পরিবহন ব্যবসার আড়ালে চলছে মাদক পাচার

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

পরিবহন ব্যবসার আড়ালে চলছে মাদক পাচার

প্রীতম সাহা সুদীপ
🕐 ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০২২

পরিবহন ব্যবসার আড়ালে চলছে মাদক পাচার

ট্রাক-বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনে ঢাকায় ঢুকছে মাদকের চালান। রাজধানী ও আশপাশের জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এসব মাদক। অধিক উপার্জনের লোভে পড়ে বিভিন্ন পরিবহনের চালক ও হেলপাররাও মাদক ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

গত কয়েক মাসে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে ইয়াবার চালান উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রাকের তেলের সিলিন্ডারে, যাত্রীবাহী বাসের টেইল লাইটের পিছনে, সিটের নিচে বিশেষ কায়দায় ঢাকায় আনা হচ্ছে এই মরণ নেশা। এছাড়া কক্সবাজার থেকে ভেঙে ভেঙে কয়েক দফায় বাস বদল করেও ইয়াবা ঢাকায় আনছে একটি চক্র। এমন পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের পাশাপাশি অসাধু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও নজরদারির আওতায় আনতে চাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ট্রাকের তেলের সিলিন্ডারে ইয়াবা পাচার : সবশেষ সম্প্রতি অভিনব কায়দায় ট্রাকের তেলের সিলিন্ডারের মধ্যে ইয়াবা পাচারকালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাচারচক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গ্রেফতাররা হলো- চট্টগ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম (২৬) ও হেদায়েত উল্লাহ (২০) এবং বান্দরবানের লামার মো. নুরুল ইসলাম (৪৮)। গত ৬ আগস্ট রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকসহ (ঢাকা মেট্রো-ট-১৩-৫৪২৮) ওই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা মাদক দ্রব্যের বাজার মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

পরিবহন ব্যবসার আড়ালে পাঁচ বছর ধরে ইয়াবা পাচার : গতকাল রোববার র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, মাদক কারবার চক্রটি টেকনাফ হতে ইয়াবা রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিত। জব্দ ট্রাকটির মালিক পলাতক সোহেল। তিনিই এই চক্রের প্রধান আসামি। গত ৪-৫ বছর যাবৎ চক্রটি পরিবহন ব্যবসার আড়ালে টেকনাফ হতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।

তিনি আরও বলেন, মূলহোতা সোহেল পলাতক। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে পুরো চক্র সম্পর্কে জানা যাবে।

অধিক টাকার লোভ দেখিয়ে চালক-হেলপারদের ব্যবহার : র‌্যাব জানায়, মাদক কারবার চক্রটি পণ্যবাহী পরিবহনের চালক-সহকারীকে মোটা অংকের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের গাড়িতে ইয়াবার চালান পরিবহনের জন্য প্রলুব্ধ করে থাকে। ইয়াবা পাচার চক্রের সদস্য সংখ্যা ৭-৮ জন। ট্রাক মালিক সোহেল ও গ্রেফতার আমিনুল টেকনাফের সিন্ডিকেট হতে ইয়াবা সংগ্রহ করে। ইয়াবা সংগ্রহের পর সোহেলের নির্দেশনায় আমিনুল তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়।

গ্যারেজে তেলের সিলিন্ডারে ইয়াবা ঢুকিয়ে ঝালাই : গ্রেফতাররা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, ইয়াবার কারবারে জড়িত চক্রটি তিনটি ভাগে কাজ করে। একটি ইয়াবার সাপ্লাই। আরেকটি গ্রুপ গাজীপুরে পৌঁছে দেয়। আরেকটি গ্রুপ ক্রেতাদের পৌঁছে দেয়। প্রথমে কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি গ্যারেজে বিশেষ পদ্ধতিতে গাড়ির তেলের সিলিন্ডারের মধ্যে গোপন প্রকোষ্ঠ তৈরি করে তার মধ্যে ইয়াবা লুকিয়ে পরিবহন করা হয়। এভাবে অভিনব কায়দায় তেলের ট্যাংকিতে ইয়াবা রাখার পর সোহেল, আমিনুল ও নুরুল ইসলাম প্রথমে ট্রাক নিয়ে টেকনাফ হতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা করে। চট্টগ্রাম আসার পর সোহেল গাড়ি থেকে নেমে যায়।

এরপর আমিনুল, নুরুল ইসলাম ও হেদায়েতকে নিয়ে চট্টগ্রাম হতে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা করেন। সীতাকুণ্ড ও কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি করে। ইয়াবার চালানটি তারা গাজীপুরে সরবরাহের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের ট্রাকে অন্য কোনো মালামাল ছিল না। পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন চেকপোস্টে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানান, গাজীপুর হতে মালামাল লোড করে চট্টগ্রাম নিয়ে আসার জন্য তারা খালি ট্রাক নিয়ে গাজীপুর যাচ্ছে। ট্রাকের তেলের ট্যাংকিতে ইয়াবাগুলো লুকিয়ে রাখায় তারা নিশ্চিত ছিল যে, তল্লাশিতে ধরা পড়বে না।

