আসমানি কবর

ঢাকা, রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

আসমানি কবর

সৌর শাইন ১২:৪৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০২, ২০২০

print
আসমানি কবর

সীমান্তের ওপাড়ে ভারতের পাহাড়; সারি সারি সবুজ রঙের! ওই পাহাড়গুলো কি আসামে না মেঘালয় রাজ্যে তা নিয়ে মাঝে মধ্যে তর্ক বাঁধে চাষারচরের কিশোর-বালকদের মধ্যে। ওরা কেউ শুনে এসেছে আসামের, কেউ শুনেছে মেঘালয়ের কথা, তাই তর্কের সমাধা হয় না। অথচ ওই পাহাড়গুলো দুটো রাজ্যের সম্পত্তি হয়ে আলাদা সীমারেখাভুক্ত। পাহাড়ের শরীর ঘেঁষে বয়ে গেছে জিনজিরাম নদী। নদীটা ভারত থেকে উত্তর দিক দিয়ে বাংলাদেশকে পেঁচিয়ে আবার খানিকটা ভারত ঘুরে আবার বাংলাদেশে ঢুকে কিছুটা জাল বিস্তার করে আবার ভারতের দিকে গিয়ে আবার ফিরেছে। গাছের শেকড়ের মতো শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে যতদূর সম্ভব। কাঁটাতার থেকে অদূরে জিনজিরাম নদীর পাড়ে একটুকরো সীমান্তভূমির নাম চাষারচর! ভাঙনে এই চরের আয়তন কখনো কমে কখনো বেড়ে উঠে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এ ভাঙা-গড়ার খেলা দেখছেন সুরতা বেগম। নদীর স্রোতের কোনো মায়া হয় না, নির্দয় পাষাণ, ধারালো ছুরি দিয়ে বলির পশু জবাইয়ের মতো সব কেটেকুটে নেয়, কতটা দুঃখ কতটা রক্তপাত হলো তা চেয়েও দেখে না।

পুবদিকের পাহাড় ছুঁয়ে এখানে সূর্যোদয় হয়, যেদিক দিয়ে জিনজিরাম নদী বয়ে গেছে। সুরতা বেগম অশ্রুময় চোখে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্মৃতির নোনাজলে ভেসে যায় সংসার! শ্বশুর, স্বামী, সন্তান ও মৃত নাতিদের স্মৃতি উথলে জাগে। ছয় বছরের বালক রহিম সুরতা বেগমের ধ্যান ভাঙিয়ে বলে, বানের পর থেইক্যা বাপের নয়া কবরটা দেহি না ক্যান দাদি? কই হারায়া গেল?

সুরতা বেগম বলেন, ওই যে ফারাগের ঐ আসমানের লগে মাডির টিলা দেখতাছিস! ওগুলোই কবর, আসমানি কবর! তোর বাপ, চাচা, দাদা, পর-দাদা সব্বার কবর!

কব্বরগুলা ডরে-ভয়ে এত ফারাগে চইল্যা যায় কেরে দাদি? হাত-পা নাই তাও কত্ত ফারাগে পলায়া গেল।

যায়, যাইতে পারে বইল্যাই তো এত ফারাগে যায়।

সব কবর ওইখানে গিয়া জমা হয়? ভাইয়ের কবরটাও চইল্যা যাইব? ধইরা রাখবার পারমু না?

ধইরা রাখার হিম্মত নাই কারোর রে ভাই।

কলাগাছ দিয়া চাইরদিক বাইন্দা রাখলে হয় না? যাতে বানে ভাঙনে আর ধরবার না পারে।

সুরতা বেগম বালকের কথায় আর নজর দেয় না, দরুদ পড়ে একমনে। রহিম দাদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সুরতা বেগম নাতিকে বলে, একবার সুরা ফাতিহা আর তিনবার সুরা এখলাস পড় ভাই। মুর্দার জন্যি দোয়া করন লাগব। কবর জিয়ারত না করলে মুর্দার রূহ জিন্দাদের অভিশাপ দেয়।

রহিম দাদির মুখে এই চিরপরিচিত কথাগুলো শুনে বলে, দাদি এত্ত ফারাগে কি জিয়ারতের দোয়া গিয়া পৌঁওছাইব? বুগলে যাওন লাকত না?

