একটি ফুলকে বাঁচাব বলে

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ২০২১ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭

একটি ফুলকে বাঁচাব বলে

ফাহমিদা ইয়াসমিন ২:৩১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১

print
একটি ফুলকে বাঁচাব বলে

বড় রাস্তার খানিক দূরে গলির ভিতরে যে বস্তি আছে ওখানে ফুল থাকে। ১২ বছরের মেয়ে। মা-বাবার সঙ্গেই থাকে। তিনটা বড় ভাই আছে। কিন্তু তারা অনেক আগেই বউ নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। পঙ্গু বাবার সংসারে থাকলে তারা নাকি কোনোদিন মাজা সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। এরপর বাধ্য হয়ে ফুলের মা মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ নেয়। ফুলকে নিয়ে তিনজনের সংসার। একমুঠো খেয়ে বাঁচতে তো হবে!

আর ফুল একটা দোকানে ফুল বিক্রির কাজ করে। সে দোকানে ফুলের মালা, তোড়া তৈরিতে বেশ কয়েকদিন খুবই বেশি ব্যস্ত। ডিসেম্বর মাস শুরু। তাই এ ব্যস্ততা।

ডিসেম্বর তার খুব পছন্দের। বিজয়ের মাস। এই মাস আসতেই ফুলের মনে হয়- একটা বছরের যুদ্ধে সে জয়ী হলো। টিকে থাকতে পারল। ফেব্রুয়ারি, মার্চ, আগস্টও ওর প্রিয়। এ মাসের গুরুত্ব অত শত সে বোঝে না। তবে ফুল বিক্রি হয়। অনেক ফুল বিক্রি হয়! নিজের কিছু স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। মায়ের জন্য কিছু কিনতে পারে। এজন্যই অপেক্ষায় থাকে মাসগুলোর।

তিন বছর হলো ফুল বিক্রির পেশায় ফুল। সাভার স্মৃতিসৌধের পাশেই তার দোকান। ফুল বিক্রি করতে এসে এই অল্প বয়সেই অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। গত বছরের কথা। এক ভাইয়া-আপুকে স্মৃতিসৌধে নির্লজ্জের মতো বসে কী সব করতে দেখত। আবার সেই ভাইয়া-আপুই ১৬ ডিসেম্বর তোড়ায় তোড়ায় ফুল নিয়ে স্মৃতিসৌধে অর্পণ করে এলো।

এসব দেখে পরে দোকান মালিক গেদু কাকুকে সব বলেছিল। গেদু কাকু বললেন- তারা দুজনে নেতা-নেত্রী। তাদের অনেক কিছুই দেখতে নেই।
আর যেন কাউকে একথা না বলে, বারবার গেদু কাকু ফুলকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
ফুল অবাক হয়- সারা বছর যে জায়গাগুলোতে গরু ছাগল চরে বেড়ায়, ছেলে-মেয়েরা নির্লজ্জের মতো বসে থাকে সে জায়গাগুলো এক এক মাস এলে একদিনের জন্য এত মূল্যবান হয়ে ওঠে কেন? একদিন বাবাকেও বলেছিল। জানতে চেয়েছিল, ‘শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধে নাকি শুধু নির্দিষ্ট তারিখে সম্মান জানাতে হয়?’ দেশ ছিনিয়ে আনা আহত মুক্তিযোদ্ধা ছোট্ট মেয়ে ফুলের প্রশ্নে ফের আহত হন। তার মতোই কি তবে দেশও পঙ্গু হয়ে গেছে? আঁতকে ওঠেন তিনি।

ধীরে ধীরে ফুল বড় হয়ে ওঠে। খেয়ে না খেয়ে যুদ্ধাহত বাবা আর মাকে নিয়ে বড় হয়ে ওঠে। এখন বাবা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। লাঠিতে ভর দিয়ে চলেন।
ফুলের বয়স চলে আঠারো। ফুল কিনতে এসে ফুলকে চোখে ধরে যায় এক নেতার। তার ভয়ে এলাকা কাঁপে। ফুলও কিছু বলতে পারে না। বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেনে না নিলে তুলে বিয়ে করবে বলেও শাসিয়ে যায়। তবে এই শাসানোটাতে বেশ একটা গাঢ়ত্ব আছে। না করতে পারে না ফুলের মা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বাবা আরও একবার যেন হেরে যান। চুপচাপ মেয়ের দুই হাতকে চার হাত করে দেন।
তবে ফুলকে সে সুখেই রেখেছে। সব কিছু দিয়েছে। গুলশানে এখন তাদের নিজস্ব বাড়ি। আরও কোথায় কোথায় নাকি ফ্ল্যাট কিনেছে মেয়েজামাই। ফুলের মা আনন্দে গদগদ। মেয়ের সুখ দেখে কোন মা-বাবাই-বা আনন্দিত হয় না। কিন্তু ফুলের বাবা গাজী শমসের মেনে নিতে পারেন না কিছুতেই। বারবার একাত্তরের কথা মনে পড়ে। যুদ্ধের মধ্যে ঈদের কথা মনে পড়ে। কোনো আনন্দই তখন আনন্দ না। তাদের আনন্দ ছিল মাটির গন্ধে, তাদের আনন্দ ছিল পতাকার লাল-সবুজে, তাদের আনন্দ ছিল দেশমাতৃকায় বেড়ে ওঠা মানুষকে স্বাধীন করার নেশায়।

