অধিরোহিনী

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অধিরোহিনী

জারিন তাসনিম ৪:১০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২০

print
অধিরোহিনী

বাড়ির উত্তরপুবে গোয়ালঘরের সামনে নতুন গাইয়ের দুধ দোয়াচ্ছিল বিরু। একটু দূরেই অনিমেষ লোচনে জাম গাছে নতুন পাখির বাসার দিকে হাঁ করে চেয়ে আছে শ্রীমতি রত্না চণ্ডাল। নয়দিন আগে ছেলের বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক এসেছে এ গাই। সঙ্গে দুটো পাঁঠা আর একটা সাইকেলও এসেছে। তাতে রত্মর মন ভরেনি। উঠতে বসতে কথা শোনাচ্ছে ছেলে রমেশ্বর আর বউ সুতপাকে।

রত্নার  বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। আজকাল একটু ঝাপসা লাগে চোখে। একটির জায়গায় দুটো, সময়বিশেষে তিনটিও দেখছেন। তবে দুঃখের কথা কোনোটিই স্পষ্ট নয়। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে গিয়ে চমকে ওঠে রতœা। চামড়ায় কি সুস্পষ্ট ভাঁজ দেখা যায়! হুটহাট শরীর অবশ লাগে, পা ঝিমঝিম করে ওঠে। তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগে টুম্পার কথা মনে পড়লে। 

আদরের একমাত্র মেয়েকে অনেকদিন পর্যন্ত কাছে রেখে সেদিন সবে বিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের লোকেরা আইবুড়ো, ধাড়ি মেয়ে এসব বলাবলি করছিল। অমন না হলে কে জানে রত্না দেবী ইহজীবনেও মেয়েকে হাতছাড়া করতেন না। টুম্পার কথা মনে হতেই বুকের মধ্যে ফাঁকা বোধ হতে লাগল।

ভাবনায় বিয়োগ ঘটাল বিরু।
—মাসিমা, গাইয়ের দুধ দিন দিন কমছে। গাহেক কমাতে হবে।
বিরুর কথায় খেয়াল নেই রত্নার। পানের খিলি দলামোচড়া করে মুখে পুরলেন। ভাবছেন টুম্পার শ্বশুরবাড়িতে কুটুম যাওয়ার কথা। কন্যা সম্প্রদানের সময় মেয়েকে একদম খালি হাতে তুলে দিয়েছেন। ভারী অসন্তোষ ছিল জামাইবাড়ির। তবুও মেয়ের মায়ের মিষ্টি কথার ওপর বেশি কিছু চাইতে পারেনি।

অবশ্য চাইলেও দেওয়ার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। বিয়েটা ভেঙে যেত। বাড়িতে একটা অ্যালুমিনিয়ামের ঘড়ি আছে। চার কাঁটাওয়ালা। বাড়ির একমাত্র দামি বস্তু ঘড়িটি প্রায় দেড়শ’ বছর আগের। সিপাহী বিদ্রোহ তখন শেষের দিকে। রতœার স্বামী মৃত ধীরেশ্বর চণ্ডালের প্রপিতামহ ছিলেন অনেক বড় অফিসার। ব্রিটিশদের হয়ে কাজ করায় উপহারস্বরূপ (কিংবা ঘুষ) তিনি এ ঘড়ি পেয়েছিলেন। তারপর অব্ধি এ ঘড়ি আর বাইরে যায়নি। টুম্পার বিয়ের সময় মনে হচ্ছিল হাতছাড়া হয়েই যাবে, তাও ভগবানের কৃপায় এখনো টিকে আছে।

সাড়া না পেয়ে বিরু এবার একটু জোর গলায় বলে উঠল, মাসিমা শুনছো, দুধের পরিমাণ কমে গ্যাছে কিন্তু। দুই সেরের জায়গায় আজ আধাসের। ঘোষবাড়িতে দুধ না বিলোই, কী বলো?

রত্নার অসাড় মন হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। যেন স্তব্ধ ঘণ্টায় ঘ্যাচাং করে কেউ পাথর ছুড়ে মারল। চিৎকার করে বলে উঠল, অমন ফকিন্নি ঝি ঘরের বউ হলে অমনই হবে, বুঝলি বিরু? বাপের বাড়িতে গাইকে খড় খাইয়েছে বলেও মনে হয় না। মাড় গিলিয়ে আর ক’দিন?

বিরু অবাক হয়ে বলল, আস্তে বলো মাসিমা, বউ শুনতে পাবে যে!

