ছুটির এক সকাল

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

ছুটির এক সকাল

ছন্দা দাশ ১:৫৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৮, ২০২১

print
ছুটির এক সকাল

মুক্তকেশী স্কুলের সামনে এসে ইন্দ্রাণী একটা গন্ধ পায়। গন্ধেই সে বুঝে গেছে সেলাই দিদিমণি আছে। এ গন্ধ তার বড় চেনা। সব ভালো মানুষগুলোর গায়ে নিজস্ব একটা গন্ধ থাকে তা দিয়ে তার চরিত্র প্রকাশ পায়। এসব ভাবনা ইন্দ্রাণীর নিজের। এসব ভাবনার সাথী কাউকে করতে নেই। একাই নিজের ভাবনা নিয়ে চলতে হয়। সেলাই দিদিমণি সবসময় সাদা কাপড় পরেন। এতে তাকে যেন আরও বেশি সুন্দর দেখায়। বীণা বলেছিল দিদিমণির বিয়ের পরদিনই নাকি তার বর মোটরসাইকেল অ্যাকসিডেন্ট করে মারা যায়। তারপর থেকেই উনি সাদা কাপড় পরেন। ইন্দ্রাণী ভাবে দিদিমণির তো বরের সঙ্গে ভালোবাসাই সৃষ্টি হয়নি। তাহলে কেন তিনি তার কথা মনে করে সব আনন্দকে দরজার ওপারে রেখে দিয়েছেন? দিদিমণির এখন সব ভালোবাসা ইন্দ্রাণীদের মতো স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে ঘিরে। কিন্তু তাতে কি দিদিমণি সব পূর্ণতা পায়? ইন্দ্রাণীর বয়স এখন বার পেরিয়ে তেরোতে। সে এখন অনেককিছু বোঝে। মা বলে পাকা। ইন্দ্রাণী এসব কারও কাছ থেকে শোনেনি, বই পড়ে আর মানুষ দেখে দেখে জেনেছে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতেই সে দিদিমণির বাসার সামনে এসে পড়েছে। এখন আর সেই গন্ধটা নেই। গেটের মুখের বিশাল স্থলপদ্মের গন্ধে ভরে আছে। পুজোর ঘর থেকে ধূপের গন্ধ আর পূজারির মন্ত্রোচ্চারণে সকালটা কেমন ভালো লাগায় ইন্দ্রাণী চুপ করে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। দিদিমণির ছোট ভাই অলক সে সময় হাতে গুলতি নিয়ে পাখি মারার জন্য বের হতে গিয়ে ইন্দ্রাণীকে দেখে বলল, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? অলক ইন্দ্রাণীর সঙ্গেই পড়ে। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। তবে কেমন জ্যাঠা জ্যাঠা ভাব। অলককে দেখলে ইন্দ্রাণীর অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। কেমন যেন নিষিদ্ধ এক জানালার অনুচ্চারিত গোপন কথা। ইন্দ্রাণী অলকের দিকে না তাকিয়ে বলে, তাতে তোর কী?

অলক বলল, আমার কী হবে? তুই এই সাত সকালে বোকা হাঁদির মতো দাঁড়িয়ে আছিস তাই ভাবলাম কিছু হয়েছে। ইন্দ্রাণী ইচ্ছে করেই কথা ঘোরাবার জন্য বলল, দিদিমণি কী করছেন অলক?
অলক বলল, তাই বল। তা না শুধু শুধু কথার প্যাঁচ।
দিদির পুজো শেষ হয়েছে এতক্ষণে।

