সাহায্য

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

সাহায্য

সৌমেন রায় ১:০৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

print
সাহায্য

রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করে মামুন। সাইট ইঞ্জিনিয়ার। বাসা উত্তরায়, অফিসও উত্তরাতেই কিন্তু প্রজেক্ট বসুন্ধরায়। সকাল আটটার আগেই তাকে রওনা দিতে হয়। না হলে রাস্তায় যে জ্যাম পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়।

কোম্পানির চাকরি আবার একটু দেরি হয়ে গেলে নানা রকম কথা শুনতে হয়। প্রজেক্ট আবার বসুন্ধরা গেট থেকে বেশ ভিতরে, হেঁটে যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সারাদিন কাজ করে বাসায় পৌঁছাতে প্রায়ই রাত আটটা বেজে যায়। এভাবেই চলছিল দিনগুলো।

সাপ্তাহিক ছুটি নেই বললেই চলে। শুক্রবার যেহেতু সরকারি ছুটি, সেদিন প্রজেক্টে নানা রকম লোক আসার সম্ভাবনা থাকে। ফ্ল্যাট কেনার জন্যও আসে। এজন্যই কোম্পানি সেদিন ছুটি দিতে চায় না। আগতদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। বোঝাতে হয়। ফ্ল্যাটের বিষয়ে কথা বলার জন্য একজন ইঞ্জিনিয়ার থাকলে ভালো হয়। তাই সাইট ইঞ্জিনিয়ারদের শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি মানা। ছুটি নিতে হবে সপ্তাহে অন্য কোনো দিন। মামুনের ছুটি মঙ্গলবার। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ে তাকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রজেক্টে আসতে হয়। না এসে উপায় নেই। কাজে আবার কোনো ভুল হয়ে গেলে ইঞ্জিনিয়ারকেই জবাবদিহি করতে হয়। সকাল নয়টায় মামুন প্রজেক্টে এসে, ফোরম্যানের সঙ্গে কাজের কথা বলছিল।

