শিক্ষা-ঘুম

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

শিক্ষা-ঘুম

শহিদুল ইসলাম নিরব
🕐 ২:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৮, ২০২১

শিক্ষা-ঘুম

নয়ন নবম শ্রেণির ছাত্র। খেলাধুলায় বেশ ভালো। গানের গলাও সুমধুর। মুখের চেয়ে চোখ দিয়ে কথা বলতে বেশি ভালোবাসে। শিক্ষকরা কাছে ডাকলে শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। গতকাল ইংরেজি পরীক্ষা হয়েছে। স্যার আজকেই খাতা দেখে শেষ করেছেন। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা খাতা দেখা দু-চারদিন দেরি করলেও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা একটু আলাদা। একদিনের বেশি সময় নেন না। নয়ন নম্বর কম পেয়েছে একশ’তে সত্তর। হেডমাস্টার ডেকেছেন। শরীরটা থরথর কাঁপছে। তার নাম শুনলেই নাকি সব ছাত্রছাত্রীর মনে একই রকম ভীতির সঞ্চার হয়। যদিও আমার মনে হেডমাস্টার বলতে একটা বিনম্র, প্রগাঢ় ভালোবাসাপূর্ণ মুখাবয়ব ভেসে ওঠে এবং স্নেহময় একটা হাত হঠাৎ এলোচুলের সিঁথির ভাঁজ ঠিক করে দেওয়ার কথা মনে পড়ে।

