০-১৪০ টাকা। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বেড়ে পাকা টমেটো এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা। বরবটি ৭০-৮০ টাকা, বেগুন-কাকরোল ও শসা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকা কেজি। কাঁচা পেঁপে ২৫-৩০ টাকা, পটল ৪০-৫০ টাকা, করলা ৬০-৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আর কচুর লতি, ঝিঙে, চিচিঙ্গার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এসব সবজিই গত কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সবজির এমন দাম বাড়ার বিষয়ে শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী মো. রিপন বলেন, আড়তে সব সবজির দাম বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণেই সবজির বেড়েছে। কারণ এখন সবজি পরিবহনে ব্যাপারীদের প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তেলের দাম না বাড়লে, এখন কিছু সবজির দাম কমতো।

সবজি কিনতে আসা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। জিনিসপত্রের দাম অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। একশ টাকা দিয়ে দু-বেলার সবজি কেনাই কঠিন হয়ে গেছে। চাল, তেলের দাম তো অনেক আগে থেকেই বাড়তি, আবার বাড়ছে। এভাবে সবকিছুর দাম বাড়লে আমাদের পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।

কাঁচা মরিচের কেজি ৩২০ টাকা : রাজধানীর বেশ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল ভালো মানের এক কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩২০ টাকা। কালো ধরনের (একটু নিম্নমানের) কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকা কেজিতে। একদিন আগেও এই মানের কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়।

কাঁচা মরিচের পাইকারি দাম জানতে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে ভালো মানের কাঁচা মরিচের পাল্লা বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়। এই মরিচ গতকাল বিক্রি হয়েছিল ৯৪০ টাকায়। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে পাল্লা প্রতি দাম বেড়েছে ২৬০ টাকা।

অন্যদিকে কালো জাতের কাঁচা মরিচ আজ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা পাল্লা। এই মরিচ আগের দিন বিক্রি হয়েছিল ৮৮০ টাকা পাল্লায়। অর্থাৎ পাইকারি বাজারে পাল্লা প্রতি দাম বেড়েছে ২২০ টাকা। দামবৃদ্ধির বিষয়ে মো. হান্নান নামে এক আড়ৎদা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। একইসঙ্গে মহরমের ছুটির কারণে মরিচ আমদানি কমেছে। এই কারণে দাম আরেক দফা বেড়েছে।

মুরগি-ডিমের বাজারও চড়া : মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করছেন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজিতে। আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৭০-৩০০ টাকায়। অথচ গত শুক্রবার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করেন ১৬০ টাকা কেজি। আর সোনালী মুরগি ছিল ২৫০-২৬০ টাকা। এ হিসেবে তিনদিনের ব্যবধানে মুরগির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে গেছে। এছাড়া বাজারে এখন এক ডজন মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ১২০ টাকার মধ্যে ছিল।

ফলের বাজারেও আগুন : গত তিনদিনে বিভিন্ন ফলের দামও অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। আপেল ও কমলার কেজি ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। আড়াইশো টাকা ছুঁয়েছে আমের কেজি। আর আঙুরের দাম কেজিতে ৮০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ টাকা দরে। মাল্টার কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২১০ টাকা, নাটফল ৩২০-৩৬০, আনারের ২৮০-৩০০ টাকা কেজি এবং কয়েকদিন আগে ৫০ টাকা পিস বিক্রি হওয়া আনারস এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।

চালের বাজার চড়া : পীরেরবাগে মায়ের দোয়া রাইস এজেন্সির মালিক মোহাম্মদ ফেরদৌস জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিল পর্যায়ে ৫০ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা করে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। আবার মিল থেকে ঢাকায় আনার পথেও ট্রাক ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কেজিতে ১/২ টাকা করে বেড়েছে চালের দাম। সব মিলে গত এক সপ্তাহে প্রতিকেজি চালে ২/৩ টাকা করে বেড়েছে।

তিনি জানান, খুচরা বাজারে এখন প্রতিকেজি আটাশ চাল ৫৫ টাকা, পাইজাম চাল ৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ টাকা, মিনিকেট চাল এখন ৭০ টাকার মধ্যে আছে, তবে এর দাম আরও বাড়তে পারে। আর নাজির শাইল আগের ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা করে বিক্রি করতে হবে। এছাড়া কাটারি চাল ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭২ টাকা হয়েছে।

