জীবনানন্দ

ঢাকা, শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

জীবনানন্দ

ঝুমকি বসু
🕐 ২:০৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৪, ২০২২

জীবনানন্দ

-আপনাদের বিয়ের বয়স কত বছর?
-আমার বেড়ে ওঠা শহরে, গ্রামকে তাই সেভাবে চেনা হয়নি। ফুরফুরে বাতাসে ফিনফিনে এক গরদের পাঞ্জাবি পরে নীলুকে বিয়ে করতে ওদের গ্রামে গিয়েছিলাম। ওর নাম নীলাম্বরী, আমি আদর করে ‘নীলু’ বলেই ডাকি। বিয়ের আসরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছি। শ্যালিকা শর্বরী একটা শাল আমার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে ঠাট্টা করে বলেছিল ‘টেনশনে কাঁপছেন নাকি, জামাইবাবু?’

আমাদের প্রেমের বিয়ে, তবে পরিবারের কারও কোনো অমত ছিল না তাতে। নীলুকে বিয়ের আগে কতই তো কাছ থেকে দেখেছি, তবু শুভদৃষ্টির সময় আমি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলাম। এ নিয়ে আমাকে কম কথা শুনতে হয়নি, নীলুই বলেছে, ‘এভাবে কেউ তাকায়? কী লজ্জা, কী লজ্জা!’ প্রায় আট বছর আমাদের বিয়ের বয়স, কিন্তু নীলুর সেই মুখটা এখনো আমার চোখে ভাসে।

-আপনাদের কোনো সন্তান নেই?
-বিয়ের ঠিক তিন বছর পর নীলু কনসিভ করে। কিছুই খেতে পারে না, যা খায় গলা দিয়ে হড়হড় করে নেমে আসে। কখনো কখনো বেসিন অবধিও যেতে পারে না, ঘর ভাসিয়ে ফেলে। আলট্রাসনো করালাম, শহরের নামকরা গাইনি ডাক্তার দেখালাম। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, বেবির হার্টবিট খুব কম, অ্যাবরশনের ঝুঁকি খুব। ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার আগে আমরা প্ল্যান করছিলাম সন্তানের কী নাম রাখব তা নিয়ে। ফেরার পথে রিকশায় আমার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল নীলু; আমি ওর মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। ঠিক এক সপ্তাহ পরে হুট করে ওর বমি-টমি সব উধাও। ডাক্তারের কথা মিলে গেল। আমরা বাচ্চাটা হারালাম। নীলুকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় এক মাস সময় লেগেছিল আমার। এরপর আর কোনো ইস্যু আসেনি।

-আপনাদের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।
নীলু স্বভাবে খুব রোমান্টিক। ও চায় ভালোবাসাগুলো মাঝে মাঝে প্রকাশ হোক। আমি তা পারি না। আমার কাছে ভালোবাসা একদম ভেতরকার একটা অনুভূতি, লোকদেখানো কিছু নয়। আমি সত্যিই নীলুকে খুব ভালোবাসি; কিন্তু মুখ ফুটে কোনোদিন তা বলতে পারি না। তবে এ কথা অস্বীকার করার কিছু নেই, বিয়ের আগে বা বিয়ের প্রথম দিকে নীলুকে যতটা সময় দিতে পেরেছি, এখন তা পারি না।
আমি এখন এক নামকরা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অফিসে প্রচুর কাজের চাপ। মাঝে মাঝে অফিস থেকে নীলুকে ফোন করার সময়ও হয়ে ওঠে না। আজকাল ফিরতেও বেশ দেরি হয়। প্রথম প্রথম নীলু গাল ফোলাত, পরে স্বাভাবিক। ভেবেছি সে মেনে নিয়েছে। অনেক সময় অফিস থেকে বাসায় ফিরেও অনেকক্ষণ ধরে অফিসের কাজ করতে হয়।

মাস দুয়েক আগে অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখলাম নীলু বই পড়ছে।
-নীলু, কী পড়ছ?
-কবিতা।
-কার কবিতা?
-জীবনানন্দ দাশ।

সুনসান রাতের নীরবতা ভেঙে শোনা যাচ্ছে নাইটগার্ডের হাঁকডাক। আশপাশে কোথায় যেন একটা বিড়াল কাতরস্বরে কান্না করছে। আমার ঘুম ভেঙে যায়। নীলু কোথায়? ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত তিনটা আটচল্লিশ। খুঁজতে খুঁজতে সেদিন নীলুকে আবিষ্কার করলাম আমাদের ব্যালকনির এক কোণে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করছে। এমনিতেই ওর গলাটা বড় মায়াময়। বিয়ের আগে এই গলার স্বর শোনার জন্য আমি পাগল হয়ে যেতাম। রাতের নীরবতায় সেই স্বর থেকে যখন ভেসে আসছিল ‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেও নাকো তুমি/ বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে।’ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। নীলুকে জড়িয়ে ধরে বললাম ‘এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ছ, নীলু?’ ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দিল সে! বারান্দায় শিকড় গেঁথে পরিবারসমেত আস্তানা গড়া একটা গোলাপগাছের কাঁটা বিঁধে গেল আমার হাতে। বিড়ালের কান্না ছাপিয়ে তীব্র হলো নীলুর কান্না ‘আমাকে ছোঁবে না, প্লিজ’।

