টুসির চোখে কাজল

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

টুসির চোখে কাজল

আনোয়ারা আজাদ ১২:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০২০

print
টুসির চোখে কাজল

সেদিন যদি টুসি প্রথমেই টের পেত তক্ষুণি হাঁটা দিত। ওই যেদিন মুন্সিবাড়িতে গিয়েছিল ত্রাণ আনতে। আলাদিনের দৈত্যটা তার পেছনে এসে দাঁড়াবে কীভাবে বুঝবে সে? লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থায় ঘাড়ের পেছনে চোখ দুটোর ভাঁপ ছড়াচ্ছিল বুঝতে পারেনি। পাড়ার সবাইকে মুন্সিবাড়িতে ত্রাণ আনতে যাওয়ার কথা শুনে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও যেতে বাধ্য হয়েছিল সে। এ অসময়ে কে ভালো কে মন্দ, কে লম্পট, এত কিছু বোঝার বা বিবেচনা করার সময় ছিল না হাতে, শুধু ভেবেছিল যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়, বেঁচে যায়। বাঁচার আকাক্সক্ষার কাছে সব তুচ্ছ।

আপনি যা বিশ্বাস করেন বা করবেন সেটাই আপনার কর্মে অবশ্যই প্রতিফলিত হবে। টুসির গল্পটা যেদিন শুনেছি, ওর প্রতি একটা বিশ্বাস জন্মেছে। টুসি যা করে বা করবে, না ভেবে করবে না। সহজে হার মানার মতো মেয়ে নয় টুসি। গরিব হতে পারে কিন্তু হার মানার মতো গরিব মনোবল নয় ওর। তাই শুধু গল্প শুনে চোখ বুজে থাকিনি, ওর ওপর নজর রেখেছি।

শত যন্ত্রণার ভেতর, অভাবের ভেতর এক মুঠো ভালোবাসাও থাকে বলে পাখিরা আকাশে উড়ে উড়ে গান গায়, ফুলেদের দেখে শিস দিয়ে আলতো হাসে। দূরের চাঁদ দেখে কাছের মনে করে ভাবের জগতে আপ্লুত হয় বোকাসোকা মানুষ। টুসিরও আউলা বাতাস লেগে তেলতেলা ভালোবাসা হয়েছিল সৈকতের সঙ্গে। প্রথমে ভেগে যেতে চেয়েছিল দুজনে, পরে তেমন প্রয়োজন না হওয়ায় টুক করে বিয়ের ঝামেলাও শেষ করে ছোট্ট মাটির ঘরেই জমিয়ে প্রেম করছিল। গরিব মানুষের এমন মধুঝরানো প্রেম সহজে মেলে না।

দুজনেরই পেটে সামান্য বিদ্যা থাকায় জীবিকার ব্যবস্থা করতে তেমন অসুবিধেয় পড়তে হয়নি। অবশ্য শুধু বিদ্যায় কাজ হয় না এসব জায়গায়, গায়ে গতরেও খাটতে জানতে হয়, নয়ত কেউ কাজে রাখে না। সেগুলোর কোনোটারই অভাব ছিল না ওদের বরং এত প্রাণবন্ত ও উদ্দীপনায় ভরপুর ছিল, মনে হত দুটো প্রজাপতি কেবল উড়ছে। ফুরফুর ফুরফুর। পৃথিবীতে কে কোথায় বোমা মারছে, কে কোন রাজ্য দখল করতে যাচ্ছে, কে কোথায় নোবেল পাচ্ছে কিংবা প্যাঁচে পড়ে পাচ্ছে না, এসব জানার আগ্রহ ওদের ছিল না। ওদের চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খেত ওই এক জায়গাতেই, সুখী হওয়া। সুখ নামক বায়বীয় জিনিসটিকে একেবারে কলিজার ভেতর ধরা। সৈকতের বাবা ছিল না, দুটো ভাইবোন নিয়ে মায়ের অভাবী সংসারের হাল ধরেছিল কেবল। এর মাঝেই টুসি এসে তার মনোবল বাড়িয়ে দিল। টুসি সেরকমই মেয়ে যার কোথাও বোঝা হয় না, বোঝা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য জন্ম নেয়। শুনেছে সে, বাবার বংশ ভালো ছিল, জমিজমাও ছিল খানিকটা। একাত্তরের পর সব ওলটপালট হয়ে বরাতে যেটুকু জুটেছিল সেটুকু দিয়েই সাধ্যমতো চার ছেলেমেয়েকে মানুষ করে। সৈকতের সঙ্গে বিয়েতে অমত করেনি বাবা। গরিব হলেও সৈকতের প্রাণচাঞ্চল্যে সবাই এমন মুগ্ধ হয়ে থাকে যে অমত করার জায়গা থাকে না।

সৈকত আর টুসির মধু মধু প্রেমে যখন প্রজাপতির ব্যস্ততা ঠিক তখনই পৃথিবীজুড়ে বিরাট শকুনটা হুম হুম করে নেমে আসে। শীতটাও যাই যাই করে আলসেমিতে গেড়ে বসা ঠিক সেই সময়টাতেই শকুনটা বিশ্বজুড়ে থাবা দিয়ে নড়িয়ে দিল। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মৃত্যুর খবরে দিশেহারা হলো ভোগ বিলাসে ডুবে থাকা লাগামছাড়া মানুষ।

এ ওর ওপর দোষ চাপানো আর কোথা থেকে শকুনের উৎপত্তি সেই ভাবনাতেই সবার মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম যখন সেই সময়ে আচমকা ছোট্ট কারখানায় কর্মরত সৈকতের চাকরিটা চলে গেল। ক’দিন পর টুসিরটাও মাঝ নদীতে পড়ে ডোবা ডোবা অবস্থা। মাসখানেক হাতড়ে মাতড়ে কোনোমতে সামলানোর পর ত্রাণের বিষয়টা কানে এলো ওদের।