অস্থির হচ্ছে ভোজ্যতেলের বাজার : ধীরে ধীরে অস্থিরতা বাড়ছে সয়াবিন তেলের বাজারে। প্রায় ২০ দিন আগে সরকার ঘোষিত সয়াবিন তেলের মূল্য এখনো মিলছে না বাজারে। খুচরা ১ লিটার সয়াবিন তেল এখনো বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মিলেছে এই তথ্য। এরই মধ্যে আবারও সয়াবিনের মূল্য ২০ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে এমন তথ্য প্রকাশের পর অদ্ভুত এক সিন্ডিকেটের দেখা মিলেছে বাজারে।

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় দোকানগুলোতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ছোট দোকানগুলোতে নেই সয়াবিন তেল। খিলগাঁও তালতলার বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে মিলেছে অদ্ভুত এক সিন্ডিকেটের কথা। যেখানে দোকানে ২-৩ জন একসঙ্গে এসে কিনে নিয়ে গেছে সব তেল।

তালতলা মার্কেটে ব্যাপারী এন্টারপ্রাইজে কর্মরত একজন জানান, আমার দোকানে আজ ৫ লিটারের ৫০টির বেশি বোতল ছিল। কিন্তু ২-৩ জন করে এসে একেকবার ৫-৬টা ৫ লিটারের তেলের বোতল কিনে নিয়ে গেছে। কিছু বলতে গেলে ধমক দিয়েছে। বাবুল স্টোরের মালিক কামাল হোসেন বলেন, আমার দোকানে যা তেল ছিল তা দিয়ে আগামী ১৫ দিন চালানো যেত। কিন্তু কিছু ক্রেতা এসে পাঁচ লিটারের ৩-৪টা করে বোতল নিয়ে গেছে। না দিতে চাইলে উল্টা খারাপ ব্যবহার করে।

মধ্যবিত্তের যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে মাসে ৬ হাজার : বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী খোলাকাগজকে বলেন, তেলের দাম ও গাড়ি ভাড়া বাড়ানোর পর অফিসগামী যাত্রীদের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে রাজধানীতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের অফিস যাতায়াতে ভাড়া দুই হাজার ১০০ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা দুদিনে ২৮টি বাস কাউন্টার পর্যবেক্ষণ করেছি। অফিসগামীদের প্রতিদিন যাতায়াতে বাসভাড়া সর্বনিম্ন ৭০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, একজন চাকরিজীবীর সঙ্গে আমি কথা বললাম, যিনি বেতন পান ১০ হাজার টাকা। ঢাকায় সাবলেট থাকতেন। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি গ্রামে চলে যাবেন। কারণ তার প্রতিদিন ৭০ টাকা গাড়ি ভাড়া ধরে মাসে দুই হাজার ১০০ টাকা ভাড়া বেড়েছে।

বাসাভাড়া বাড়ার দুশ্চিন্তায় ভাড়াটিয়ারা : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ার আশঙ্কায় রাজধানীর বাড়িওয়ালাদের অনেকে ভাড়াটিয়াদের বাড়িভাড়া বাড়ানোর কথা বলতে শুরু করে দিয়েছেন। মালিবাগে ১৪ হাজার টাকায় দুই রুমের বাসা নিয়ে থাকেন খায়রুল নাফিজ। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। এর মধ্যে অর্ধেক চলে যায় বাড়িভাড়াতে। আর বাকি টাকা দিয়ে টানাটানি করে সংসার চলে। এরমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাড়িওয়ালাও ইঙ্গিত দিয়ে দিল ভাড়া বাড়াবে। দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে, বাড়িভাড়াও যদি বেড়ে যায় তাহলে আমরা কিভাবে বাঁচবো এটা ভাবার কেউ নেই।

বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। ঢাকায় যারা ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন তাদের মধ্যে যারা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ তারা আসলেই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ঢাকায় এত বেশি বাড়ি ভাড়া, এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে যদি জীবন যাত্রার ব্যয় আরও এক দফা বেড়ে যায়, তাহলে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

 
Electronic Paper