আশাভঙ্গের চিহ্ন

ঢাকা, সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২ | ১১ মাঘ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

আশাভঙ্গের চিহ্ন

আবুল কালাম আজাদ
🕐 ৩:০৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৩, ২০২১

আশাভঙ্গের চিহ্ন

ভাড়া থাকতে থাকতে মতিন সাহেব হাঁপিয়ে উঠেছেন। তার বর্তমান অবস্থা এমন হয়েছে যে, বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর হাতে যা থাকে তাতে সংসার খরচ সংকুলান করা তার জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে। ছেলে-মেয়ে দুটি বড় হয়েছে। তারা স্কুল-কলেজে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই খরচ বেড়ে গেছে। তাই অনেকদিন ধরেই তিনি অফিসিয়াল সরকারি কোয়ার্টারের কথা ভাবছিলেন। কোয়ার্টার পেলে চাকরি জীবনের শেষ অধ্যায়টা সচ্ছলতায় শেষ করতে পারতেন। অফিসে আসা-যাওয়াটাও করতে পারতেন স্বাচ্ছন্দ্যে। না, তিনি অন্যায্যভাবে কোয়ার্টার পেতে চাচ্ছেন না। তার চাকরির বয়স তেইশ বছর। কোয়ার্টার পাওয়ার যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছেন। যাদের চাকরির বয়স তিন বছর তাদের অনেকেই কোয়ার্টার পেয়েছে। অনেকে আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আর কোয়ার্টারের চাবি একসঙ্গে হাতে পেয়েছে।

মতিন সাহেব যখন কোয়ার্টারের জন্য বড়কর্তার কাছে দরখাস্ত লিখছিলেন তখনই তার সহকর্মী মোখলেস সাহেব বললেন, দরখাস্ত হলো ফর্মালিটি। এতে যে কোয়ার্টার হবে না, তা জানেন তো?
ছয় মাস কেটে গেলেও মতিন সাহেব তার দরখাস্তের ব্যাপারে কিছুই জানতে পারলেন না। শুধু মোখলেস সাহেবের কথার সত্যতা খুঁজে পেলেন।
একদিন এক অফিসিয়াল ফাইল দেখাতে তিনি বড়কর্তার রুমে গেলেন। বড়কর্তা যখন ফাইলে চোখ বোলাচ্ছিলেন তখন মতিন সাহেব ভাবছিলেন তার দরখাস্তটার বিষয়টা তুলবেন কি না। তবে তাকে তুলতে হলো না। তাকে অবাক করে দিয়ে বড়কর্তা নিজেই তুললেন কথাটা। বললেন, আপনি তো কোয়ার্টার চেয়ে দরখাস্ত করেছিলেন, তাই না?
: জি স্যার।
: আর তো কোনো খোঁজখবর নিলেন না।
মতিন সাহেব বুঝতে পারলেন না কী বলবেন। কীভাবে খোঁজখবর নিতে হবে তা তার জানা নেই। তিনি ফ্যালফ্যাল করে বড়কর্তার মুখে চেয়ে রইলেন।
বড়কর্তা বললেন : দেখুন, একটা বাসা খালি হলে তার জন্য দরখাস্ত পড়ে সত্তরটা। তাই শুধু দরখাস্ত করে বসে থাকলে চলে না। আরও কিছু কি বুঝিয়ে বলতে হবে?
মতিন সাহেব চলে এলেন বড়কর্তার রুম থেকে।
তার কিছুদিন পরে।
মতিন সাহেব বড়কর্তার রুমের পাশ দিয়ে আসছিলেন। বড়কর্তার পিয়ন খবর দিল : স্যার ডেকেছেন।
মতিন সাহেব গেলেন বড়কর্তার রুমে। সালাম দিয়ে দাঁড়ালেন। বড়কর্তা আন্তরিকার সঙ্গে বসতে বললেন। পিয়নকে বললেন চা দিতে। বড়কর্তা তাকে ডেকে চা খাওয়াচ্ছেন। মতিন সাহেব ভীষণ অসহায় বোধ করতে লাগলেন। এটা সত্যিকারে অসহায় বোধ করার মতো ব্যাপার কি না তা তিনি বুঝতে পারছেন না।
চা খেতে খেতে বড়কর্তা বললেন : শুনলাম প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলতে যাচ্ছেন।
: জি স্যার।
: তা কত টাকা তুলতে চাচ্ছেন?
: পঞ্চাশ হাজার স্যার।
: প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা পড়েছে কত?
: লাখ দেড়েক হবে। তেইশ বছর ধরে তিল তিল করে জমাচ্ছি কি না।
: তাহলে একলাখ তুলে ফেলুন।
: আপাতত এটায়-ই চলবে স্যার। দরকার হলে পরে তুলব।
: কী যে বলেন! কীভাবে চলবে? এত কম টাকায় কোয়ার্টার হয়? অন্যকেও তো সন্তুষ্ট করতে হবে। আপনি সততা ও নিষ্ঠার সাথে চাকরি করছেন বলে একটু সেক্রিফাইস করছি। না হলে...।
: স্যার, আমার ছেলেটা অসুস্থ। তার চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু টাকার দরকার। তাই আমি টাকাটা তুলছি। কোয়ার্টারের জন্য নয়।
: ও আচ্ছা, আচ্ছা।
বড়কর্তার মুখ শুকিয়ে গেল যেন। তিনি কেমন চুপসে গেলেন। আশাভঙ্গের চিহ্ন ফুটে উঠল তার মুখে।
আর মতিন সাহেব বুঝে নিলেন, পুরো চাকরি জীবনে তার আর অফিসিয়াল সরকারি কোয়ার্টারে বাস করা হবে না। বাসায় ফিরে জানতে পারলেন, বাড়িওয়ালা আরেক দফা ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দিয়েছে।

 
Electronic Paper