ঢাকা, সোমবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৭ মাঘ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

গাছি সংকটে খেজুর গুড় শিল্প

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর
🕐 ৬:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০২১

গাছি সংকটে খেজুর গুড় শিল্প

ফরিদপুরে একদিকে কমছে খেজুর গাছ। অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গাছি (গাছ থেকে রস সংগ্রহকারী) সম্প্রদায়। এক সময়ে পল্লী গ্রামে ঘুরে ঘুরে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করতেন গাছিরা। জেলা-উপজেলাগুলোর প্রতিটি গ্রামে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। তখন প্রতিটি গ্রামে গড়ে ৮ থেকে ১০ জন পেশাদার গাছি পাওয়া যেত। এখন আর সেদিন নেই। গাছিদের পেশা বদল, নতুন করে এ পেশায় (গাছি) কেউ না আসাসহ নানা কারণে একেবারেই যেন ফরিদপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গাছি। বর্তমানে প্রতি গ্রাম তো দুরে থাক কয়েক গ্রাম খুঁজলেও পেশাদার একজন গাছির সন্ধান মিলবে কি-না সন্দেহ। জানা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলার প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ ও বাড়িসহ বিভিন্নস্থানে আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাসের পেয়েছে। তারপরও যা আছে তা থেকে রস সংগ্রহকারী গাছি নেই। গাছির অভাবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয় না। আর এই অনাবাদি খেজুর গাছগুলো টাকার লোভ দেখিয়ে অবৈধ ইটভাটার মালিকরা কিনে নিয়ে ভাটার ইট পোড়ানো কাজে ব্যবহার করছেন।

রোপণ কম, অনাবাদি পড়ে থাকা, অনাগ্রহ, ভেজাল গুড় তৈরিসহ নানা কারণে যেমন খেজুর গাছ হ্রাস পাচ্ছে। তেমনি খেজুর গাছ কমে যাওয়া, রস ও গুড়ের ঐতিহ্য হারানোর দিক দিয়েও গাছিদের সংকট একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক জায়গায় দেখা যায় গাছ আছে গাছি নেই।

বোয়ালমারীর সোতাশী গ্রামের মো. গফফার সেখ। তিনি ২০/৩০ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস বের করেছেন। তিনি একজন পুরনো গাছি হিসেবে বলেন, আগের মত এলাকায় খেজুর গাছ নেই। আর খেজুর গাছ কেটে এখন পেট চলে না। বয়স হয়েছে, তাই গাছির পেশা ছেড়ে দিয়েছি। চালিনগর গ্রামের মো. সাহিদ মোল্লা বলেন, খেজুর গাছ কাটার গাছির পেশায় থেকে সংসার চলে না। তাই এখন ওসব বাদ দিয়ে নসিমন চালাই।

সালথা উপজেলার যদুনন্দি ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের হরেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেন, প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর আগে আমার নিজের প্রায় শতাধিক খেজুর গাছ ছিল। রসের মৌসুমে গ্রামের তিনজন পেশাদার গাছি বছর চুক্তি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। আমি নিজেও তাদের সঙ্গে নিয়ে গাছির কাজ করতাম। সে সব গাছিরা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। রক্ষণাবেক্ষণ আর গাছির অভাবে আমার গাছ কমতে কমতে এখনমাত্র ১০/১২টি গাছ আছে যা নিজেদের রস ও গুড়ের চাহিদা মেটাতে নিজেই এ কাজ করি।

এ বিষয়ে গত কয়েকদিন বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, সালথা উপজেলার সোনাপুর এলাকার এক গাছি খেজুর গাছ কেটে বাড়ি ফিরছেন। কৃষ্ণনগরের সদরদি এলাকার পুরনো গাছি চাঁন মিয়া। অনেক বছর ধরে তিনি এই পেশায় নিয়োজিত। ভালো রস এবং গুড়ের সুনাম আছে তার। উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের কয়ড়া গ্রামের জয়বাংলা মোড়ে সানাল মুন্সি নামের একজন গাছিকে খেজুর গাছে হাড়ি নিয়ে উঠতে দেখা যায়।

