সুইসাইড নোট

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

সুইসাইড নোট

মেহেজাবিন নেছা
🕐 ৩:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১

সুইসাইড নোট

ছোট বড় নানান কারণে সুইসাইডের কথা মাথায় ভর করত। আমার হাইট কম। এজন্য আমার ছোটবোন একবার বাটুল বলে বসল। অন্য কেউ বললে এত খারাপ লাগত না। কিন্তু নিজের বোন বলল! আবার সুইসাইড নোট লিখলাম। কিন্তু শেষমেশ সুইসাইড করা হলো না। অথচ এরই মাঝে আমার ক্লাস সেভেনের এক বান্ধবী সুইসাইড করে বসল। ওর নাম পাখি। হতদরিদ্র ঘরের মেয়ে। পাখির মতোই যেন দুটো ডানা ছিল ওর। ভীষণ ছটফটে

এই নিয়ে সুইসাইড নোট লিখলাম তেরশ’ নিরানব্বইবার। হয়তো কদিন পর আবার লিখব! অবাক হচ্ছেন? হওয়ারই কথা। অথচ সত্যিই লিখছি। গুনে গুনে লিখছি।

প্রথমবার সুইসাইড নোট লিখেছিলাম অবুঝবেলায়। তখন ক্লাস থ্রির স্টুডেন্ট। মায়ের সঙ্গে জুতার দোকানে গেলাম। খুব দারুণ একটা জুতা পছন্দ হলো। বারবার বায়না করলাম। মা জুতার গায়ের লেবেলে দেড় হাজার টাকা লেখা দেখে কয়েকবার ব্যাগ চেক করল। পরে বলল, ‘অন্য জুতা দেখি আমরা?’ খুব স্নেহ নিয়েই বলেছিল। এই প্রথমবারের মতো বড়সড় কষ্ট পেলাম। ভাবলাম জীবন রাখব না। গোটা গোটা অক্ষরে লিখলাম, ‘মা, জুতাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। আর তুমি নিতে দিলে না! আমার ভালো লাগছে না। আমি মরে গেলাম।’

শুনেছিলাম, বিষ খেলে মানুষ মরে যায়। বাসায় ইঁদুর মারার বিষ ছিল। মুখে দিয়েছিলাম। বিশ্রী গন্ধ। একটু খেয়েছিলাম। তাতেই বমি হলো তিনবার। পেট খারাপ দুদিন। এরপর কিছুই হয়নি।

কদিন পর সুস্থ হতেই আমার বান্ধবী পরীর বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। পরী কান্না করছে। স্কুলের জন্য একটাই ড্রেস। পরছে দুই বছর ধরে। জোড়াতালি লাগানো। তার ওপর ছোট হয়ে গেছে। এটি পরে স্কুলে যেতে পরীর ভালো লাগে না। এদিকে আবার কারও দেওয়া কিছু ওকে পরতেও দেয় না ওর মা। মা একবার পরীর জন্য ড্রেস বানিয়ে দিতে চেয়েছিল; পরীর মা রাজি হয়নি। বলেছিল- নতুন ক্লাসে উঠলেই পরীর বাবা ড্রেস বানিয়ে দেবে।

পরী খুব হাসিখুশি। আমাকে দেখতেই কান্না মুখ হাসিতে বদলে গেল। আমি আমার জুতা না পাওয়ার দুঃখ ভুলে গেলাম।
সময় গড়াতে থাকল। ছোট বড় নানান কারণে সুইসাইডের কথা মাথায় ভর করত। আমার হাইট কম। এজন্য আমার ছোটবোন একবার বাটুল বলে বসল। অন্য কেউ বললে এত খারাপ লাগত না। কিন্তু নিজের বোন বলল! আবার সুইসাইড নোট লিখলাম। কিন্তু শেষমেশ সুইসাইড করা হলো না। অথচ এরই মাঝে আমার ক্লাস সেভেনের এক বান্ধবী সুইসাইড করে বসল। ওর নাম পাখি। হতদরিদ্র ঘরের মেয়ে। পাখির মতোই যেন দুটো ডানা ছিল ওর। ভীষণ ছটফটে। মুখে কথার খই ফুটত। ক্লাসের মাঝে কথা বলার জন্য প্রায়ই টিচারের বকা শুনত। মাঝে মাঝে মারও খেত। কিন্তু টিচার যেতে না যেতেই খিকখিক করে হেসে উঠত। বেহায়ার মতো মুখ ভেংচে স্যারের মতো নিজেকে বলত, ‘এই মেয়ে ক্লাসের মধ্যে কথা বলো কেন!’ তারপর স্যারকে বলতে না পারা কথা উগরে দিত, ‘কথা বলতে ইচ্ছে করলে মুখে তালা লাগিয়ে রাখব নাকি!
আজব।’ আমার বিরক্তি লাগত। কিন্তু কিছু বলতাম না। ছটফটে পাখিটা মারা গেল। নিথর দেহ পড়ে আছে ঘরের মাটির মেঝেতে। হাতের লেখা সুন্দর ছিল। গোটা গোটা অক্ষরে ওর সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, ‘কাল খাবার জুটবে কি জুটবে না- তার নিশ্চয়তা যে পৃথিবীতে থাকে না, সে পৃথিবীতে থাকার ইচ্ছে নেই আমার। গরিব না হয়ে মানুষ হয়ে জন্মালে বাঁচার কথা ভাবতাম!’ এখনো ভাবি- গরিবরা কি আদতেই মানুষের জীবন পায় না, নাকি পাখির চলে যাওয়া ওই বয়সের নিছক অভিমান ছিল!

