বৃদ্ধানিবাস

ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০ | ১৩ কার্তিক ১৪২৭

বৃদ্ধানিবাস

ডা. সৈয়দা মেহবুবা জ্যোতি ২:১৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২০

print
বৃদ্ধানিবাস

জীবন এক বহতা নদী, থামতে সে জানে না, এক কূল ভেঙে আরেক কূল গড়ে। নিজের মতোই বয়ে চলা যেন স্বভাব, ব্যতিক্রম করতে নারাজ সে। জীবনের নাটকীয়তা অন্য সবকিছুকেই হার মানায়।

আজ এক মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। ঢাকা শহরের এক বৃদ্ধনিবাসে বসবাস এখন তার। ১৯৫২ সালে তার জন্ম, লেখাপড়ায় বেশ ভালো ছিলেন। শুধু লেখাপড়াই না। সংগীত চর্চায়ও বেশ ভালো দখল আছে তার। খুব ভালো নজরুল সংগীত করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন ফুড ইন্সপেক্টর। জীবনের রংমহলেই, প্রাচুর্যের ঘনঘটায় তার ছেলেবেলা থেকে বেড়ে ওঠা। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পান। বাড়ি ছিল যশোর। ওখানে থেকে পড়ালেখার সুবাদে ঢাকায় হোস্টেলে এসে থাকা। ফিজিক্সের ছাত্রী ছিলেন তিনি, আবার বেতার টেলিভিশনে গানও গাইতেন। তখন তিনি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎ করে বাবার ফোন কল। বাবা বললেন— বাড়িতে এক বিশেষ অতিথি আসবেন, তোমাকে গান গাইতে হবে। কালই চলে আসো। বাবার আদেশে সাত-পাঁচ না ভেবেই চলে গেলেন যশোরে। যথারীতি অতিথির আগমন, অতিথি পেশায় ছিলেন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জনাব আনিস। হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে বসে গেলেন, ছোট বোন কানে কানে এসে বলে গেল ‘বধূয়া আমার চোখে জল এনেছে’ গানটি করতে। 

চোখ বুজে গান গাইতে শুরু করলেন। গান শেষে যখন চোখ খুললেন দেখলেন মেহমান নেই, মেহমান ফিরে এসেছেন হাতে আংটি নিয়ে। সঙ্গে তার বাবা-মা। অতঃপর বিয়ে হল।

বিয়ের পর এক বছর ভালোই লেখাপড়া চালালেন কিন্তু যে গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বিয়ে করা সেই গান থামিয়ে দিতে হল। আনিস সাহেব পছন্দ করতেন না বেতার কিংবা টেলিভিশনে সে গান করুক, তার পছন্দের মূল্যায়ন করতেই গান ছেড়ে দিতে হল। দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় বর্ষের অনার্সে পদোন্নতির সময় তার ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়। বিয়ের এক বছরের মাথায়ই তিনি গর্ভবতী হলেন। শ্বশুর বললেন, এ বয়সে আবার পড়ালেখা কী? পড়ালেখার আর দরকার নেই, সংসারে মন দাও।
স্বামীকে জানালেন সে কথা— এত ভালো ফলাফল করে এসেছি। সবসময় এতো ভাল ছাত্রী ছিলাম, অনার্সটা শেষ করি।

