বহুমাত্রিক গল্পের মিশ্রণ

ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০ | ১৩ কার্তিক ১৪২৭

বহুমাত্রিক গল্পের মিশ্রণ

রনি অধিকারী ২:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২০

print
বহুমাত্রিক গল্পের মিশ্রণ

গল্প বলার ক্ষেত্রে আখতার জাহান শেলীর একটা নিজস্ব বাচনশৈলী এবং শিল্পগুণ রয়েছে। আমাদের চারপাশের চেনাজানা ঘটনাপ্রবাহ গতি-প্রকৃতি নিয়েই ‘অষ্টপ্রহরের গল্প’। বইয়ের চরিত্রগুলোর বিকাশের পথ যতটা সীমিত হওয়ার কথা, লেখকের সযতœ প্রয়াস সে সীমাবদ্ধ কাটিয়ে উঠতে অনেকটা সফল হয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক গ্রন্থের শেষের দিকে। যদি বলি ‘একটি বীভৎস রসের গল্প’ এবং ‘জারুল গাছের ছায়া’ এ গল্পগ্রন্থের মূল চমক এবং পাঠককে ধরে রাখার বড় ক্ষমতা।

আখতার জাহান শেলীর গল্প পড়তে পড়তে তন্ময় হয়ে যাচ্ছিলাম বারবার। প্রতিটা গল্পের দৃশ্যের ভেতর যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। ঠিক দৃশ্যের ভেতর বললে ভুল হবে। কখনো সখনো ইতিহাসের ভেতরে। ইতিহাস হঠাৎ দাঁড় করিয়ে যাচ্ছিলাম নির্মম বর্তমানের উঠোনে। লেখকের ‘অবরুদ্ধ জনপদে’ গল্পটিতে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে জীবনমুখী বর্ণনার সমান্তরালে বর্তমানের অসঙ্গতিসমূহের প্রতিস্থাপন।

গল্পগ্রন্থটিতে নয়টি গল্পের নয়টি প্রধান চরিত্রই হল নারী। আমাদের সমাজ এমনকি সারা বিশ্বেই সামগ্রিকভাবে সমাজ থেকে নারীর প্রাপ্তি বৈষম্যমূলক। সমাজের স্বচ্ছল তথাকথিত প্রগতিশীল সমাজের অংশ পর্যন্ত; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী পীড়িত। লেখক তার গল্পগুলোর মধ্যে শুধু চেনাজানা খুব কাছাকাছি দু’চারটি জীবনের অতি সাধারণ ছবি ধরার প্রচেষ্টা মনে হলেও মূলত তা নয়। তিনি সফল হয়েছেন, পাঠককে মুগ্ধ করেছেন। ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘অতৃপ্ত’ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আখতার জাহান শেলীর গল্প বলার কৌশল অত্যান্ত ঝরঝরে ও প্রাণবন্ত।

তার গল্প বোধ ও শৈলীর মিশেলে একধরনের অন্তঃসলিল প্রবাহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যেমন— চুয়াত্তর কথা’, ‘ঘরে ফেরার শব্দ’, ‘বিলম্বিত ফাল্গুন’ গল্প তিনটিতে। এসব গল্পে উঠে এসেছে নির্মম সমাজ-বাস্তবতা। অন্যদিকে মা, মাটি, জনপথ তথা প্রকৃতির কথা শোনা যায় লেখকের অন্য গল্পে। ‘জারুল গাছের ছায়া’ গল্পটির শুরুর দিকে লেখকের বয়ান শোনা যাক— ‘মাথার ওপর ভাদ্রের নীল আকাশটা সাদা সাদা তুলোর ডাই ভাসা নীল জমিন দিয়ে মনের মধ্যে অনন্ত মুগ্ধতা ছড়ায়। ষাটোর্ধ্ব মিথিলা রহমানের সারা অবয়বে প্রশান্তির ছাপ। ফিনফিনে হাওয়ার মোলায়েম আঁচল চোখে-মুখে যেন জননীর আদরের স্পর্শ রাখে।’ জননীর আদর? একটা প্রশ্ন উচ্চকিত হয় মনের মধ্যে। জননীর আদরসুলভ, বিশাল স্বাদ-গন্ধহীন জন্মসূত্রে চারপাশে অবস্থিত পরিবেশ, প্রতিবেশ থেকে শুনেছে, জেনেছে, দেখেছে।

লেখক ঘটনা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে। কখনো দেশ বিদেশের, নগর-বন্দর ও মহানগরের গল্পে লেখক তুলে আনেন মনোস্তাত্ত্বিক প্রেমের গল্প, বিভাজনের গল্প, ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতার গল্প। গল্পকার মনোস্তÍত্ত্ব নিয়ে যেভাবে নাড়াচাড়া করেছেন তাতে নিঃসন্দেহে নড়ে উঠবে পাঠকের হৃদয়। লেখকের ‘সুরের আগুন’ থেকে গল্পপাঠ— ‘পাঁচটি বছর ঘুরছে লোনাজলের ঢেউয়ের চূড়ায় নাগরদোলায়। এ জাহাজ থেকে ও জাহাজ, বন্দর থেকে বন্দরে। আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে সুলভ সুললিতা ফরাসিনীর দেহের খাঁজে খাঁজে উদ্ধত যৌবন, ফ্রেঞ্চ শ্যাম্পেনের ঘোরলাগা চোখে নেশা ধরিয়েছে। ব্যাংককে নারকেল বীথির ছায়ায় পানির মধ্যে প্লান করে তৈরি কুটিরে স্বাস্থ্যবতী কামিনীর দেহে উথলে উঠলে কামার্ত ব্যাংকক। জুই বিচের বালিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রমোদসঙ্গিনীর স্বপ্নবাস! আবার নায়াগ্রার উদ্দাম স্রোতে যখন পড়েছে রঙধনুর আল্পনা তখন সম্মোহিত হয়ে গেছে তেজি টগবগে এক ভোগী তরুণ।’

‘অষ্টপ্রহরের গল্প’ পাঠে বোদ্ধাপাঠক ভূগোলায়নের চমৎকার ধারণা পাবেন। ধারণা পাবেন সমাজ, রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, সমাজতন্ত্রের স্বরূপ এবং মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ জীবনের বয়ান।