‘কলেবর বাড়িয়ে-কমিয়ে বড় বা ছোটকাগজ হয় না’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

‘কলেবর বাড়িয়ে-কমিয়ে বড় বা ছোটকাগজ হয় না’

অরবিন্দ চক্রবর্তী, সম্পাদক, মাদুলি ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

print
‘কলেবর বাড়িয়ে-কমিয়ে বড় বা ছোটকাগজ হয় না’

লেখক সৃষ্টির আঁতুড়ঘর লিটল ম্যাগাজিন। নবীন লেখকদের অধিকাংশ হাত পাকান এখানে লিখে। লিটলম্যাগচর্চার নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ‘মাদুলি’ সম্পাদক অরবিন্দ চক্রবর্তী। সঙ্গে ছিলেন শফিক হাসান

মাদুলির প্রথম সংখ্যা কখন প্রকাশিত হয়? কোন লক্ষ্য থেকে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন? অর্জন বা বিসর্জন কী?
‘মাদুলি’র প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০১০, কবি বিনয় মজুমদার সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় সংখ্যার প্রকাশ নভেম্বর ২০১১, প্রসঙ্গ নিসর্গ (বাংলা সাহিত্যে যেভাবে প্রকৃতির ব্যবহার)। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর তৃতীয় সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ডিসেম্বর ২০১৭ সালে। বিষয়Ñ বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও তার কর্ম, চলচ্চিত্রজীবন, স্বপ্ন। মাত্র তিনটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েও বহু পাঠকের আগ্রহ রয়েছে মাদুলির প্রতি, ব্যাপারটিকে আমি অর্জন বলে মনে করি। বিসর্জনের কিছু আপাতত দেখছি না।

বর্তমানে লিটলম্যাগচর্চা কেমন হচ্ছে? আপনার দৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ম্যাগ কোনগুলো?
এর ওর থেকে কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-ভ্রমণ সংগ্রহ করে ছেপে দেওয়ানির্ভর সাহিত্যপত্রিকাচর্চা বর্তমানে হচ্ছে। এখন চোখরাঙানো লিটলম্যাগ নেই বললেই চলে; অধিকাংশই অধুনালুপ্ত, দু-চারটি টিকে আছে।

লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা কতটুকু? বর্তমানে লেখক সৃষ্টি হচ্ছে কি?
লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা অপরিসীম। তবে আজ এর উপযোগিতা আছে কিনা ভাবনার বিষয়। এখন লিটলম্যাগে না লিখে ফেসবুকে লিখে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই প্রবণতাকে ভালো বা মন্দ এখনই বলছি না। তবে একটা সেন্সর প্রক্রিয়া থাকা দরকার বলে আমি মনে করি। বর্তমানে লেখক সৃষ্টি হচ্ছে ঠিকই। এর পাইপ লাইন হিসেবে লিটলম্যাগ ভূমিকা রাখছে সামান্য।

সম্পাদনায় কী ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করছেন?
সম্পাদনা বা সাহিত্যবিষয়ক কাজ করবেন আর বাধা থাকবে না, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি করি, সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কাজ করে যাওয়াই একজন দক্ষ সম্পাদকের চ্যালেঞ্জ।

কী বৈশিষ্ট্যে লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রিকাকে আলাদা করবেন? ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক কাগজের কী পার্থক্য থাকা জরুরি?
কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা ট্যাগ চাপিয়ে দিয়ে লিটলম্যাগকে দেখা/ভাবা হোক, এটা আমি চাই না। প্রতিটি প্রাণীর আদল বা বৈশিষ্ট্য যেমন আলাদা তেমন প্রতিটি লিটলম্যাগের চারিত্র্য স্বতন্ত্র হয় বলে আমি আস্থা রাখি।

সম্পাদনা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? বিদ্যমান বাস্তবতায় লিটলম্যাগচর্চার গুরুত্ব কতটুকু?
আগামীকাল আমি কোন এলাকার বৃক্ষ থেকে অক্সিজেন নেব জানি না তো। ফলে, আপাতত পরিকল্পনা করতে পারিনি। এবং এও ভাবছি বা আমাদের ভাবার সময় এসেছে লিটলম্যাগচর্চার আদৌ দরকার আছে কিনা!

