‘ভালো লেখা পাওয়া বড় সংকট’

ঢাকা, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

‘ভালো লেখা পাওয়া বড় সংকট’

আনোয়ার কামাল সম্পাদক, এবং মানুষ ২:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০২০

print
‘ভালো লেখা পাওয়া বড় সংকট’

লেখক সৃষ্টির আঁতুড়ঘর লিটল ম্যাগাজিন। নবীন লেখকদের অধিকাংশ হাত মকশো করেন এখানে। লিটলম্যাগচর্চার নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ‘এবং মানুষ’ সম্পাদক আনোয়ার কামাল। সঙ্গে ছিলেন শফিক হাসান

এবং মানুষ-এর প্রথম সংখ্যা কখন প্রকাশিত হয়? কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
‘এবং মানুষ’ ২০১৪ সালে প্রথম বের করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মূলত বৈশাখকে নিয়ে সবাই নানান আয়োজন করে থাকেন। তাহলে কবিতাকর্মীরা বৈশাখে একটি বৈশাখী কবিতা উৎসব করতে পারে না কেন? চিন্তাটা আমার মাথায় প্রথমে আসে। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করা হয়। কবি সোহাগ সিদ্দিকীকে বিষয়টি নিয়ে খসড়া ধারণা দিই। দুজনে আরও কিছু সাহিত্যকর্মীকে নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে বৈঠক করি। সেখান থেকেই শুরু। ‘বৈশাখী কবিতা উৎসব ১৪২২’-এর মধ্য দিয়ে ‘এবং মানুষ’ যাত্রা শুরু করে। এখন প্রতিবছর দুজন সাহিত্যকর্মীকে নগদ অর্থসহ সম্মাননা এবং একজন তরুণ লেখককে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষীর লেখকদের নিয়ে প্রতি বছর ‘বৈশাখী কবিতা উৎসব’ করা হয়। উৎসবে দুই বাংলার সাহিত্যিকরা অংশগ্রহণ করেন। এবার ৬ষ্ঠ বারের মতো প্রস্তুতি নিয়েও করোনার কারণে সম্ভব হয়নি। এসবের আয়োজক ‘এবং মানুষ’। প্রথম থেকেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। লিখিয়ে বন্ধুরা পত্রিকাটি সংগ্রহ করছে, লেখা দিচ্ছে।

কোন লক্ষ্য থেকে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন? অর্জন বা বিসর্জন কী?
লক্ষ্য তো একটাই, সাহিত্যকর্মীদের লেখালেখির একটি জায়গা সৃষ্টি করা। তরুণদের তুলে ধরা, উৎসাহিত করা। এখানে অর্জন-বিসর্জন দুটোই থাকে। বেশকিছু লেখক তাদের মতামত প্রতিফলিত করতে পারছে। চিন্তার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে, নবীন-প্রবীণের সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে সৃজনশীল কাজকে এগিয়ে নিচ্ছি, এটাই অর্জন। বিসর্জন বলতে নিজেকে একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে মেলে ধরে নিবেদিত প্রাণ-মন দিয়ে কাগজটি করছি। এটা করতে গিয়ে পরিবার-পরিজনকে সময় দেওয়া থেকে বঞ্চিত করছি। আর্থিকসহ অন্য অনেক কিছুই ক্ষতি হয়, সেটা বিসর্জন দিয়েই কাজ করছি।

বর্তমানে লিটলম্যাগচর্চা কেমন হচ্ছে? উল্লেখযোগ্য ম্যাগ কোনগুলো?
এখনো লিটলম্যাগ চর্চা হচ্ছে। অনেকেই ভালো কাগজ করছেন। অনেকের কাগজ পাঠক সমাদৃত হচ্ছে। যারা লিটলম্যাগ করছেন, তাদের মেধা, শ্রমকে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি। অনুল্লেখ্য কোনোটাই নয়। যে কাগজটি ত্রিশ বছর ধরে যে আবেদন সৃষ্টি করে রেখেছে, পাশাপাশি যে আজই একটি কাগজ বের করে সাড়া ফেলে দিচ্ছে, তাকে কোন বিবেচনায় খাটো করে দেখব। গুটিকয়েক কাগজকে উল্লেখযোগ্য বলতে চাচ্ছি না।

লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা কতটুকু?
অবশ্যই লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। লক্ষ করলে দেখবেন, আজ যারা প্রথিতযশা লেখক তারা একসময় হয় নিজে লিটলম্যাগ বের করেছেন, নয়ত লিটলম্যাগে লিখে সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক সকলকে সুযোগ করে দিতে পারেন না, তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লিটলম্যাগ সম্পাদকের তা নেই। একজন লিটলম্যাগ সম্পাদক ইচ্ছা করলেই একজন তরুণকে প্রমোট করতে পারেন। খাপ খোলা তলোয়ারের মতো যেকোনো মুক্তচিন্তাকে পত্রিকায় স্থান দিতে পারেন।

