অন্ধকারের লিপি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

অন্ধকারের লিপি

আবুল কালাম আজাদ ২:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২১

print
অন্ধকারের লিপি

নবনীর দৃষ্টি ধূসর হয়ে আসছে। হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে। অনুভূতি শূন্য হয়ে যাচ্ছে। তারপরও একটা অনুভূতিকে নবনী প্রাণপণে ধরে রেখেছে যে, তাকে বেঁচে থাকতে হবে। সে এদের সবাইকে চেনে। সবার নাম জানে। অন্তুত উপযুক্ত কারও কাছে এদের পরিচয় বলার সময়টুকু পর্যন্ত তাকে বেঁচে থাকতে হবে।

নবনী হৃদয়খোলা হাসি-খুশি মেয়ে। আনন্দে থাকতে ভালোবাসে। অন্যকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতে ভালোবাসে। তাই সহজে সবাই ওকে বন্ধু করে নেয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই ওর বন্ধু সংখ্যা বেশি। অনেক মেয়ে, অনেক ছেলে ওর বন্ধু। তার মধ্যে ওরা তিন জন ছিল ভিভিবিএফ। যার মানে হলো, ভেরি ভেরি বেস্ট ফ্রেন্ড।

বিএফ বলতে সাধারণে প্রেমিক বোঝে। নবনীর কাছে বিএফ এর অর্থ হলো বেস্ট ফ্রেন্ড। নবনী ওদের বিশ^াস করত সবচেয়ে বেশি। নবনী যে কোনো প্রয়োজনে ওদের তিন জনের কাছে আগে সাহায্য-সহযোগিতা চাইত। ওরাও নবনীর কাছে কিছু চাইলে ফেরাত না। বইপত্র, নোট, এমনকি টাকা-পয়সাও।

সেই ওরা তিন জন হয়ে গেল কঠিন বিশ্বাসঘাতক, হয়ে উঠল শত্রুর চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। ওদের তিন জনের একজনের জন্মদিন ছিল। কথা ছিল একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে আর সব বন্ধুদের নিয়ে কেক কাটবে, আনন্দ করবে।

ওরা তিন জন সন্ধ্যার কিছু আগে নবনীকে বাসা থেকে গাড়িতে তুলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। নবনী এ প্রস্তাবে খুশি হয়েছিল। কিন্তু ওরা কথা রাখল না। কোনো রেস্টুরেন্টে না নিয়ে, ওরা নবনীকে নিয়ে এলো এই নির্মাণাধীন বাড়িতে। এখন নির্মাণকাজ বন্ধ। হয়তো করোনাকালের অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে এই বাড়ির মালিকও। তাই স্থগিত হয়ে আছে নির্মাণকাজ।

নবনী শুধু প্রশ্ন করে গেছে- এখানে কেন? আর সবাই কোথায়? তোমরা এ কোথায় নিয়ে এলে আমাকে?

উত্তরে ওদের মুখে ছিল কুৎসিত হাসি। ওদের মুখ আর বন্ধুর মুখ থাকেনি। হয়ে গেছে অজানা ভয়ঙ্কর এবং কুৎসিত কোনো পশুর মুখ। তিল তিল করে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ধুলোয় মিশে গেছে। মুছে গেছে এত দিনের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের পবিত্র সব ইতিহাস।

ওরা তিনজন হামলে পড়ে নবনীর ওপর। খুবলে খেতে থাকে নবনীর শরীরটাকে, যেন নবনী মৃত কোনো প্রাণী আর ওরা শকুন। সবকিছু দিয়েও নবনীর একটাই চিন্তা, চেতনা ধরে রাখতে হবে। মৃত্যুর আগে ওদের নাম বলে যেতে হবে। প্রতিশোধ নিতে হবে। এই বিশ্বাসঘাতকতার, এই পশুত্বের প্রায়শ্চিত্ত ওদের পেতেই হবে।

ওদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন, সবচেয়ে স্বল্পভাষী, যে ছিল সবচেয়ে অমায়িক সে বলল : তোমার জিহ্বটা মুখে নিয়ে একটু আদর করতে চাই। তারপর ছেড়ে দেব। আমাদের প্রিয় বন্ধু তুমি, তোমাকে মেরে ফেলব না। স্বেচ্ছায় তো কিছুই দিলে না। সবই জোর করে নিতে হয়েছে। বাঁচতে চাইলে জিহ্বাটা স্বেচ্ছায় দাও। নইলে আমরা তোমাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারব না।

নবনী মুখ খোলার শক্তি পাচ্ছিল না। জিহ্বা বের করার ক্ষমতা নেই তার। কিন্তু তাকে যে বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থেকে বলে যেতে হবে ওদের তিনজনের নাম-পরিচয়। অনেক কষ্টে নবনী জিবটা বের করে দিল। আদরে আদরে কামড়ে জিহ্বাটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। তারপর কুৎসিত বিকট হাসি। বলল, এখন তো কথাই বলতে পারবে না। কারও কাছে বলতে পারবে না আমাদের নাম।

নবনী তখন অপলক দৃষ্টি শূন্যে মেলে দিয়ে শুধুই ভাবছিল, একমাত্র মানুষই পারে এতটা নিষ্ঠুর হতে! একমাত্র মানুষের দ্বারাই এতটা জঘন্য আচরণ সম্ভব!

নির্যাতনের এই ধকল কাটিয়ে নবনীর পক্ষে আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়- বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ওরা অন্ধকারে নবনীকে একা ফেলে চলে আসে।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। নবনীর ভেতর একটাই অনুভূতি সক্রিয় আর তা হলো, আমি তোদের ছেড়ে দেব না।

নবনী হাতড়ে হাতড়ে পায় একটা ইটের টুকরা। তা দিয়ে পাষাণ মেঝেতে, হাতের নাগালের দেয়ালে লিখে রাখে ওদের নাম, আর ওদের বাবার নাম। যদিও অক্ষরগুলোর মেজারমেন্ট ঠিক থাকেনি, যদিও নবনী তার গতানুগতিক সেই ঝকঝকে টাইপ ধরনের লেখা লিখতে পারেনি, কিন্তু যা লিখেছে তা পাঠযোগ্য। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নিকষকালো অন্ধকারের ভেতর এভাবে লেখা সবার পক্ষে সম্ভব না।

ওরা খুব আরামে এবং নিশ্চিন্তেই নিজ নিজ বাড়িতে ছিল। পালাবার দরকার বোধ করেনি। ভেবেছে, ওদের নাম কে উদ্ধার করবে?
কিন্তু পর দিনই ওরা গ্রেফতার হয়ে যায়। খুব সহজেই গ্রেফতার হয়ে যায়। নবনীর সেই অন্ধকারে লেখা লিপিগুলো কথা বলে, মূল ঘটনাকে আলোতে নিয়ে আসে।

চোখে-মুখে-মনে মহাবিস্ময় নিয়ে ওরা রিমান্ড চেয়ারে বসে।

নবনীরা আমাদেরই কারও জননী, কারও ভাগিনী, কারও বা কন্যা। ওরা অপশক্তির কাছে মাথা নত করে না। ওরা পরাজিত হয় না। নিকষকালো অন্ধকারের ভেতরও ওরা লিখে যায় বিজয়ের ইতিহাস।

আমাদের দুর্ভাগ্য এটাই, কিছু মানুষ পোশাকের দোহাই তুলে নবনীর মতো সুশিক্ষিত, সুসভ্য, সংস্কৃতবান, মার্জিত রুচিসম্পন্ন বিজয়ী জননী, ভাগিনী, কন্যাদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে চায়, পশুদের পক্ষে কথা বলে নিজেদের পশু প্রমাণ করতে চায়।