পরের ছাদটা তাড়াতাড়ি ঢালাই দিতে হবে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। সময়মত কি প্রজেক্ট উঠানো যাবে? এমন সময় একটা লোক এসে হাজির। বয়স ষাটের কাছাকাছি। বেশিও হতে পারে। খিটখিটে রোগা, মনে হয় খাওয়া ঠিকমতো হয় না। কোমরটা সামনের দিকে বাঁকানো, চুল আধাপাকা, দাঁত কিছু পড়েছে। পরনে একটা গামছা ছাড়া কিছু নেই। হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগ তাতে মনে হয় কিছু কাপড় আছে।মামুন চেয়ারে বসে ছিল। কাছে এসে হাতজোড় করে সেই লোকটি বলল- স্যার, কাজের জন্য ঢাকা এসেছিলাম ছিনতাইকারী সব নিয়ে নিয়েছে। এখন বাড়ি যাওয়ার টাকা নেই। যদি কিছু সাহায্য করেন। তাহলে বাড়ি যেতে পারি। দেখে খুব মায়া হলো মামুনের। জিজ্ঞাসা করল, বাড়ি কোথায়?
রাজশাহীতে।
এখানে তো কন্ট্রাক্টরের কাজের লোক দরকার। এখানেই কাজ করেন।
এসব কাজ কী আমি করতে পারি স্যার! এগুলো কম বয়সী ছেলেদের কাজ।
তাহলে কী কাজের জন্য ঢাকায় এসেছেন?
বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি।
চাকরি কে দিতে চেয়েছিল?
আমাদের গ্রামের এক লোক।
সেই লোকের ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর আছে?
ছিল। সব হারিয়ে ফেলেছি।
বাড়িতে কে কে আছে?
ছেলে-মেয়ে আছে, সবার বিয়ে হয়ে গেছে।
ছেলে-মেয়ে দেখে না?
না স্যার, ছেলে মেয়ে কেউ দেখে না।
তাহলে বাড়িতে গিয়ে কী করবেন?
বাড়ি গিয়ে ঠিকানা জোগাড় করে আবার আসব, আর না হলে বাড়িতেই টুকটাক কাজ করে খাব।
বাড়ি যেতে কত টাকা লাগবে?
আড়াই-তিনশ’ টাকা হলেই হবে।
আপনি যদি টিকিট কাউন্টারে গিয়ে আপনার সমস্যার কথা বলেন। ফ্রিতেও নিয়ে যেতে পারে।
বলেছিলাম। নিয়ে যায় না।
মামুন, ফোরম্যান স্বপনকে ডেকে বলল, সবাইকে বল কেউ যদি সাহায্য করে।
স্বপন বলল, স্যার দুই-চার টাকা দিয়ে ছেড়ে দেন। এভাবে বেড়ানো তাদের অভ্যাস। এটা তাদের ব্যবসা স্যার।
সত্যিও তো হতে পারে। আবার একদিনের কথা মনে পড়ে গেল মামুনের। এক দোকানে সন্ধ্যায় প্রায় প্রতিদিন বসত মামুন। আড্ডা দিত। সেই দোকানদারের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। এক সন্ধ্যায় এক লোক এলো, সঙ্গে এক মহিলা; মহিলার কোলে বাচ্চা। আবার ওই লোকের সঙ্গেও এক বাচ্চা। জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। মনে হয় কয়েক দিন ধরে খায়নি। কাপড় ছেঁড়া আর ময়লা।
হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললÑ বাবা, কিছু সাহায্য করেন। কয়েক দিন ধরে খাইনি।
কথাগুলো এমনভাবে বলল, দেখে মামুনের মায়া হলো। সে সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ টাকা বের করে দিল। মামুনের কাছে টাকা নিয়ে দোকানদারের দিকে হাত বাড়াল। দোকানদার টাকা না দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলে লোকটি চলে গেল।
দোকানদার মামুনকে বলল, কেন টাকা দিলেন?
গরিব মানুষ। নিক।
আরে এ তো গরিব না। এটা তার ব্যবসা। এটা করে সে খায়। ষোল বছর আমি এই এলাকায় থাকি। আমি চিনি।
তা আগে বলবেন না। তা হলে দিতাম না।
মামুনের মনে হলো এই লোকও আবার ওই রকম নয় তো! আবার নাও তো হতে পারে।
কেউ পাঁচ টাকা, কেউ দশ টাকা, কেউ বিশ টাকা দিল। মামুন নিজেও পঞ্চাশ টাকা বের করে দিল। সবার কাছে উঠানো হলে হিসাব করে দেখা হল টাকা উঠেছে তিনশ’ বিশ টাকা।
মামুন বলল, তিনশ’ বিশ টাকায় কি আপনার যাওয়ার টাকা হবে?
লোকটি ছলছল চোখে বলল, হবে। আল্লাহ আপনাদের ভালো করবে।
টাকাটি নিয়ে সে সেখান থেকে খুশিমনে রওয়ানা দিল। লোকটি চলে গেলে তাকে নিয়ে নানা কথাবার্তা হতে লাগল। কেউ বলল, এটা তার ব্যবসা। কেউ বলল, সত্যি তার কাছে বাড়ি যাওয়ার টাকা নেই। আবার কেউ বলল, টাকা নেই ঠিক আছে কিন্তু পরনে লুঙ্গি বা প্যান্ট নেই কেন। গামছা পরেছে কেন। আসলে পরনের কাপড় তার আছে সে ইচ্ছে করে পরেনি। যাতে সাহায্য পেতে সুবিধা হয়।
অনেকেই তার কথায় সায় দিয়ে বলল, ঠিক বলেছে, স্যার।
ফোরম্যান স্বপন বলল, আর গবেষণা করতে হবে না। যে যার কাজে যাও।
সবাই যে যার কাজে চলে গেল।
সাড়ে এগারটার দিকে সবাই টুকটাক নাস্তা করে। কেউ চা খায়। সাইটে চা-ওয়ালা আসে। আর ভালো কিছু নাস্তা খেতে হলে যেতে হবে এখান থেকে প্রায় এক দেড় কিলোমিটার দূরে। সেখানে কয়েকটি দোকান আছে।
মামুনের মনে হলো, আজ দোকানেই যাই। হেঁটেও আসি আর নাস্তাও করে আসি। দোকানে নাস্তা করতে এসে দেখল সেই লোক, যে তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে এসেছিল। সে আবার এই দোকানে এসে তাদের কাছে যেভাবে সাহায্য চেয়েছিল, সেভাবে আবার সাহায্য চাচ্ছে। মামুন দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল যাতে সেই লোকটি চিনতে না পারে।
এখানেও সাহায্য চেয়ে প্রায় একশ’ টাকা পেয়ে গেল। টাকা উঠানো হয়ে গেলে মামুন সেই লোককে গিয়ে ধরে ফেলল। মামুন রেগে বলল, আমাদের কাছ থেকে না আপনি তিনশ’ বিশ টাকা নিয়ে এলেন। বাড়ি যেতে কত টাকা লাগে?
লোকটি বোকার মতো চেয়ে রইল যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।
সঙ্গে অন্যান্য লোকও বলে উঠল- কী! আপনার কাছ থেকেও টাকা নিয়ে এসেছে!
শুরু হয়ে গেল সেই লোককে উদ্দেশ্য করে গালাগালি। একজন বলল, বয়স তো কম হয়নি। এই বয়সেও ধান্দাবাজি। লজ্জা করে না! অন্য লোকজনও গালাগালি শুরু করল।
যেন কিছুই হয়নি এরকম একটা ভাব দেখিয়ে লোকটি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে দোকান থেকে বেরিয়ে চলে গেল। হয়তো অন্য এক শিকারের খোঁজে।