স্বামীরও কঠোর বাণী, হয় সংসার করো, না হয় বিদ্যাধারী হও, ইচ্ছা তোমার। কী আর করা, লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেল। প্রথম সন্তান এল তার কোলজুড়ে। সকল অপূর্ণতাকে যেন নিমেষেই ভুলে গেলেন, সন্তানের হাসিমুখ দেখে। আঁকড়ে ধরলেন সন্তান-সংসারকে। মেয়ের বয়স যখন তিন বছর তখন আবারও পুত্র সন্তানের জননী হলেন। ভালোই ছিলেন। এই ভেবে যে নিজের সকল অপূর্ণতাকে পূরণ করবে সন্তানরা। নিজের মেয়েকে সেই স্বপ্নের আকাশ ছোঁয়াবেন যে স্বপ্নের আকাশ থেকে খসে পড়েছে তার স্বপ্নের শুকতারাগুলো। কিন্তু জীবন তো স্বপ্নের গতিতে চলে না। পুত্রসন্তান জন্মের ছয় মাস পর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন স্বামী। মাথায় যেন আবার আকাশ ভেঙে পড়ল। শ্বশুর গত হয়েছেন তার কন্যাসন্তান জন্মের এক বছর পরেই। শাশুড়িকে ভাসুর নিয়ে গেছেন। দুই সন্তান নিয়ে উনি এখন একা। আবার নতুন করে শুরু করলেন পড়ালেখা। সঙ্গে এক সেলাই কোম্পানিতে চাকরি নিলেন। ছেলে-মেয়েকে এই কষ্টের ভাগীদার তিনি কখনোই করেননি। নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছেন, সকল স্বপ্নের উত্তরসূরি হবে তারই কোলের অমূল্য রত্ন। তার যক্ষের ধন, তার সন্তানরা। ধীরে ধীরে গড়ে তোলা মেয়েটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্নাস, মাস্টার্স করালেন। বিয়ে দিলেন মেয়েরই পছন্দের পাত্রের সঙ্গে। মেয়ে বিয়ে করে চলে গেল সুদূর আমেরিকায়। আর ছেলে হল চিকিৎসক, সেও বিয়ে করল তারই সহপাঠী বীথিকে।

ছেলের বিয়ে হয়েছে মাত্র এক বছর এরই মধ্যেই ছেলে আর মায়ের সম্পর্কটি আলগা হয়ে গেছে। একদিন ছেলে এসে বলল, ‘মা, শোনো আমরা তো খুব ব্যস্ত থাকি। সারাদিন বীথি, আমি কেউই তোমাকে সময় দিতে পারি না। আবার তোমার রান্না, তোমার কথায় বিভিন্ন সময় বীথির খারাপ লাগে। বাসাটাও ছোট হওয়ায় আমার শ্বশুরবাড়ির কেউ আসে না। কিন্তু এবার আমরা বাচ্চা নিতে চাচ্ছি। সুতরাং বাসায় বাড়তি রুমেরও দরকার। তোমাকে যদি আমি কিছুদিনের জন্য কোনো বৃদ্ধনিবাসে রেখে আসি অসুবিধা হবে?

ছেলের কথাগুলো তার মস্তিষ্কে টর্নেডো তুলছিল। তিনি কোনো কথা বললেন না। কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। পরে বললেন, আমার কোনো অসুবিধা হবে না। তোমরা ভালো থেকো আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার জন্য বৃদ্ধনিবাসের ব্যবস্থা করো। আর শোনো বাবা, মাসে একবার আমাকে দেখতে যেতে ভুলো না। আমি কিন্তু তোমার পথ চেয়ে থাকব।

সেদিনই টেলিযোগে কথা হলো মেয়ের সঙ্গে। রমিছা বেগম বললেন, কেমন আছিস? আমি কিছুদিনের জন্য বৃদ্ধনিবাস গিয়ে থাকব। মেয়ে বলল, মা, আমি রুদ্রকে বলেছি। অনেক চেষ্টা করেছি ওকে বোঝাতে কিন্তু ও কিছুই বুঝতে চায় না। তোমার জামাইকে বললাম কিন্তু সেও বলে দিয়েছে, মাকে যদি আনো তবে তার সকল দায়িত্ব তোমার। আমি নিতে পারব না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসে নিয়ে আসব তোমাকে। রমিছা বেগম আবার চুপ হয়ে রইলেন। মেয়ে বলল, তুমি চুপ করে আছ কেন? কাঁদছো!