সম্পাদনায় কী ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করছেন?
সম্পাদনায় ভালো লেখা পাওয়া বড় সংকট। অনেক লেখকই সময় নিয়ে কষ্ট করে লিটলম্যাগের জন্য লেখা প্রস্তুত করে দিতে চান না। পুরনো লেখা কোনো দৈনিকে হয়তো ছাপা হয়েছে, এমন লেখা দিতে আগ্রহ দেখান। আবার অনেক নামকরা লেখকের যেহেতু সম্মানী দেওয়া হয় না, সে কারণেও লেখা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তরুণদের লেখা অনেক সময় নিয়ে যত্ন করে সম্পাদনা করতে হয়। আবার এমনও দেখা যায় লেখা সম্পাদনা করলে অনেকে ক্ষেপে যায়। এটা গেল একটা দিক। অপরদিকে পত্রিকা বের করার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তার জন্য তেমন সহযোগিতার হাত কেউ বাড়িয়ে দিতে চায় না। বিজ্ঞাপন চাইতে গেলে বিজ্ঞাপনদাতারা বলেন- এসব তো সাধারণ পাঠকরা পড়ে না। আপনারাই লেখেন, আপনারাই পড়েন; বিজ্ঞাপন দিয়ে লাভ কী? এধরনের বচনও হরহামেশা শুনতে হয় সম্পাদককে। তারপরও এসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে একটি নতুন ভোরের আলোর মতো লিটলম্যাগ প্রেসের জরায়ু থেকে বেরিয়ে আসে।

কী বৈশিষ্ট্যে লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রিকাকে আলাদা করবেন?
সাহিত্যপত্রিকাগুলোতে কেবল সাহিত্যবিষয়ক লেখায় থাকে। বিনোদনমূলক লেখাও থাকতে পারে। কিন্তু লিটলম্যাগ আক্ষরিক অর্থে নিরেট সাহিত্য কাগজ নয়। এর ভিতরে লুক্কায়িত থাকে একটি চেতনা। যা মানুষের ভোঁতা মগজকে কিছুটা হলেও শাণিত করে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার লেখার বাইরে তারা মুক্তচিন্তার স্ফূরণ ঘটান লিটলম্যাগগুলোর পাতার পরতে পরতে। যা সাহিত্যপত্রিকায় পাওয়া যায় না। লিটলম্যাগ চিন্তার খোরাক জোগায়।

সম্পাদনা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমরা মূলত বিষয়ভিত্তিক কাজ করছি। আগামীতেও বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা করা হবে। তারপর ভেবে দেখা যাবে। চলুক না আরও কিছুটা পথ। লিটলম্যাগ চর্চার গুরুত্ব আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও আবেদন হারাবে না বলেই বিশ্বাস। আমি স্কুলজীবনে দেয়ালিকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। তারপর ছোটকাগজ, এখনো করে যাচ্ছি। হতাশ হইনি। লিটলম্যাগ আছে বলেই কিছু হলেও ভিন্ন চেতনায় মুক্তমনা মানুষের ভাবনার বিচ্ছুরণ পাচ্ছি। কাজেই এখনো এর গুরুত্ব আছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থার তো কোনো পরিবর্তন হয়নি। কাজেই বিদ্যমান বাস্তবতাকে যদি ধরা যায়- তবে নিশ্চয়ই এখনো লিটলম্যাগচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।

কোনো কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখেন?
অনেক লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা সত্তা নিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কাজটির সঙ্গে লিটলম্যাগের সম্পর্ক আলাদা। আগেই বলেছি- যারা লিটলম্যাগ করছেন, তাদের নিজেদেরও একটা গোষ্ঠী রয়েছে। একঝাঁক তরুণ লিখিয়ে কোনো না কোনো কাগজের পাতায় জীবনের প্রথম লেখাটি ছাপার হরফে দেখে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে নিজে লেখার প্রতি অনুরক্ত হয়ে লেখক হিসেবে তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছেন। এখন সেই নবীন লেখকের বই তো প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী করতে চাইবে না। ফলত, তাদের বইগুলো নিজেদের মতো করে করতে হয়। কাজটি কে করবে? তাদেরই করতে হচ্ছে। এতে দোষের কিছু দেখছি না।

ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক কাগজের কী ধরনের পার্থক্য থাকা জরুরি?
ছোটকাগজ লেখক সৃষ্টির নিমিত্তে কাজ করে। প্রথার বিরুদ্ধে বুক চেতিয়ে দাঁড়ায়। প্রচলিত ধ্যানধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগল ভাঙতে চায়। ছোটকাগজ ব্যবসাবৃত্তির মনোভাব নিয়ে কাগজ করে না। অনেকটা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। অপরদিকে বাণিজ্যিক কাগজের কাজই হচ্ছে বাণিজ্যনির্ভরতা। ব্যবসা করে পুঁজির বিকাশ ঘটানো। দুটো কাগজের মধ্যে মৌলিক তফাৎ এখানে।