ক্লাস নাইনে থাকতে ইভটিজিংয়ের ওপর রচনা লিখে জেলা পর্যায়ে প্রথম হলাম। হাজারখানেক মানুষের সামনে ইভটিজিংয়ের ওপর দশ মিনিটের বক্তব্যও দিলাম। অথচ আমার শরীরের ওপর ছোট্ট বয়সেই বিশ্রী নজরে অনেককেই তাকাতে দেখেছি।

ছোটবেলায় ভয় পেতাম খুব। বাথরুমের দরজা বন্ধ করলে মনে হতো ভূতে গিলে খাবে। একদিন ওই দরজায় সত্যি সত্যিই ভূত এসেছিল। মানুষ নামের অমানুষ ভূত। সারারাত কান্না করেছিলাম। ফজরের আজানের সময় আবার ডাইরিতে সুইসাইড নোট লিখেছিলাম। ‘মা-বাবা, তোমরা অমানুষটাকে পারলে খুন করো। আমার বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। ওই অমানুষটা শুধু আমাকে না, আরও অনেক মেয়ের ক্ষতি করেছে। আমার মতো ছোট, আবার অনেক বড় বড় আন্টিদেরও। আমার দম বন্ধ লাগছে। আমি যাই।’

সেদিন ফ্যানের সিলিংয়ের সঙ্গে অন্তত দশবার মায়ের শাড়ি ঝুলিয়েছি। মায়ের শাড়িতে মায়ের গায়ের অদ্ভুত এক গন্ধ। সে গন্ধ আমাকে মাতাল করে তুলল। মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে মন চাইল। সুইসাইড করা হলো না।

প্রেমের জন্য আমার স্কুলের একটা সিনিয়র ভাইয়া সুইসাইড করল। তখন তার এসএসসি পরীক্ষা চলে। তিনটা পরীক্ষা দিয়েছিল। মেধাবী ছাত্র। আমার বান্ধবী মৌসুমীকে অসম্ভব ভালোবাসত। কিন্তু মৌসুমী সম্পর্কে যেতে চায়নি। অনেক বড় হওয়ার ইচ্ছে ওর। প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে পারেনি ভাইয়া। সুইসাইড করল। পরে মৌসুমীর আর পড়াশোনা হয়নি। শুনেছিলাম, ভাইয়া মারা যাওয়ার দুদিন পরই মৌসুমীকে মামা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়েছিল ওর পরিবার। ভাইয়ার বাবা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকায় রাখতে পারেনি মৌসুমীকে। উল্টাপাল্টা কথা শুনতে হয়েছে মৌসুমীর পরিবারকে। অথচ মৌসুমীর পাইলট হওয়ার ইচ্ছে ছিল খুব। একহারা গড়ন। টকটকে ফর্সা মুখ। পাইলটের সাদা উর্দিতে কি অসম্ভব সুন্দর-ই-না লাগত মৌসুমীকে! এখন সে ক্লাস এইট পাস গ্রাম্য এক সরল বউ, যার চোখের নিচে রাজ্যের না পাওয়ার গ্লানি।

আরও একবার মরতে ইচ্ছে হলো মা হারানোর পর। মাকে কবরে নামানো হচ্ছে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে অনেক রকম কথা বলছে। এরই মাঝে বড় মামি বললেন, ‘মা মরে গেলি বাপ হয় তাওই। এরে কপালে দুঃখ আছে।’

মা মারা যাওয়ার পর মন খুলে কাঁদতে পারছিলাম না। মামির ওই কথায় কান্নায় দু’চোখের পাড় ভাসল।