—পোড়ামুখী শুনুক, না আছে চেহারা, না সম্পত্তির জো! অমন মেয়ে কে চায় বল? লক্ষ্মীও নেই, সরস্বতীও নেই।
—তুমি কী দিয়েছ টুম্পা দিদিকে, শুনি?
—ঢের দিয়েছি। তা কি পাড়াসুদ্ধ লোককে দেখিয়ে দেখিয়ে দেব নাকি? বেশ আছে আমাদের টুম্পামণি।

শেষ কথাগুলো বলার সময় গলা একটু কেঁপে উঠল রত্নার। ইদানীং মিথ্যা বলার সময় অমন একটু হচ্ছে। কেন হচ্ছে কে জানে।
চেঁচামেচি শুনে বাইরে এল সুতপা। কালো পাড়ের ধূসর সুতি শাড়ি পরা। এইমাত্র স্নান সেরে এসেছে। কানের সামনে আঁকাবাঁকা কিছু চুল শ্যামলা গালে লেপ্টে আছে। খুব স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে সুতপাকে।

—কী হয়েছে, মা?
—বলছিলাম পোড়া কপালের কথা। নেতানো খড় খাইয়ে তোমার বাপ তো দুধ শুষে নিল গাইয়ের। অবশ্য তাদের কী দোষ? নেপিয়ের ঘাসের সামর্থ্য তো সবার থাকে না।

সুতপার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। রত্না কাঠঠোকরা পাখির মতো ঠুকে ঠুকে বললে থাকল, কী বুঝে ছেলেটা এখানে বিয়ে করল কে জানে। এসব আবর্জনাকে জ্যান্ত ভাগাড়ে দিতে মন চায়, বুঝলি বিরু!

বিরুর সুতপার জন্য চোখ ফেটে কান্না আসছিল। সুতপাদির মতো মেয়ে হয় না, মাঝে মাঝে বিরু ভাবে নিজের বোন থাকলে বুঝি এমনই হতো। রত্না মাসি সারাটা দিন কাজ করিয়ে মারে, তবু টুঁ শব্দটি করে না সুতপা। হাতের পানি ইচ্ছে করে ফেলে দিয়ে রত্না বলে আবার ঢেলে দাও, নুন কম হয়েছে বলে আবার রাঁধতে পাঠায়, কাপড় ইচ্ছা করে নোংরা করে আবার ধুয়ে আনতে বলে। কষ্টে বিরুর বুকটা ভেঙে যায়। বিরুর ইচ্ছে হয় কিছু বলতে, কিন্তু ফুটফরমায়েশ খাটা নিরক্ষর ছেলের কথার দাম কী?

রমেশ্বর দাদাও কেমন যেন। বেখেয়ালি। সুতপার যাই হয়ে যাক না কেন, রমেশ্বরের কিছুই আসে যায় না। এমন মানুষকে এক কথায় বলে ব্যক্তিত্বহীন। পুরুষ মানুষের আসল সম্পদ যে ব্যক্তিত্ব একথা কি রমেশদা জানে না? অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিরুর গর্ব হয়।

প্রায় দু’সপ্তাহ পরে হঠাৎ করে বিরু দৌড়ে এসে রত্নাকে খবর দিল, মাসিমা, শহর থেকে ট্যাক্সি আসছে দেখলাম। টুম্পা দিদি এল বোধ হয়!

রত্নার শরীরে আনন্দের জোয়ার বইল। অচঞ্চল রত্না হঠাৎ চলিষ্ণু হয়ে উঠল। ছোট খুকির মতো দৌড়ে আঙিনায় গেল কুটুম বাড়ির লোকজনকে আপ্যায়ন করার জন্য। কিন্তু এ কী!

ট্যাক্সি থেকে নামল টুম্পাকে ধরে নামাল ওর ছোট দেওর ধৃতি রায়।

—জামাই আসেনি?
—না, আমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। আপনার জিনিস আপনার কাছেই রেখে দিন। ধৃতি উত্তর দিল।
—কী বলছ এসব?
—একে তো কোনো যৌতুক নিইনি। তার ওপর বন্ধ্যা। নুন, চিনি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও নেই। অমন মেয়ে আমাদের চাই না। রেখে দিন। ভাত থাকলে কাক অমনিই আসবে।

রত্না তড়িৎগতিতে অ্যালুমিনিয়ামের ঘড়িটা খুলে এনে বলল, এটা নিয়ে যাও। দোহাই লাগে। অমন সর্বনাশ করো না।

ধৃতি কোনো উত্তর না দিয়ে ওই ট্যাক্সিতেই ফেরত গেল।

টুম্পা তখন কাঁদছে। সারা গায়ে প্রহারের চিহ্ন। উদ্ভান্ত চাহনি, মনে হচ্ছে মাত্রই পাগলাগারদ থেকে ছুটে এসেছে। সুতপা শক্ত করে টুম্পার হাত ধরে আছে।

সন্ধ্যার দিকে টুম্পা নিজেকে সামলে নিল। শান্ত গলায় বলল, সুতপাদি, আমি একটু ঘুমোব। বিছানা করে দাও। আর ঘুমের বড়িও দিও। ক’দিন ধরে একদম ঘুম হচ্ছে না।

সুতপা সবকিছু ঠিকঠাক করে ওষুধের শিশি দিয়ে গেল।

টুম্পা ঘুমোল। পরদিন সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা টুম্পা উঠছে না। সবাই মিলে দরজা ধাক্কাচ্ছে, কিন্তু টুম্পার ঘুম ভাঙছে না...