এখন ফুলের বয়স পঁয়তাল্লিশ। বিয়ের অনেক পরে অনেক চেষ্টায় একটা ছেলে হয়েছে। নাম রেখেছে বিজয়। ফুলই রেখেছে নামটা। ও জানে তার বাবার এই নামটা খুব পছন্দের। বিজয় বড় হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি হবে, কিন্তু পারছে না। নানা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার কোটায় একবারেই চান্স পেয়ে যেত। অথচ সার্টিফিকেট নেননি গাজী শমসের। নেননি বলতে আবেদন করেননি। অনেকবার বিজয়ের বাবা একটা ফর্মে স্বাক্ষর করে দিতে বলেছে। সে এখন রাজনীতির নামীদামি পোস্টে আছে। তার কথায় ক্ষমতাবান অনেকে ওঠে-বসে। স্বাক্ষর করলেই সার্টিফিকেটটা হয়ে যায়। গাজী সাহেবের একটাই কথা- তিনি মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কিন্তু তার চেতনা পঙ্গু হয়নি। তাকে যদি সার্টিফিকেট নিতেই হয়ে তবে তিনি ঘরে থাকবেন, প্রশাসন তার কাছে আসবে। এসে সার্টিফিকেট দিয়ে যাবে।
নাতিটা এসে বলেছিল- দাও না নানু, সই করে।

গাজী সাহেব নাতিকে আদর করে বলেছিলেন- এই যে দেশের মানুষ, এদের দু’একজন বাদে সবাই আমার প্রাণের স্বজন। তুমিও তাদের স্বজন করে নাও। মেধায় ইঞ্জিনিয়ার হও। এটাই যোদ্ধাপরিবারের আসল চেতনা। মুক্তিযুদ্ধে আসল যোদ্ধা কোনো সুবিধার জন্য যায়নি, বরং কোটি জীবন বাঁচাতে নিজের প্রাণ হাতে করে গিয়েছিল। এরপর আর কিছু না বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে অন্য রুমে গিয়ে বসেন।
নানার এসব কথা বিজয়ের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। একটা কথাও সে বুঝতে পারেনি, আর বোঝার ইচ্ছাও তার নেই। দেশ, স্বাধীনতা, মুক্তিযোদ্ধা, চেতনা শব্দগুলো তার কাছে কেবল শব্দই। নানার বাসা থেকে বের হয়ে আসতে আসতে শুধু ভাবছে- কাল বিজয় দিবস। অনেক কাজ পড়ে আছে। ফুল গোছাতে হবে। মালা লাগবে। শ্রদ্ধাঞ্জলির স্মারক তৈরি হয়েছে কিনা দেখতে হবে।

বারোটার আগেই ফুলের মায়ের কাঁধে ভর দিয়ে স্মৃতিসৌধের দিকে যান গাজী শমসের। হাতে দুটো গোলাপের কুঁড়ি। স্মৃতিসৌধে অনেক মানুষ। মন্ত্রী-ভিআইপিরা আসবেন বলে শক্ত বাধার প্রাচীর দিয়ে রাখা। অনেক চেষ্টার পরও সামনে যেতে পারেন না শমসের। লোকের ভিড় বাড়তে থাকে। লোকের চাপে অনেকটা ধাক্কাধাক্কিও শুরু হয়। বুড়ো মানুষ, চাপ সামলাতে পারেন না। ফুলের মায়ের কাঁধ থেকে হাতটা ছুটে যায়। পড়ে যান যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শমসের। হাত থেকে পড়ে যায় গোলাপের কুঁড়ি। তাকে হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কারও একজনের পায়ের ধাক্কায় দূরে চলে যায়। শমসের মাটি ঘেঁষে হেঁচড়ে সেদিকে হাত বাড়ান। অন্য কারও পায়ের নিচে চাপা পড়ে তার হাত। ফুলের কুঁড়ি আরও দূরে সরে যায়। পায়ের আঘাতে কুঁড়ির একটা একটা পাপড়ি খসে পড়তে পড়তে একসময় পায়ে থেতলে মিশে যায় মাটিতে। যুদ্ধ করে দেশকে বাঁচালেও আজ কোনোভাবেই গোলাপ কুঁড়িকে বাঁচাতে পারলেন না।

যুদ্ধে পা হারিয়ে এত দুঃখ-কষ্টে, চরম অভাবে এতগুলো বছর পার করেও কোনো দিন সে ভেঙে পড়েননি। কিন্তু আজ চরমভাবে ভেঙে পড়েছেন। উঠে দাঁড়াতেই পারছেন না। এদিকে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মাইকে বাজতে থাকল- মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...।