স্বগতোক্তির মতো কিছু সত্য কবিতা

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

স্বগতোক্তির মতো কিছু সত্য কবিতা

জোবায়ের মিলন
🕐 ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১

স্বগতোক্তির মতো কিছু সত্য কবিতা

ছোট্ট একটি বই। মলাট উপরে লেখা নাম, ‘যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা’; নিচে লেখা কবির নাম- মামুন রশীদ। আর মলাট ভিতরে মাত্র চৌদ্দটি কবিতা; অথচ উজ্জ্বল। ইতোপূর্বে এমন বই হাতে পড়েছে, বইয়ের ভিতরের ঔজ্জ্বল্যও চোখে পড়েছে কিন্তু ‘যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা’ বইটির কবিতায় যে আলো- তা কি সূর্যালো না ভরপূর্ণিমালো তা ঠিক ঠাওর করতে না পারলেও- একটা আলোর দ্যুতি আমার পাঠক-চিত্তকে যে আলোড়িত করেছে তার কোনো দ্বিতীয় মত নেই।

গ্রন্থটির নামকরণে একটি বাড়তি জোর প্রত্যক্ষ করেছি প্রথমেই। পড়তে গিয়ে সে জোর অনুভব করেছি। লক্ষ্য করেছি, গ্রন্থে কবিতা সংখ্যা কম, তবে কমের মধ্যে যে বেশি নিহিত রয়েছে তা অনেক বেশিকেও ছাড়িয়ে যায়। ‘কিছুটা স্মৃতি, কিছুটা কল্পনা আর কিছু রৌদ্রের ঝিলিক/ সারাদিন খুচরো পয়সার মতো গুনতে থাকি।/ জান্তেপিকে মনে পড়ে।/ জটিল নিদ্রা ভেঙে তাকে কেউ না ভাবলেও/ আমি জানি জ্যোৎস্নার আঙ্গুল জড়ানো লাজুক মুখে/ তুমি স্থির হয়ে আছ।’ (১)। কবিতাগুলোর কোনো শিরোনাম নেই। কেন নেই? না থাকারও যুক্তি আছে। সংখ্যানুক্রমে সাজানো কবিতাগুলো প্রথম থেকে শেষ কবিতাটি পর্যন্ত জোড়া দিলে শেষতক একটি কবিতাই বের হয়। সেই একটি কবিতা, প্রেমের।

মামুন রশীদ একজন সময়-অভিজ্ঞ কবি। সময়কে অনুধাবন করে, ছিঁড়ে-চিরে তার কবিতা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়, অতীতকে অস্বীকার না করে। পাঠ থেকে লক্ষ্য করলাম, গ্রন্থটিতে কবি ঠিক আগের মতো না বা গত পরশু বা গতকালের মতোও না। এখানে তিনি একেবারে নতুন। একেবারে ভিন্ন বিজ্ঞ। ভিন্নরকম করে উদ্ভাসিত। ‘ঝিরিঝিরি বাতাস আমার ভালো লাগে। ঝমঝম বৃষ্টি আমার ভালো লাগে।/ রোদেলা আকাশ আমার ভালো লাগে। পূর্ণিমারাত আমার ভালো লাগে।/ সবুজ পাতাদের আমার ভালো লাগে। শান্ত নদী আমার ভালো লাগে।/ শিউলি ফুলে ছেয়ে থাকা উঠোন আমার ভালো লাগে। বকুল, তোমাকে ভালো লাগে।/ এইসব ভালো লাগাকে ভালোবাসতে দেখি/ নোংরা ফুটপাত, ডাস্টবিনের পাশে সূর্যমুখীর মতো এক শিশু/ ভাতের থালা হাতে বসে আছে/ সকল ভালো লাগা উপেক্ষা করে।’ (১৪)।