নয়ন নরম পায়ে হেডমাস্টারের দরজায় দাঁড়াল। প্রবেশের অনুমতি চাইল। হেডমাস্টার তার স্নেহহীন রক্তচক্ষুতে চেয়ে বললেন, ‘ভেতরে আয়। তোর নম্বর এত কম কেন? বাড়িতে বসে কী করিস? বসে বসে মোবাইল ফোনে গেম আর ফেসবুক চালাস, তাই না?’
এবার নয়ন মাথা তোলেÑ ‘স্যার, আমি গেম, ফেসবুক কোনোটাই বুঝি না।’
‘তো তোর নম্বর এতো কম ক্যান? গত পরীক্ষায় ম্যাথ আর ফিজিক্সে খারাপ করেছিস। এবার ইংরেজিতে।’ নয়ন ভয়জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, আমি অনেক চেষ্টা করছি। পেরে উঠতে পারছি না।’
‘এদিক আয়, পেরে ওঠাই।’ বক্সের নিচ থেকে স্পেশাল বেত দিয়ে হাঁকিয়ে দিলেন বিশ-পঁচিশটা। নয়ন তিনটা খেয়েই সহ্যের সীমা হারিয়ে ফেলেছে। বাকিগুলো পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে মেঘের আঘাত সহ্য করেছে। এ যেন জেলবন্দি গুপ্তচরের শাস্তি। ছাত্র বুঝি চারপেয়ে জন্তু-জানোয়ার। পাছায় কষে চাবুক মারলেই দাপট বাজিতে প্রথম হওয়া যাবে। এ বেত কি শিক্ষকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বেত? নাকি ছাত্রকে ভালো করানোর বেত? আমি আজও তা বুঝে উঠতে পারিনি। নয়ন বাড়ি ফিরেছে। বাবা ইতোমধ্যে হেডমাস্টারের কাছ থেকে নম্বর কম পাওয়ার কথা শুনেছেন। বাবাও আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা লাথি বসিয়ে দিলেন। ছেলের মাকে বকতে থকলেনÑ ‘ছেলেকে ডাক্তার বানাবে। নাম করবে। বাবা-মা’র মুখ রাখবে...। তোর ছেলেকে তুই ডাক্তার বানা গিয়ে। আমি গেলাম।’
ঘর থেকে বের হয়ে যায় বাবা। মা নিরুপায়। না খেয়ে শুয়ে পড়ে। অভিমানে সে ছেলের কাছে যায়নি। খাবারও দেয়নি। নয়ন সারারাত জেগে ছিল। কতবার ভেবেছে মা আসবেন। আদর করে খাওয়াবেন। তার হাতের পরশে ঘুমাতে যাবে। আর আসেনি। পরদিন সকালেও নয়ন কিছু খেল না। সোজা স্কুলে চলে আসে। এলোচুলে পেছনের বেঞ্চে বসে ঝিমাচ্ছিল। আজকে আবার বাংলা স্যার খাতা নিয়ে এসেছেন। অবশ্য ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিনি ছাত্রদের প্রহার করেন না। আজ অবশ্য ব্যতিক্রম। তিনিও বেত নিয়ে এসেছেন। প্রথমেই নয়নকে ডাকলেন। এসে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। এ বিষয়েও আগের চেয়ে খারাপ করেছে। বাংলা স্যার বললেন, ‘আমি জানি মেধা যদি ক্যাপচার না করতে পারে মেরে লাভ হবে না। কিন্তু তোমরা তো মারমুখী শিক্ষকদের ভালো বলো। সেই সঙ্গে তোমাদের হেডমাস্টার সাহেবও মারমুখী শিক্ষকদেরই ভালো জানেন। অভিভাবকরাও তো তাই বলেন। আমিও বিস্তর বোঝানো বাদ দিয়ে পেটাব আর মুখস্থ করাব। ক্লাসে চুপ করে অপরাধীর মতো বসা থাকবে। পরে বাসায় গিয়ে বলবে স্যারের ক্লাসটা অনেক ভালো। কেউ নড়াচড়াও করতে পারে না। এটাই ভালো। পরিশ্রম কম। নম্বরও পেতে পারো কিন্তু জীবনযুদ্ধে লাভে আসবে কিনা জানি না।’
বেত তুলতেই দেখতে পেলেন নয়নের চোখে জল। আর মারতে পারলেন না। শরীরে হাত দিয়ে দেখেন আগুনের উত্তাপ। আর কালক্ষেপণ নয়। ওকে পিয়নের সঙ্গে হাসপাতালে পাঠানো হলো। ক্রমান্বয়ে অবস্থা খারাপ হলো। মা বাসা থেকে খাবার নিয়ে স্কুলে এসে জানতে পারে নয়ন হাসপাতালে। সেখানে দ্রুত ছুটে যায়। নয়ন কেবলই চোখ মিটমিট করছে। এ অবস্থা দেখে মা লায়লা বেগম আকাশফাটানো চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নয়ন ঘুমিয়ে পড়ে। খবর পেয়ে শিক্ষকরা ছুটে এলেন। অনেকে অনেক কথাই বলছেন। কিন্তু কোনো কথাই আমার যুক্তির কষ্টিপাথর খাঁটি বলে সায় দিচ্ছে না। ঘণ্টাখানেক পর মা’র জ্ঞান ফিরল। বাবা লাল চাঁন সরকার এসে গেল। নয়ন চোখ খুলতেই হেডমাস্টারকে দেখতে পেল। বলে উঠল, ‘স্যার, আমি চেষ্টা করেছি। রাত-দিন চেষ্টা করেছি। পারিনি। এই যে দেখেন এখানে শুয়ে স্বপ্নেও পড়লাম। আসলে স্যার আমি একটু গাধা। তবুও আপনাদের ও প্রতিষ্ঠানের মান রক্ষার্থে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আমাকে মাফ করবেন, স্যার। আমি পারিনি।’ এপাশেই দাঁড়িয়ে বাবা। তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বাবা, আমি কখনো ডাক্তার হতে চাইনি। এই যে দেখো আমি এখানে বেদনায় কাতরাচ্ছি আর ডাক্তার বাবু আমাকে সেবা না দিয়ে ওপাশে সিগারেট খাচ্ছে। সবাই দেখি টাকার পেছনে হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে। এখানে আসার পরে কী বলেছে জানো? আগে ফি দিতে হবে, তারপর দেখব। আর মা, তুমি খেতে দাও বা না দাও তোমার হাতের পরশে আমাকে ঘুমিয়ে দাও। আর অভিমান করো না। দাও হাত বুলিয়ে দাও। আমি ঘুমাব।’
মা হাত বোলাতেই অনন্ত শান্তির ঘুমকে আলিঙ্গন করে নয়ন।

 
Electronic Paper