বাসায় ফিরতেই চার বছরের ছোট্ট ভাই বলল, ‘আপু, আম্মুর ওখানে গরম লাগবে না? আম্মু তো ফ্যান ছাড়া থাকতে পারে না। আব্বু তো ফ্যান দিল না!’ রাতের বেলায় খেলনা টেলিফোন ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ‘মা তোমার গরম লাগে? ফ্যান দিয়ে যাব? আমি আর আপু আসি?’ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। তখনই মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। সে রাতেও আরেকটা সুইসাইড নোট লিখলাম। মৃত মায়ের কাছেই লিখলাম। বাবা বা ভাইয়ের কাছে লিখতে মন চাইল না। লিখলাম, ‘তোমাকে ছাড়া আমি অচল। কোনোদিন ভাত রান্না করিনি। প্রতিদিন খেয়েছি। খেতে চাইতাম না, তুমি মুখে তুলে জোর করে খাইয়েছ। অথচ আজ আমাকে খাইয়ে দেওয়ার তুমি নেই। উল্টো ছোট ভাইকে চার ঘণ্টা গল্প করে খাওয়াতে হয়েছে এই আমাকেই। ভাই আমার কান্না সহ্য করতে পারছে না। তাই হাসতে হাসতেই খাইয়ে দিতে হয়েছে। মা, আমি হাসির অভিনয় করতে পারছি না। বয়স মাত্র তের। কীভাবে পারব বলো? নিজের দায়িত্বই তো নিতে পারি না। ভাইয়ের দায়িত্ব কীভাবে নেব? আমি আসি তোমার কাছে?’

মায়ের কাছে লিখেও সুইসাইড করা হয়নি। কারণ আমার ভাই। আমি যখন সুইসাইড নোট লিখছি, তখন পাশে এসে বলল, ‘আম্মু কই? আম্মু কই? আমি আম্মুর কাছে ঘুমোব।’ ওকে নিয়ে বিছানায় গেলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ালাম। ঘুমের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে আধো আধো কণ্ঠে বলল, ‘আম্মু!’

আবার সুইসাইড করতে ইচ্ছে হলো, যখন আব্বু নতুন করে বিয়ে করবে বলে শুনলাম। আমার মন সায় দেয়নি। অন্য কাউকে কীভাবে মা ডাকা সম্ভব! অসম্ভব কিছু আমার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াল। অনেকে বোঝাতে লাগল। ‘ভাইয়ের বয়স কম। আমার বয়স কম। আর বাবা তো আর ইচ্ছে করে বিয়ে করছে না।’ কোনো লজিকই আমাকে টলাতে পারেনি। সম্মতি দিইনি। তবুও আব্বু বিয়ে করল। যেদিন নতুন একজনকে ঘরে আনল, সেদিন নতুন সুইসাইড নোট লিখলাম। ছোট ভাই নতুন মায়ের কাছে যাচ্ছে, কিন্তু আমার হাতে ছাড়া খাবার খায় না। আমি না থাকলে ওর মুখে খাবার তুলে দেবে কে? সব ভেবে সুইসাইড করা হলো না।

পারিবারিক জটিলতা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে আমার সুইসাইড নোটের সংখ্যাও। নাম্বারিং শুরু করলাম। আজকের নম্বরÑ তেরশ’ নিরানব্বই।

ছোট ভাই বর্তমানে নিজের মতো চলতে পারে। পড়ালেখার কারণে আমি অন্য জেলায়। আমার জন্য কারওর প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এমন কেউ নেই, যার কথা মনে করে সুইসাইডের দ্বার থেকে ফিরে আসব।

গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন চলছে। এখনই শিক্ষিত বেকার বলে মনে হয়। আজকের নোটে লিখলাম, ‘এতদিন মৃত্যুর পথে কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতার কারণে আমার সুইসাইড করা সম্ভব হয়নি। আজ আমার কোনো পিছুটান নেই। অথচ বেকারত্বের গ্লানি বাড়ছে তো বাড়ছেই। বর্তমানে আমার দেশে অন্তত সত্তর শতাংশ সদ্য গ্রাজুয়েটের চাকরি নেই। আমি মেধাবী। হয়তো বছরখানেক চেষ্টা করলে চাকরি জোগাড় হবে। কিন্তু বাকি সবার কবে হবে? আমার মৃত্যুতে কারওর কোনো ক্ষতি হবে না। আমার বাবা ভাই বোন রিলেটিভ বা কাছের বন্ধুরা ক’দিন মনে করবে। এরপর- ‘মুছে যাক হলুদ পাতার দিন।’ কোথাও কিছুই হবে না।

অথচ সুইসাইড করতে পারছি না। আমার চোখের সামনে পাখি। সিনিয়র বড় ভাইদের মতো পরিচিত যারা সুইসাইড করে মারা গেছে তাদের প্রত্যেকের চেহারা ভাসছে। আর মন বলছে-
‘হলদে পাতায় রোদের হাসি থাকুক
নতুন করে বাঁচার মানে শিখুক।’

 
Electronic Paper