ভিন্ন চোখে সুমন্তপাঠ

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

ভিন্ন চোখে সুমন্তপাঠ

মাইনুল এইচ সিরাজী ১২:৫৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০২০

print
ভিন্ন চোখে সুমন্তপাঠ

এই সময়ের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক সুমন্ত আসলাম। এই সময় আর জনপ্রিয় কথা দুটো একটু ব্যাখ্যা করা যাক। সুমন্ত আসলাম লেখালেখি শুরু করেছেন নব্বইয়ের দশকে। চিত্রালী, চলতিপত্র, মৌচাকে ঢিল, কিশোরপত্রিকা, ভোরের কাগজ দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। মূলত ভোরের কাগজেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন, কিন্তু লেখক সুমন্ত আসলাম তাঁর জাত চিনিয়েছেন প্রথম আলোর আলপিনে লিখে। আলপিন সম্পাদনা করতেন। লিখতেন সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে কলাম বাউণ্ডুলে। এই বাউণ্ডুলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করেন পাঠকেরা। কেন? উত্তরটা এভাবে দেওয়া যায়— সাধারণ পাঠক যে কথা বলতে পারেন না, সুমন্ত যেন পাঠকের মনের খবর জেনে নিয়ে সে কথাগুলো আগ বাড়িয়ে বলে দিতেন বাউণ্ডুলেতে। তা-ও আবার একেবারে পাঠকের ভাষায়— সহজ-সাবলীলভাবে। ফলাফল— সুমন্ত আসলামকে পাঠক আপন করে নেন অতি সহজে। ২০০১ সালে যখন তার প্রথম বই স্বপ্নবেড়ি বেরোয়, হটকেকের মতো বিক্রি হয়েছে সেটা। ব্যস, তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

২০০১ থেকে ২০২০। সময়টা কম নয়। তবু তাকে এই সময়ের লেখক বলছি কেন? কারণ, বরাবরই তিনি সমকালকে ধরে রাখেন। ফুল-পাখি-লতাপাতা টাইপ অচলায়তন থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সযতনে প্রাসঙ্গিক কথা বলেন, সমকালীন ইস্যু নিয়ে ভাবেন। আর তাই তার ক্ষেত্রে ‘জনপ্রিয়’ বিশেষণটি বসাতে আমার মোটেও সংকোচ হয়নি। যদিও জনপ্রিয়তার বিষয়টাকে অনেকে বাঁকা চোখে দেখেন। এর কারণও অবশ্য আছে। এই ফেসবুক জামানায় জনপ্রিয় হওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। একটা স্ট্যাটাসে কয়েকশ’ লাইক পড়লেই যে কেউ তৈরি করে নেন হাজার হাজার মুরিদ। মুরিদমহল সিন্ডিকেট তৈরি করে বিক্রি করে ফেলেন দশ এডিশন বই। বই বিক্রি এখন ফুটপাতে তিনশ’ টাকার লাইট একশ’ টাকায় বিক্রির মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুমন্ত আসলাম সে পথে হাঁটার মানুষ নন। কারণ তিনি পাঠক তৈরি করে নিয়েছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, পাঠকের নিক্তিতে নিজেকে মেপে তারপর লেখক হয়েছেন।
কেন পড়ি সুমন্তের লেখা?
কিছুদিন ধরে বিভূতিভূষণ পড়ছি, পড়ছি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর আবু ইসহাক। বিভূতিভূষণের মুগ্ধকর বর্ণনা পড়ি। পড়ে যাই। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ক্লান্তিও আসে। পাঠক্লান্তি। বইটা বন্ধ করে রাখি কিছুক্ষণ। আবার পড়ি। যতক্ষণ পড়ি— ভালো লাগে। কিন্তু বন্ধ করতে সমস্যা হয় না। তবে মানিক-ইসহাককে বন্ধ করলে মনের মধ্যে খচখচ করে। একটা কৌতূহল খোঁচা দিয়ে মারে। জ্বালায়। মানিক, ইসহাকের কাহিনি কিছুটা একরৈখিক, পাঠকের মনে কৌতূহল তৈরি করে রাখে শুরু থেকেই। বিভূতির আখ্যান-পরিসর সে তুলনায় অনেক বিস্তৃত। কী জানি, উপন্যাসের সনাতনী কাঠামো হয়তো সে রকমই।
হুমায়ূন এসে আরেকবার সেই কাঠামো ভেঙেচুরে দিলেন। নাটকীয়তা, চমক আর ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’ পদ্ধতিতে উপন্যাস লিখে বাজিমাত করলেন। পাঠরুচিটাই পরিবর্তন করে দিলেন তিনি।