কোনো কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখেন?
হোক। হতে পারে। এমন আগেও হয়েছে। দেখার বিষয় যারা প্রতিষ্ঠান করছেন তারা পাঠকদের জন্য কী দিচ্ছেন। এবং তা সাহিত্যসমাজে দরকারে আসছে কিনা।

মাদুলি’র প্রকাশিত সংখ্যা কতটি? বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যাটি, কেন?
বিনয় মজুমদারের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোকে ঘিরেই মাদুলির পথচলা শুরু। সংখ্যাটি ওই সময়ের প্রেক্ষিতে বিস্ময়ও বটে। যখন বিনয়চর্চা বাংলাদেশে সবে শুরু। সাহিত্যসমাজে কবি বিনয় মজুমদার আজ যেভাবে একচ্ছত্রভাবে আলোচিত, এর পিছনে যত পত্রিকা, সাময়িকী, ব্যক্তি এবং পাঠকবলয় জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পত্রিকা ‘মাদুলি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এ দাবি অকপট রাখতে চায়। পূরক হিসেবে বলে রাখা যায়, ২০১০-এর এপ্রিলে প্রকাশ হওয়া ‘মাদুলি’র সংখ্যাটি পাঠকমহলে এতই সমাদৃত হয়েছিল, ৫০০ কপি ৭-৮ মাসের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায়। এরপরেও অনেক বিনয় অনুরাগী সংখ্যাটি খুঁজেছেন এবং আট-দশ বছর পেরিয়ে আজও পর্যন্ত জেরক্স কপি করে আগ্রহী পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে।

কথাসাহিত্যের কাগজ হাতেগোনা, কবিতার কাগজ অগণন। নেপথ্য রসায়ন কী বলে মনে করেন?
কবিতালেখকের সংখ্যাও বেশি। স্বাভাবিকভাবে কবিতাবিষয়ক উদ্যোগ বেশিই হবে।

লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
চিন্তার সমন্বয় হলে বা কোনো বিষয়ভিত্তিক আন্দোলন জারি রেখে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে গোষ্ঠীবদ্ধতা খারাপ না। এতে সময় লাভবান হয়। জানেন তো, সবকিছুরই ইতি-নেতি আছে। যে যেভাবে নেয় এবং তা ব্যবহার করে।

বিনয় মজুমদার, তারেক মাসুদকে নিয়ে বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। নির্দিষ্ট বিষয়ে সংখ্যা প্রকাশের সংকট বা সম্ভাবনা কী?
‘মাদুলি’র বিগত তিনটি সংখ্যার গতি-প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যের প্রতি নজর রাখলে আঁচ করা যায় আগামীর কর্মকা-ও হবে বিষয়ভিত্তিক। তবে একটি বিষয়কে আমি আলাদা করে জানিয়ে রাখতে চাই তা হলো- দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে কলেবর বাড়িয়ে দিলেই যেমন ‘বড়কাগজ’ হয় না, তেমনি তা কমিয়ে দিলেও ‘ছোটকাগজ’ হয়ে যায় না। ধরে নিতে পারেন, উল্লেখ্য বাক্যটি মাদুলির জন্য আত্মপক্ষ সমর্থন। কারণ, এ পর্যন্ত প্রকাশ হওয়া তিনটি সংখ্যাই কলেবরে বৃহৎ। সর্বোপরি ‘মাদুলি’র কর্মতৎপরতার সঙ্গে যারা জড়িত, সকল কর্মী, লেখক, পাঠক- সকলকে ভালোবাসা।