রমিছা বেগম বললেন, কী যে বলিস! মেয়েরা চাইলেও সবকিছু করতে পারে নারে মা। আমিও পারিনি, তুইও পারবি না। আমার কষ্ট হবে না। ভাবিস না। আর আমার জীবনের শেষটুকু এ দেশের মাটি, তোর বাবার কবর নিয়েই থাকতে চাই। তোর বাবাকে এখানে রেখে কোথাও যাব না। তুই ভালো থাকিস।

হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সত্যিই মেয়েরা ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু করতে পারে না। এ সমাজ তাদের পারতে দেয় না। পরের দিন সকাল, বৃদ্ধনিবাস চলে যাবেন রমিছা বেগম। খুব যত্ন করে থলের ভিতরে স্বামীর ছবিটা নিয়ে নিলেন। বিদায়ের আগে পুত্রবধূকে ডেকে বললেন— মা, ঠিকমতো নিজের যতœ নিস। আর তোকে যদি কোনো যন্ত্রণা দিয়ে থাকি নিজের মা মনে করে ক্ষমা করে দিস। মাঝে মাঝে তোরা যাস কিন্তু আমার কাছে, অপেক্ষায় থাকব।

শুরু হল বৃদ্ধনিবাসের জীবন, অপরিচিত জগতে পরিচিত মুখগুলোর অপেক্ষা। প্রতিটি দিন পঞ্জিকার পাতায় কাটা চিহ্ন দেওয়া আর অপেক্ষার প্রহর গোনা। কবে আসবে আমার ছেলে, আমার মেয়ে। একটাই জিজ্ঞাসা, কেমন আছে ওরা? হঠাৎ একদিন দায়িত্বরত সুপার গেলেন বৃদ্ধনিবাস পরিদর্শনে। তাকে দেখেই এক আবদার জুড়ে দিলেন রমিছা বেগম। বললেন, বাচ্চাদের ডে কেয়ার সেন্টার নামে যে পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো রয়েছে, কর্মজীবী মায়েরা যেখানে বাচ্চাগুলোকে রেখে যায়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বৃদ্ধনিবাসের কাছে থাকত, অথবা আশপাশে হত তবে সকলেরই ভালো সময় কাটত।

নাতি-নাতনিদের মতোই যত্ন করতে পারতাম ওদের। আর আমাদেরও ভালো সময় কাটত। দায়িত্বরত সুপার খুব অবাক হলেন, কী এক অদ্ভুত দাবি, ভালোবাসার দাবি। আমার সঙ্গে যখন তার কথা হচ্ছিল জিজ্ঞেস করেছিলাম, জীবনের প্রতি কোনো আক্ষেপ কিংবা চাওয়া আছে আপনার? মা বললেন— একটা চাওয়া আছে মৃত্যুযাত্রা যেন আমার সন্তানদের হাতে না হয়। ওদের কেউ যেন মৃত্যুর খবর না দেয়। ওরা কষ্ট পাবে, ওদের সময় নষ্ট হবে। আমি এ মাটির খড়িতে কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছি, স্বামীর পেনশনের টাকা। এ টাকায় যেন আমার মৃত্যুযাত্রার কাজটি করা হয়। আমার মৃত্যুযাত্রা যেন এতিমখানার এতিম ছেলেদের হাতে হয়। আমাকে যেন আমার স্বামীর পাশেই দাফন করা হয়। এটাই চাওয়া।

আমি কোনো ভাষা খুঁজে পেলাম না।

মা আবার বললেন— তোমরা তো এ যুগের মেয়ে। ভালোবাসার সম্পর্কগুলোকে কংক্রিটের মতো প্রাণহীন জড় করে তোলো না। আমরা বাঙালি, ভালোবাসাই আমাদের সম্পদ। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নিজস্ব সত্তা হারিয়ে আমরা যেন সংকর জাতি না হয়ে পড়ি।