কবি স্বীকার করেছেন ‘যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা’। কবিতাগুলো কি শুধুই প্রণয়ের, খুচরা প্রেমের? দেহে দেহে মিলনে বাসনার? (‘লুপ্ত অতীতের স্তব্ধ গল্পখ-/ বেদনার ছায়া থেকে অল্প আলাদা হয়ে/ পরিণয়সূত্রে মেলায় অস্পষ্ট জগৎ।/ ব্যর্থ লোকপুরাণ, রূপকথা, হারিয়ে ফেলা শাশ্বত অন্ধকার, আষাঢ়ী পূর্ণিমায় ছড়িয়ে দেয়/ খুলির অট্টহাসি, পায়রার জলরাশি।/ তোমার হাড় হিম করা ফটোগ্রাফি,/ কতরকম পাগলামি, রূপালি ঝিলিক/ স্মৃতির হাত ধরে জমা হয় লুতুপুত ভাবনার ভেতর।’ (৩)। মনে হয় না। একটা জেদ অঙ্কিত দেখা যায় চরণতলে। আবার একটা তীব্র আকাক্সক্ষাও আঁকা দেখা যায়। একটা মানচিত্রের ছবিও তার ভিতরে। আঁকাটা স্বৈরাচারী মনোফলের রস না। সুশীল তুঁতফলের মতো। মাটিতে পড়তেই ভিজে যায় মাটি। ভরাট বুক মুহূর্তে খালি করে দেয়। মুহূর্তে বুকটা কোথায় যেন উড়ে যায়। পরের কবিতায় তা আবার নেমে আসে। একটা উদাস বাতাস বইতে থাকে শূন্যতার ভিতরে। সে বাতাসে প্রেম প্রস্ফুটিত অর্থবহতা নিয়ে। স্তব্ধতা, অস্পষ্ট জগৎ... শুধু তুমি-আমির ছালে আবদ্ধ নয়ান না। তারও ভিতরে আরও অনেক কথা। কথাটা মুখ লুকোনো, কিন্তু আঁচটা স্বচ্ছ। ভারী। মজবুত। এখানেই মামুন রশীদ শিক্ষিত। কৌশলী ও কুশলী। একজন কবির এ ভাবগাম্ভীর্য না থাকলে তাকে পড়ে আনন্দই যে নেই। মামুনে পাঠের আনন্দ আছে, বোধবুদ্ধ হওয়ার অবসর আছে। চেতনে ও চৈতন্যে ভাসার সুযোগ আছে। দু’একটি বানান পিছলে যাওয়া বাদ দিলে তার কবিতাগুলো ভালো লেগেছে।

‘মেঠো পথ, যেখানে কালো পিচের আঁচড় পড়েনি কখনো/ তার বাঁক ধরে হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ডুমুর গাছ/ জানে না, সামনে কীরকম নীরবতা/ কোন ভূমিকা নিয়ে পথ তার দিকে/ নির্দেশক মোরগ ঝুলিয়ে রেখেছে।/ যতোই হন্যে হয়ে খোঁজো, হারিয়ে যাওয়া মার্বেল/ যেনো মায়াহরিণ, তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রোজ লোভ দেখাবে,/ সারারাত পাশে বসে জ্যোৎস্না মাখাবে,/ টেনে নিয়ে যাবে রহস্যের দেবদারু বনে।/ যেন ভুলে যাও মানবজীবন, জন্মদিন, নিঃসঙ্গতা।’ (৭)।

‘মৃত্যুকে দূরে রেখে ছায়াকে আদর করি/ চুমো খাই।/ তন্দ্রামগ্ন চোখ আচমকা দেখিÑ/ ছায়া-মৃত্যু একাকার, দুজনে দুজনার/ জড়াজড়ি, হুটোপুটি।/ আমি সরে যাই দূরে, অচেনা রাজপথে/ পড়ে রয় শুধু খুনসুটি।’ (১০)।

মানুষ কেন দিস্তা দিস্তা কবিতায় ঠাসা বই বের করে! যেখানে গাছে আগাছায় মিলেমিশে ছাল ছাড়া বাগানের ছলনা তৈরি হয়! বুঝি না। কবিতার মতো কবিতা হাতেগোনা কয়েকটি হলেই কি হয় না? পাঠক কি সত্যি অগুনতি কবিতা পড়তে চায়, না সামান্য কিছু ভালো কবিতা পড়লেই হয়? তালে-ডালে মিশিয়ে ঢাউস বই তৈরির অপাঙ্ক্তেয় নেশায় নির্ভরশীল না হয়ে নিখাদ কয়েকটি কবিতার একটি বই হওয়াই যথেষ্ট মনে করি। মনে করি, কবিতার জন্য তাই উত্তম। ফর্মার হিসাব বুঝি না। মামুন রশীদের কবিতার বইটি কত ফর্মার তাও জানি না। জানি, এর ভিতরে স্বগতোক্তির মতো সত্য চৌদ্দটি কবিতা যে তৃপ্তি দান করেছে, তার স্বাদ লেগে থাকবে অনেকদিন।

 
Electronic Paper