ইন্দ্রাণী বলল, তবে আমি যাই। বলেই গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখে দিদিমণি পুজোর ঘর থেকে বের হয়ে আসছে। চুল খোলা। ভেজা চুল বেয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। কী সুন্দর কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ। ইন্দ্রাণীকে দেখে হাসল। অমনি চারপাশটা কেমন ‘কোমল মা’য়ের সুরে যেন বেজে উঠল। সংসারে কিছু কিছু মানুষের মতো সেলাই দিদিমণিও তেমনই যাদের ভাগ্যের কাছে কোনোরকম অনুযোগ, অভিমান থাকে না। ইন্দ্রাণীর মাথায় পুজোর ফুল ছুঁয়ে দিয়ে একটুকরো সন্দেশে মুখে পুরে দিল। তারপর বলল, তুই আমার ঘরে বোস। আমি পুজোর কাপড় বদলে আসছি।

ইন্দ্রাণী দিদিমণির ঘরে ঢুকেই চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়। পৃথিবীর সব ভালো মানুষদের গায়ে এমন গন্ধ থাকে। তারা যেখানেই যায় সে জায়গাটা মন্দির হয়ে যায়। মন্দির তো আর কিছু নয় কতগুলো সাধু মানুষের সঙ্গ। নইলে পাথরের মূর্তিতে কি সত্যিই ঈশ্বর আছে? মানুষের মধ্যেই জীবন্ত ঈশ্বরকে কেউ দেখে না।
দিদিমণি ঘরে ঢুকে ইন্দ্রাণীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, কী রে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী অত ভাবছিস? ঠিক যেন বট গাছটির মতো! দিদিমণি কাছে এসে দাঁড়ালে আলাদা একটা সম্ভ্রব জাগে। সেটা কেন ইন্দ্রাণী জানে না।
দিদিমণি এখন পুজোর কাপড় পাল্টে নীল পাড়ের সাদা খোলের পাটভাঙা একটা শাড়ি পরেছে। আর তাতেই যেন তার রূপ ফেটে পড়ছে। ইন্দ্রাণী ভাবছে, লাল শাড়িতে দিদিমণিকে ঠিক মা দুর্গার মতো লাগবে। কিন্তু ঠাকুর এত রূপ দিয়েও কেড়ে নিয়েছে তার আনন্দটুকু। কেমন নিষ্ঠুর মনে হয় তখন তাকে। এসব চিন্তা করতে গিয়ে তার বুকের ভিতর যেন একটা কষ্টের আগুন জ¦লে। এই কষ্ট খিদে পাওয়ার কষ্টের মতো না, মার খাওয়ার কষ্টের মতোও না। তার চেয়েও বড় কষ্ট।
তোর মা কেমন আছে রে ইন্দ্রাণী? অনেকদিন তোদের ওদিকে যাওয়া হয়নি। মাকে বলিস সামনের রোববারে যাব।
ইন্দ্রাণী বলল, শুক্রবারে কেন? মা তো আজই পাঠিয়েছে আমাকে তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে।
দিদিমণি বলল, আজ। কিন্তু বলেই আবার বলল, ঠিক আছে। কিন্তু এইবেলা হবে না রে। তুই থাক। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে সকাল সকাল বের হয়ে যাব।
ইন্দ্রাণী বলল, মা যদি বকে?
দিদিমণি বললেন, সে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই এখন বসে বসে কাল যে স্টিচ শিখিয়েছি তা ওই কাপড়ে করে দেখা।
বলেই সেলাই বাক্স খুলে ইন্দ্রাণীকে সুই-সুতো আর কাপড় বের করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
দিদিমণি এখন রাঁধতে গেলেন নিজের জন্য। একবেলা খাবেন। তাও নিরামিষ। কিন্তু ইন্দ্রাণীকে খেতে দেবেন অন্য রান্নাঘরে যেখানে অলকরা খায় মাছ-মাংস দিয়ে। সে দিদিমণির খাটে উঠে বসে বাইরে জানালা দিয়ে দেখে নিম গাছের পাতায় আলোর মাখামাখি। গাছে ছোট ছোট নিমফল। তার গন্ধ এসে লাগছে। তার আর সেলাই করা হয় না। লালচে রঙের গরুর চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এমন চোখ কেন মানুষের হয় না। যে চোখের ভিতর এক পৃথিবীর মায়া।