আধুনিক পাঠকের পালসটা ধরতে পেরেছেন সুমন্ত।এ বছর প্রকাশিত তার উপন্যাস যদি কখনো শুরু হয়েছে এভাবে— ‘দুঠোঁট চেপেই একটা হাসি দিল মেয়েটি। হাসিটা তাচ্ছিল্যের, আনন্দের, না নতুন কিছু শুনতে পাওয়ার— বোঝা গেল না। ...আবার আগের মতো একটা হাসি দিল সেমন্তী। বাঁ হাতের লম্বা নখগুলোর দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, একটা মানুষ খুন করতে হবে আপনাকে।’...উপন্যাস হচ্ছে ভ্রমণের মতো। আনন্দভ্রমণ। পাঠককে সঙ্গে নিয়েই লেখক এই ভ্রমণে বের হন। ভ্রমণে যদি আনন্দ না থাকে, শিহরণ আর কৌতূহল না থাকে তাহলে ভ্রমণ পানসে হয়ে যায়। ভ্রমণক্লান্তিতে পেয়ে বসে উল্টো। একটা সাহিত্যকর্ম তখনই সাহিত্য হয়ে ওঠে যখন পাঠক সেটা গ্রহণ করেন। পাঠক জল না ছিটালে লেখার অঙ্কুরোদগম ঘটে না। না ছিটানো বীজধানের মতো নষ্ট হয়ে যায় বদ্ধ মটকায়। সন্তান তখনই সন্তান, যখন সে ভূমিষ্ঠ হয়। সাহিত্যও তাই। সাহিত্যের ভূমিষ্ঠ হওয়া মানে পাঠকের মনে স্থিত হওয়া।

বুদ্ধদেব বসু তাই উপন্যাস শুরু করেন এভাবে— ‘হ’য়ে গেছে— ওটা হ’য়ে গেছে— এখন আর কিছু বলার নেই।’
কী হয়ে গেছে, কেন হয়ে গেছে? না জানা পর্যন্ত পাঠকের শান্তি নেই। সুমন্ত কৌশলটা ভালোই রপ্ত করেছেন। তার সঙ্গে ভ্রমণ তাই আনন্দদায়ক। শুরু করলে অপরূপ গন্তব্যে আপনি পৌঁছে যাবেন। যদি কখনো ছাড়াও আরও কিছু উপন্যাস লিখেছেন তিনি শহুরে মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখ নিয়ে। যেমন— তবুও একদিন। হিমু-মিসির আলির পরে বাংলা সাহিত্যে ওরকম কোনো জনপ্রিয় চরিত্র আমরা অনেকদিন পাইনি। সুমন্ত আসলাম এই উপন্যাসগুলোতে খুব যত্ন করে আরেকটা চরিত্র দাঁড় করাচ্ছেন— দন্ত্যন রুহমান। এই সময়ের পাঠকরা ইতোমধ্যে দন্ত্যন রুহমানকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন। এবং পাঠক এটাও ভাবছেন— আমিই দন্ত্যন রুহমান।

শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান দন্ত্যন। নিজেদের সীমাহীন সমস্যা বুকপকেটে যত্নে আগলে হেঁটে বেড়ায় শহরময়। ভিক্ষুক দেখে, পাগল দেখে, শ্রমজীবী দেখে। কখনো দেখে পুলিশ। কখনোবা রাতের পসারি। হাজারো অসঙ্গতির সন্ধান করে সে। কী এক দক্ষতায় সেগুলোর আবার সমাধানও করে দেয়।
দিনশেষে যখন সে বাড়ি ফেরে, পরিবারের সমস্যা বুকপকেটে রেখেই মা-বাবা আর বোনদের সঙ্গে মুগ্ধ সময় কাটায়। রঙ চায়ে চুমুক দিতে দিতে অন্যমনস্ক হয়। তার গাল পুড়ে যায়। আসলে সে স্বপ্ন দেখে— তাদেরও একদিন ভালো সময় আসবে। এবং কী আশ্চর্য, পাঠক একসময় আবিষ্কার করেন, দন্ত্যন রুহমানের স্বপ্ন সত্যিই পূরণ হয়ে যায় কী এক অবাক কৃতিত্বে— দন্ত্যন রুহমানের!