ইয়াবার চালানে ডিলারদের বিশেষ কোড ব্যবহার : তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা টেকনাফের ডিলারের কাছে আসে। টেকনাফের ডিলার ও ঢাকার ডিলারের পরিকল্পনামত ইয়াবা বিভিন্ন সংখ্যায় চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি প্যাকেটের গায়ে বিশেষ কোড নম্বর দিয়ে প্যাকেটজাত করে থাকে। এই কোড নম্বর দেখেই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ডিলাররা বিভিন্ন মাদককারবারিদের কাছে চাহিদা অনুযায়ী চালান পৌঁছে দিয়ে থাকে। মাদক কারবারিদের ৩-৪ ডিজিটের তিন ধরনের কোড নম্বর পেয়েছে র‌্যাব।

মাদক মামলায় সোয়া দুই বছর জেল খেটেছে আমিনুল : গ্রেফতার হওয়া আমিনুল পেশায় ট্রাক হেলপার। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। চট্টগ্রাম ট্রাকস্ট্যান্ডে মাদক কারবারি ও ট্রাক মালিক সোহেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। সোহেলের প্ররোচনায় আমিনুল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ট্রাকে হেলপারের কাজ শুরু করেন। গত ৪-৫ বছর যাবৎ ইয়াবা পাচারে কাজ করছেন আমিনুল। নিজে ট্রাকের হেলপার হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দিতে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছিলেন আমিনুল। চালান প্রতি ৩০-৫০ হাজার টাকা পেতেন আমিনুল। এর আগে দুই দফায় সোয়া দুই বছর মাদক মামলায় জেল খেটেছে সে।

সোহেলের হাত ধরে ইয়াবার কারবারে নুরুল : গ্রেফতার নুরুল ইসলামের সঙ্গে বান্দরবান এলাকায় মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে সোহেলের সঙ্গে পরিচয়। ট্রাক মালিক সোহেলের সহযোগিতায় তিনি ইয়াবা পরিবহন ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হন। নুরুলের গাড়ি চালনায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি তার ভারি যানবাহন চালনার কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ট্রাকের হেলপার হিসেবে মালামাল লোড-আনলোড করতে গিয়ে গাড়ি স্বল্প দূরত্বে স্থানান্তর করার মাধ্যমে ড্রাইভিং শিখেছেন। গত ১০ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন ধরনের পরিবহন চালিয়ে আসছেন। মাদকের একটি চালান পৌঁছে দিয়েই তিনি পেতেন ৫০ হাজার টাকা।

টেম্পোচালক থেকে ইয়াবার কারবারে হেদায়েত : টেম্পোচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা হেদায়েত। নিজের নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। সোহেল ও হেদায়েতের উভয়ের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হওয়ায় এলাকার বন্ধুদের মাধ্যমে তার সোহেলের সাথে পরিচয় হয়। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের আশায় সে সোহেলের সাথে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। সোহেলের বিশ্বস্ত হওয়ায় মাদক বহনের সময় সে গাড়ির চালক ও হেলপার উভয় ভূমিকা পালন করে থাকে। মাদকের একটি চালান পৌঁছাতে পারলে সে ১৫-২০ হাজার টাকা পেতে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নজরদারিতে রাখবে র‌্যাব : র‌্যাব কর্মকর্তা কমান্ডার মঈন বলেন, মাদকে যারা জড়িত তাদের আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাই। এত কিছুর পরও মাদক আসছে। বন্ধ হচ্ছে না। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে মাদকমুক্তি সম্ভব নয়। যারা পরিবহন সেক্টরে আছেন তাদের সচেতন হতে হবে। যাতে তাদের পরিবহন মাদকের কারবারে ব্যবহার না হয়। মাদক পরিবহনে চালক হেলপাররা ৫/৭ হাজারের বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। যদিও অপকৌশল কিন্তু বন্ধ নেই। পাকস্থলীতে করেও এখন কারবারিরা মাদক পরিবহন করছেন।

তিনি আরও বলেন, ট্রাক-বাসসহ পরিবহনকে পুঁজি করে দেশে মাদকের কারবার হচ্ছে। বেশি উপার্জনের লোভে পড়ে অনেক চালক-হেলপার ইয়াবার চালান পৌঁছে দেওয়ার কাজে জড়িয়েছেন। জেনে-বুঝে যারা নিজেদের মালিকানাধীন পরিবহন মাদক কারবারে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 
Electronic Paper