তিনি জানান, ৩০-৩৫ বছর ধরে তিনি গাছির পেশায় আছেন। তার বাবাও একজন গাছি ছিলেন। তবে এ পেশায় এখন আর বেশি মানুষ নেই। সংকট চলছে। ওই লোকের নাম বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের পুরনো একজন পেশাদার গাছি মো. রঞ্জন মোল্লা বলেন, ৩০-৪০ বছর ধরে এ পেশায় আঁকড়ে ধরে আছি। তবে আগের মতো আর পেশাদার হিসেবে নয়। সৌখিন গাছি হিসেবে অল্প কিছু গাছ কেটে রস বের করছি।

গাছিরা জানান, আগের মতো এলাকায় খেজুর গাছ নেই। যার কারণে বেশিরভাগ গাছিরা খেজুর গাছ কাটা গাছির পেশা বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামে বা মহল্লায় দেখা যেত খেজুরের গাছের মাথা কেটে মাটির হাড়ি পেতে রাখতে। শীত আসলেই সকালে খেজুরের রস এবং মুড়ি ছিল গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্য। তখন ১ কেজি গুড়ের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমানে বাজারে ১ কেজি গুড়ের মূল্য ৩০০ টাকা। তখন গুড় বিক্রি করে চলত গাছিদের সংসার। দুপুর হলেই গাছিরা হাড়ি নিয়ে ছুটে যেত গ্রামের বিভিন্ন পাড়া মহল্লায়। এখন আর দেখা মেলে না গাছিদের। ৮ থেকে ১০টি গ্রাম ঘুরে একজন পেশাদার গাছি পাওয়া যাবে কি-না বলা মুশকিল।

এ বিষয়ে ‘ঘুরি-ফিরি ফরিদপুর’ ফেসবুক পেজের মডারেটর ও ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা) শিক্ষার্থী ইকবাল মাহমুদ ইমন বলেন, আমাদের জেলা ফরিদপুর খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত হলেও এখন আর আগের মতো খেজুর গাছও নেই, রস ও গুড় চাহিদা মেটাতে পারে না। খেজুর গাছ রসের উপযোগী করে তৈরি করতে গাছির প্রয়োজন কিন্তু গাছিদের এখন আর দেখা যায় না। গাছিদের অভাবে জেলার বিভিন্ন জায়গায় খেজুর গাছ তুলনামূলক বেশি থাকলেও সেগুলো অনাবাদি পড়ে রয়েছে। সাধারণত আগেরকার দিনে হেমন্তের শেষ দিকে ও শীতের শুরুতেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত খেজুর গাছ নিয়ে। কিন্তু গত কয়েক গাছিদের সংকটের কারনে বছর ধরে অসংখ্যক খেজুর গাছ অনাবাদী পড়ে থাকে। ফলে ওইসব গাছগুলো ইটভাটায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়াও রোপণ কমে যাওয়া ও জ্বালানী সংকটসহ ভেজাল গুড়ের সমারোহে ভেজালমুক্ত গুড়ের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াকেই দায়ী করছেন অনেকেই।

মধুখালী উপজেলার আড়পারা এলাকার গাছি রমজান মোল্লা বলেন, খেজুরগাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চালাতে পারতেন এবং তাতে সংসার চালিয়ে কিছু সঞ্চয়ও করা যেতো। ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা ও ওষুধ কোম্পানিতে চাকরিজীবী রাকিবুল হাসান টোকন মোল্লা বলেন, এখন শীত মৌসুমের ভোরে এক গ্লাস তাজা খেজুরের রস পাওয়া না গেলেও খেজুররসে তৈরি পাটালী গুড়, ঝোলা গুড়, মরিচা গুড় ইত্যাদি এখনও পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুররস এবং রসে তৈরি নানান ধরনের সুস্বাদু ও সুগন্ধি গুড় ও গাছি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. হযরত আলী বলেন, দিনে দিনে ব্যাপকহারে হ্রাস পাচ্ছে খেজুর গাছ। সেই সঙ্গে গাছির সংখ্যাও একেবারে কমে গেছে। খেজুর গাছ কেটে রস বের করা একটা শিল্প। কিন্তু এই শৈল্পিক পেশাদার গাছি এখন তো চোখেই পড়ে না। পুরো জেলায় কতজন গাছি এ পেশায় এখনও টিকে আছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।

 
Electronic Paper