এবং মানুষ-এর প্রকাশিত সংখ্যা কতটি? বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যাটি?
এপর্যন্ত ১৬টি সংখ্যা বের হয়েছে। আমরা মনে করি, প্রতি সংখ্যাই সমান গুরুত্ববহ। বৈশাখে আমাদের জন্ম, বৈশাখকে সামনে রেখে প্রতি বছর বৈশাখী কবিতা উৎসবের আয়োজন করে থাকি। এছাড়াও বর্ষা, শীত, শরৎ নিয়েও সমৃদ্ধ সংখ্যা বের হয়েছে। অপরদিকে সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা, বাবা সংখ্যা, বন্ধু সংখ্যা, গল্প সংখ্যা পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

কথাসাহিত্যের কাগজ হাতেগোনা, কবিতার কাগজ অগণন। রসায়ন কী?
কবিতার আবেগ, আবেদন সব সময়ই অধিক থাকে, গদ্যের তুলনায়। কবিতা স্মরণে রেখে যেখানে সেখানে আউড়ে বেড়ানো যায়। কবিতা উদ্ধৃত হয়ে মুখে মুখে ফেরে; গদ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও এ সুযোগ কম। এসব কারণেই ছোটকাগজেও কবিতার আধিক্য লক্ষ করা যায়। এছাড়া কবির সংখ্যা বেশি কথাসাহিত্যিকের চেয়ে। কবিদের আবেগ থাকে বেশি। কাজেই কবিরাই ছোটকাগজ বেশি করেন।

লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
প্রচল প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নাম লিটলম্যাগ। একসময় বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি ভাবা হতো। তাছাড়া লিটলম্যাগ যারা করছেন, যাদের সঙ্গে নিয়ে করছেন, তারা নিজেরাও একটি গোষ্ঠীর মতো দাঁড়িয়ে গেছেন। এক অর্থে লিটলম্যাগ যারা করেন তারা গোষ্ঠী তো বটেই। তবে হ্যাঁ, লিটলম্যাগ একা একা করা যায় না। তার সামনে-পেছনে কিছু মানুষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাহায্য সহযোগিতা অবশ্যই থাকতে হয়। কাজেই যারা মিলেমিশে কাজটি করেন তারা তো গোষ্ঠীবদ্ধভাবেই করেন। মনে করি, লিটলম্যাগের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদেরও একটি গোষ্ঠী রয়েছে। গোষ্ঠীবদ্ধতাকে খারাপভাবে নিই না। কারণ, এ গোষ্ঠীপ্রীতি একটি মহৎ কাজের উদ্দেশ্যে শামিল হওয়া। একটি মশাল প্রজ্জ্বলিত করা। এখানে একদল মানুষের সম্মিলন ঘটবেই।

দুই বাংলার লিটলম্যাগচর্চার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখতে পান?
দুই বাংলার লিটলম্যাগচর্চার মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য তো রয়েছেই। প্রথমত তাদের ভাষা-কৃষ্টির সঙ্গে আমাদের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। চিন্তা-চেতনা-রাজনৈতিক আবহ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে বিস্তর না হলেও সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য রয়েছে। থাকাটাই সমীচীন। দ্বিতীয়ত ওপারের লিটলম্যাগগুলো আরও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ। তাদের গদ্যের কাজ বেশি থাকে। তবে আমরা বর্তমান সময়ে তাদের চেয়ে এগিয়ে আছি।

আপনার জন্ম-জেলার (পাবনা) লিটলম্যাগচর্চার ইতিহাস জানতে চাই...।
পাবনার লিটলম্যাগগুলোর মধ্যে খান নূরুজ্জামান সম্পাদিত ‘খেয়া’, ডা. উত্তম কুমার রায়’র ‘নূপুরের ধ্বনি’, লতিফ জোয়ার্দার’র ‘সবুজ স্বর্গ’ ও ‘চৌকাঠ’, নূরুল ইসলাম বাবুল’র ‘পাথর’, মির্জা রানা’র ‘তুর্য নিনাদ’, রেহানা সুলতানা শিল্পী’র ‘শীতলপাটি’, মোল্লা আলী আছগার’র ‘প্রত্যাশা’, ফকির খালেক’র ‘ভাঙন’ ও যাহিদ সুবহান ‘সপ্তর্ষী’ লিটলম্যাগ সম্পদনা করছেন। এসব কাগজগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই অনিয়মিত। সবুজস্বর্গ, চৌকাঠ, শীতলপাটি ভালো কাজ করে। এদের কাজ আমার ভালো লাগে।

আপনার লিটলম্যাগের নামকরণের নেপথ্যে কী ভাবনা ছিল?
মানুষের মাঝে পেয়েছি যে বাণী/ তাই দিয়ে রচি গান/ মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাব/ মানুষের দেয়া প্রাণ।
যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের কল্যাণের জন্য। আমরা যা কিছু করি তার সবকিছুর মূলে ‘মানুষ’ ‘এবং মানুষ’। মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ী সময়ে একজন লেখককে তার লেখালেখির ভিতর দিয়ে কিছু দিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। মানুষ ছিল, আছে, থাকবে। এ লক্ষ থেকেই বেছে নিয়েছি ‘এবং মানুষ’ নামটি। আমি মানুষ, এবং মানুষ...।