পাঠক তখন দন্ত্যন রুহমান হয়ে যান। ঘর পালাতে ইচ্ছে করে তারও। ইচ্ছে করে ফুটপাতে বসে সুফিয়া খালার সঙ্গে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেতে।
এইটুকু পড়ে আপনি যদি ভেবে বসেন সুমন্ত আসলাম হুমায়ূনের পথেই হাঁটছেন তাহলে বলি, আপনার জন্য তিনি লিখেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নধারার উপন্যাস অযান্ত্রিক। পাঠককে ঘোরের মধ্যে রেখে উপন্যাসের শুরু। শেষ করেও সেই ঘোর আর কাটে না। ঋজুকের বাবার বাংলোবাড়ি থেকে ঋজুক গল্প বলে যায়। অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয় পাশের অনাথ আশ্রম, লেকের জল, পাশের বিল্ডিংয়ের দুই তরুণী আর এক মহিলা— যিনি কিনা আবার ঋজুকের বাবার ব্যবসায়িক পার্টনার।

তরুণী, পার্টনার, অনাথ আশ্রমের মাঝে একটা যোগসূত্র যে আছে— সেটা পাঠক আবিষ্কার করে তখন, যখন বলা হয় লেকের মাছগুলো কেউ খায় না; কারণ এই মাছগুলো মানবভ্রুণ খেয়ে বেড়ে ওঠে। এভাবে একটা চমৎকার গল্প দাঁড় করান সুমন্ত আসলাম। উপন্যাসজুড়ে ঋজুক রাতের অন্ধকারে কবরস্থানে ঘুরে বেড়ায়। জীবিত হয়ে ওঠা মৃত মানুষদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের মৃত্যুর কারণ পাঠকদের শোনায়। পাঠক হঠাৎ বুঝতে পারেন না— এ লৌকিক না অলৌকিক। কিন্তু এই প্রশ্ন নিয়ে পাঠকের তেমন মাথাব্যথা হয় না, কারণ ততক্ষণে মৃত মানুষদের বয়ানে উঠে আসা সমাজের অসঙ্গতিগুলো নিয়ে ভাবনায় ডুবে যান পাঠক। আর ঋজুকের পিছু নেওয়া নূপুর পরা মৃত মেয়েটির সঙ্গে ঋজুক আর অনাথ আশ্রমের সম্পর্কের কথা শেষ মুহূর্তে জানতে পেরে পাঠক ভাবতে থাকেন— এ কোন পরাবাস্তব জগতে নিয়ে গেলেন সুমন্ত! এটা সে জগৎ নয় তো, ইতোপূর্বে যেখানে কাফকা নিয়ে গিয়েছিলেন মেটামরফসিসের মাধ্যমে!

নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে পছন্দ করেন সুমন্ত। অযান্ত্রিক তার মোক্ষম উদাহরণ। তার এই ভাঙা-গড়ার পথে সর্বশেষ সংযোজন প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন চা খেতে আসেন আমাদের বাসায়। সময়কে ধরতে পারার কথা বলছিলাম। এই উপন্যাসে কিশোরী সুমর্মির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে সময়ের হালচাল উন্মোচন করেছেন সুমন্ত। সমাজচিত্র অনেকে এঁকেছেন অনেকভাবে, কিন্তু সুমন্তের ভাবনাটা একেবারেই আলাদা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার স্বপ্ন কজনের পূরণ হয়? সুমন্ত আসলাম যেন সেই স্বপ্ন পূরণ করে দিয়েছেন তার উপন্যাসে। পাঠকের স্বপ্নবুননে টানা আর পোড়েনের ছন্দে মুখরিত হোক সুমন্ত আসলামের লেখার জগৎ। শুভকামনা।