সংসার চালাতে হিমশিম মধ্যবিত্তের

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

সংসার চালাতে হিমশিম মধ্যবিত্তের

নিজস্ব প্রতিবেদক
🕐 ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০২২

সংসার চালাতে হিমশিম মধ্যবিত্তের

দিনের পর দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারদর। ভোজ্যতেল, চিনি, চাল, আটা, ডাল, পেঁয়াজ, মশলাসহ প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছ-মাংসের দাম আকাশচুম্বী। জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের দুর্দশা বাড়িয়ে দিয়েছে। সংসার চালাতে লড়াই করতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ধাক্কা লেগেছে সংসারে। আয় বাড়েনি। বেড়েছে ব্যয়। আর এতেই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কাটছাঁট করতে হচ্ছে বিভিন্ন খাতে। তার পরও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না মানুষ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি যৌক্তিক কারণ বাদ দিলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। এ অবস্থায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

রাজধানীর মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক পদে চাকরি করেন মোস্তাক আহমেদ। বেতন পান সবমিলিয়ে ১৮ হাজার টাকা। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়ায়। বাসা ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে দিতে হয় ৮ হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে সংসার খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, অফিসে যাতায়াত করেন তিনি। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মোস্তাক।

গতকাল রোববার আলাপকালে মোস্তাক আহমেদ বলেন, সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। এছাড়া খাদ্যসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে। কিন্তু সে অনুযায়ী চাকরিজীবী বা অন্যান্য পেশার লোকজনের আয় বাড়েনি। এমন অবস্থায় অনেকের জন্যই ঢাকায় টিকে থাকা অসম্ভব হবে। মোস্তাক আহমেদ বলেন, বেতনের একটি বড় অংশ বাড়ি ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারি না। নিজের পছন্দের খাবার বা পোশাক কেনা সম্ভব হয় না। মাস শেষ হওয়ার আগেই ধার-দেনা করে চলতে হয়। এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়?

গত শুক্রবার দিনগত মধ্যরাত থেকে সব ধরনের জ¦ালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রতি লিটার ডিজেলে বেড়েছে ৩৪ টাকা, কেরোসিনে ৩৪, অকটেনে ৪৬ ও পেট্রলে বেড়েছে ৪৪ টাকা। দাম বাড়ার পর একজন ক্রেতাকে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে হচ্ছে ১১৪ টাকায়। এছাড়া প্রতি লিটার কেরোসিন ১১৪ টাকা, অকটেন ১৩৫ ও পেট্রল ১৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে গত রোববার থেকে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষেরা।

গুলশানে একটি সুপার শপে কাজ করেন সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করা ইমদাদ হাসান। গতকাল সকালে আলাপকালে তিনি বলেন, ছাত্র অবস্থায় তিনটা টিউশনি করতাম। তখন মাসে আট-নয় হাজার টাকা আয় হতো। এই টাকার একাংশ দিয়ে মেসে থাকতাম। বাকি টাকা টাঙ্গাইলে বাড়িতে পাঠাতাম মা-বাবার হাত খরচের জন্য। এখন ১৪ হাজার টাকা বেতন পাই। কিন্তু এখন দ্রব্যমূল্য বাড়ায় মেস ভাড়া, খাবার খরচ, পকেট খরচ দিয়ে মাস শেষে তেমন কিছুই থাকে না। বাড়িতেও ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না।

দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেশি: বাজারে আমদানি করা নিত্যপণ্যের সঙ্গে দেশীয় উৎপাদিত পণ্যও বাড়তি দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। গতকাল রোববার দেশি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গত ১ মে এই পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। একই ভাবে দেশি রসুন গতকাল ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। ১ মে বিক্রি হয় ৭০ টাকায়।

দেশি ডাল গতকাল রোববার ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। ১ মে ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। লাল ডিম ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ১১৫ টাকা ডজন বিক্রি হয়েছিল।

ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘সারা বিশ্বেই মুদ্রাস্ফীতি চলছে। তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়ছে। আবার একসময় ব্যবসায়ীরা এক কেজি পণ্য বিক্রি করে লাভ করতেন সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা, এখন লাভ করতে চান ৫০ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির এটিও একটি বড় কারণ।’

তিনি বলেন, ‘আমদানিকারকরা সম্মিলিত হয়ে দাম বাড়িয়ে পণ্য বাজারে সরবরাহ করছেন। এদিকে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে কিছু মানুষের আয় বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীরা যে দাম চাচ্ছেন সেই দামেই পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। এটিও মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ।’

তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় শুধু কাঁচাবাজার নয়, জীবনযাত্রার সবক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে না খেয়ে দিন পার করতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অপুষ্টিতে ভুগবে।

তেলের দাম বাড়ায় মানুষের কষ্ট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রথমেই ধাক্কা খাবে পরিবহন সেক্টরে। আর পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সবই সম্পৃক্ত। পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। ফলে বাড়বে পণ্যের দামও। সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে।

মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতেই বাজারে যেতে পারছে না। এমন কোনো পণ্য নেই, যার দাম বাড়েনি। জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি এই দাম আরও অসহনীয় করে তুলবে। মধ্যবিত্তরা দিশেহারা হয়ে পড়বে। ক্রয় ক্ষমতা কমে গেলে মানুষ আর ভালো থাকতে পারে না।

 
Electronic Paper