সত্যি কথা বলতে কি, বেশ ভড়কেই গিয়েছিলাম সেদিন, তবে পরক্ষণেই ভাবলাম, বড় অবিচার করা হচ্ছে নীলুর ওপর। বেচারা একা একা থাকে, আর একদমই সময় দিতে পারছি না আমি! আমাদের সঙ্গমগুলোও বেশ অঙ্ক মেনে চলে। বাচ্চা না হওয়ার এটাও আরেকটা কারণ হতে পারে কি না, তা অবশ্য জানি না। সারা দিন অফিসে দম ফেলার সময় নেই। মাঝে মাঝে পানি খেতেও ভুলে যাই। প্রস্রাবে জ্বালা করলে, গিয়ে ঢকঢক করে একবারে এক বোতল খেয়ে নিই; যাতে বারবার খেতে গিয়ে সময় নষ্ট না হয়। বাসায় ফিরেও ক্লান্ত শরীরে অফিসের কাজ নিয়ে বসি। অধিকাংশ রাতেই ল্যাপটপ বা ফোনের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে যাই।

শুধু বৃহস্পতির রাতটা একটু অন্যরকম। এ রাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি হুইস্কির গ্লাসের ওপর। হুইস্কি খেলে আমার যৌনক্ষুধাটা বেড়ে যায়। আমি নীলুর ভাঁজ খুলে খুলে দেখি। এদিন যদি নীলুর মাসিকের ডেট পড়ে যায়, আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। গোটা সপ্তাহ অপেক্ষা করি একটা দিনের জন্য, অঙ্ক না মিলে গেলে আমাকে বাথরুমে গিয়ে মাস্টারবেট করতে হয়। নীলুও বোধহয় এই দিনের প্রত্যাশায় দিন গোনে। ওর সাড়া বড্ড ভালো লাগে আমার! বিছানায় নীলু তুখোড় বললেও বোধহয় কম বলা হবে। কলেজ জীবনে অনেক পর্ন দেখেছি। কিন্তু আমার মনে হয় পর্নের মেয়েগুলোকে বিছানায় হার মানিয়ে দিতে পারে নীলু। তবে এই এক দিনের সঙ্গমে ওর যৌনক্ষুধা মেটে কি না, তা অবশ্য কোনোদিন ভাবা হয়নি। নীলু বারান্দায় যেদিন আমায় ছিটকে ফেলে দিল, সেদিন ভাবলাম ওর সঙ্গে শারীরিক মিলনটা বাড়াতে হবে। পরের দিন বিছানায় ওকে কাছে নিলাম, কিন্তু ও আগের মতো সাড়া দিল না। মনে হলো আমি কোনো সেক্সডলের সঙ্গে সঙ্গম শেষে বীর্যপাত করলাম।

সেদিন শুক্রবার। নীলুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করলাম। না, ওর হাতে বই নেই, কিন্তু সারাক্ষণ মোবাইল ফোন নিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে হাসছে, গুনগুন করে কবিতা আবৃত্তি করছে। এরপর আরও অনেক দিন কাছ থেকে খেয়াল করলাম। নীলুর ওপর আমি বেশ বিরক্ত। কার সঙ্গে কথা বলে ও? মোবাইল ফোন নিয়ে সারাক্ষণ কী করে? রাত নেই, দিন নেই, ফেসবুকে নীলুর নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলতে থাকে। তবে কি নীলু কারও প্রেমে পড়েছে? তাই আমার প্রতি এত অনীহা! একদিন অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি করলাম, ওয়াই-ফাইয়ের লাইন কেটে দিতে চাইলাম। তাতেও কোনো ছন্দপতন হলো না।

শেষে একদিন রাগ না সামলাতে পেরে জানতে চাইলাম, নীলু, সত্যি করে বলো, ফেসবুকে সারাক্ষণ তুমি কী করো?
-চ্যাট করি।
-কার সঙ্গে?
-আমি একজনের প্রেমে পড়েছি, তার সঙ্গে। অকপট স্বীকারোক্তি নীলুর।
রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করছিল। এই আমার নীলু! যাকে আমি আমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। ভালোবাসা কি সব সময় মুখে বলতেই হবে! এই সেই নীলু, যার জন্য সংসদ ভবনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মশার কামড় খেতে খেতে অপেক্ষা করতাম আমি! নীলু এভাবে আমায় ঠকাল!

এতটুকু বলার পর আর কোনো কথা বলতে পারিনি; কান্নার দমকে আমার হেঁচকি উঠছিল। গলায় দলা পাকানো কষ্ট কাঁটার মতো বিঁধে আছে। মনোচিকিৎসক ইব্রাহীম হাসানও আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, কারণ বাকিটা তাকে আগের ভিজিটেই বলেছিলাম।

বহুদিন পর আজ অফিস কামাই করেছি। এক ফোঁটা জোর নেই পায়ে, আর মনের জোর তো সেদিনই হারিয়ে ফেলেছি, যেদিন জানলাম আমার স্ত্রী নীলু জীবনানন্দ দাশের প্রেমে পড়েছে। রাতভর সে তার সঙ্গে ফেসবুকে চ্যাট করে। আমাকে ভয় দেখায়, লাবণ্য দাশ নাকি জীবনানন্দের ওপর মানসিক অত্যাচার করে। তাই সে জীবনানন্দকে নিয়ে একদিন দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে...।

 
Electronic Paper