দৈনন্দিন খরচাপাতি, ত্রাণ জোগাড়, কাজের জন্য এদিক ওদিক ছোটাছুটিতে মাটির ঘরে ইঁদুর দৌড়ালে সৈকত আর টুসির প্রেমে আগুন লাগে। দুপুরের কড়া রোদে উঠোনে দাঁড়িয়ে দুজনের সমানতালে ঝগড়া করার মুহূর্তে পাড়াপ্রতিবেশী কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে শুধু উপভোগই করে না, নির্জনে বসে দেখার জন্য ভিডিও করে! শহর থেকে প্রায় প্রতিদিনই যখন কেউ না কেউ চাকরিবাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে গ্রামে ফিরছে তখনও কিছু মানুষের হাতে হাতে এ ভিডিও বিনোদন জোগায়! গা ঘেঁষাঘেঁষি করে তারা ভিডিও দেখার বিনোদনে বুঁদ হয়। ফেরত আসা দু’একজন লোকের মুখে মাস্ক নামক আজব একটা ঠুলি দিতে দেখা গেলেও আমজনতার একজনের মুখ থেকে ছিটকে আসা থুতুতে আরেকজনের মাথায় বাজ পড়ে না!

‘কই গেল তোদের লাইলি মজনু মার্কা প্রেম’, জাতীয় ঈর্ষান্বিত ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকে যারা তাদেরই কোনো একজনের সহযোগিতায় এ ভিডিও সোজা মুন্সিবাড়িতে পৌঁছে গেলে বড় মুন্সি নড়েচড়ে বসে। আহ্হা রে, এ মেয়েটাকেই সে পছন্দ করেছিল একসময়। সময়টা অনুকূলে ছিল না বলে কপালে জোটেনি! কূটবুদ্ধির পরীক্ষায় এ গ্রামে সবাই তার পেছনে! এ মহামারীর সময়টা যদি কাজে না লাগায় নাম্বার ওয়ানের তালিকা থেকে সে নিজেই নিজের নাম কেটে দেবে! সুযোগ আর সময়কে যারা কাজে লাগাতে পারে না তারা সাধারণ মানুষ। বড় মুন্সি সাধারণ মানুষ নয়!

তো সেই কূটবুদ্ধির জোরে খুব শিগগির এক আলাদিনের সাহায্যে বড় বড় দাঁতওয়ালা এক দৈত্য জোগাড় করে সৈকত আর টুসির প্রেম-ভালোবাসাকে নদীর জলে চুবিয়ে একেবারে মাঠের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয় মুন্সি।
তুমি যে চরিত্রহীনা, একই গ্রামে থেকেও টের পাইলাম না। মেয়েমানুষ আসলেই সাপের মতোন, কিলবিলায় কোনদিক দিয়া হাঁটে কিছুই বোঝা যায় না!আরও নানা রকম কথার সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে এ কথাও বলে সৈকত। অল্প সময়ের মধ্যেই এরকম উত্তপ্ত কথাবার্তার চূড়ান্ত হয় তিন তালাকে। এক দুই তিন।
হায় হায়, কী করলাম রে টুসি।
কী করলা বসে বসে ভাবো এখন। কার পাল্লায় পড়ে তুমি এইসব কথাবার্তা শিখছ? মেয়েমানুষ এই, মেয়ে মানুষ ওই। তোমার মা কি পুরুষমানুষ? নাকি তোমার বাপে জন্ম দিছে?
কথা তো মিথ্যা না। ভ্যাবলা চোখে তাকায় সৈকত। পেট গুড়গুড় করে।
যা হওয়ার হয়ে গেছে। সমস্যা সৃষ্টি হলে সমাধানও আছে সৈকত মিয়া। বেশি চিন্তা কইরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বউ তোমারই থাকবে। শুধু কয়েকটা দিন। তালাকের নিয়ম তো মানতে হবে, নাকি! এ সবই মানুষের ভালোর জন্য করা হইছে! আল্লাহ ভরসা।

রাত ১০টায় কাজী ডেকে টুসির নিকাহ্ হয়ে যায় বড় মুন্সির সঙ্গে। মুন্সির আগের বউ বেশি ঝামেলা পাকাতে পারেনি। সব কিছুর সমাধান মুন্সির কাছে মজুদ থাকে। সিদ্ধান্তটা শোনার পর টুসির প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল সেটার ভিডিও না হলেও সৈকতের কাটা কৈ মাছের মতো তড়পানো নিয়ে বেশ রসালো গল্প চাউর হয় গ্রামে। চাকরি হারিয়ে ফিরে আসা বিধ্বস্ত মানুষগুলোও বিকেলে চায়ের দোকানে রেডিওতে মৃত্যুর হার শুনে, লিকার চায়ে চুমুক দিয়ে বুঝে না বুঝে হে হে করে হাসে।

না, সাজতে-টাজতে খুব একটা আপত্তি করেনি টুসি। শক্ত মুখে মনোযোগ দিয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করে গালে গোলাপি পাউডার ডলে। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। সৈকতের জন্য সবকিছু করতে পারে সে, আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারে। বুদ্ধি শুধু মুন্সিই রাখে না! ভালোবাসতে জানা মানুষগুলোও মাথায় অল্পকিছু বুদ্ধি রেখে বেঁচে থাকে।
সব শেষে ছোট্ট আয়না ধরে ডান হাতে চোখে মোটা করে জ¦লন্ত কাজল ঠুসে টুসি।