সুরতা বেগম দু’চোখ মুছে নাতির কথায় সাড়া দিয়ে বলে, খোদা চাইলে সবই সম্ভব রে ভাই!

খোদায় তোমার চাওয়া পূরণ করব এইডা কইছে কেডা?

সুরতা বেগম কিছু বলে না। একমনে কাঁদে! কাঁদলে নাকি বুকের কষ্ট কমে। তাই নেশার মতো নিঃশব্দে কাঁদতে ভালোবাসেন।

আচ্ছা দাদি, আমারেও কি বাপ-চাচা-দাদা আর ভাইয়ের মতো বিএসএফ গুলি কইরা মারব? তারপর ওই আমার কবরও আবার গুলির ডরে বানে ভাইঙ্গা, ভারতের টিলার দিকে পলায়া যাইব?

এমন কথা মুখে আনবি না ভাই। খোদা যাতে তোর কপালে এই অপমরণ না লেখে। দোয়া কর, রাব্বির হামহুমা, অমা রব্বায়ানি ছগিরা...।

সুরতা বেগমের বয়স হয়েছে, মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গোনেন। আর সাল তারিখের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন। কোন বছর স্বামী হারাল, কোন বছর হারাল শ্বশুর, সন্তান আর নাতি। বহু বছর আগে এক সকালে স্বামী সীমান্তের কাছে জমিতে ধান বুনতে গিয়েছিলেন। দুপুর বেলায় বাড়ি এসে দু’মুঠো ভাত খেয়ে আবার গেলেন জমিতে। সূর্যাস্তের মুহূর্তে লাশ হয়ে প্রতিবেশীদের কাঁধে চড়ে বাড়ি ফিরলেন। কবর দেওয়া হলো চাষারচরের গোরস্তানে। স্বামী হারানোর ঠিক দু’বছর পরে সুরতা বেগমের বৃদ্ধ শ্বশুরও সেই একই জমিতে গুলিবিদ্ধ হলেন। ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসা হলো। উঠোন ভরে গেল রক্তে, চরের লোকজন ভিড় জমিয়ে দেখল মৃত্যুদৃশ্য!

সুরতা বেগমের ছোট ছোট দুই ছেলে বড় হতে লাগল, সংসারের অভাব অনটনকে গায়ে মেখে। সীমান্তের একখ- জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলায়। ধান, পাট, ভুট্টা তিনটি শস্যই ভালো জন্মে। ফসল বিক্রি করে অনটনের গ্লানি টানে।

সেই সঙ্গে পিছু লেগে আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ! উত্তরদিক থেকে ভারতের পাহাড়ি ঢল নামে ঝড়ের বেগে। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধ থেকে ছাড়া জলে প্রতি বছরই তুমুল বন্যা হয়, নদী ফুঁসে উঠে নাগিনীর মতো। নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। সে ভাঙনে কপালে হাজির হয় দুঃখের দরিয়া, মানুষের ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি কেড়ে খাঁজকাটা স্রোতে! বাদ পড়ে না মুর্দাদের গোরস্তান! মাটির খ- সবই বিলীন হয়ে পানিতে মিশে ছুটতে থাকে স্রোতের পিঠে। এই মাটি এই পানি ছুটছে ভারতের পথে, যেদিক দিয়ে পাহাড়গুলো ঠায় দাঁড়ানো।

ভাঙনের ছোবলে চাষারচরের মানুষদের একবার দু’বার নয় বহুবার ভাঙনে ঠাঁই পাল্টাতে হয়েছে। চরের আকার আকৃতির বারবার পরিবর্তন এসেছে।

স্বামীর মৃত্যুর পর সুরতা বেগমের দুই ছেলে আরিফ ও শরিফ দুজনই বড় হয়। একসময় বড় ছেলেটিকে আনন্দ সমারোহে বিয়ে করানো হলো। সংসারে এলো নতুন আমেজ। বছর ঘুরতেই ভিটেতে বংশের বাতি নয়া প্রজন্মের আগমন ঘটল। সুরতা বেগম আনন্দে উল্লসিত হলে প্রতিবেশীদের নাতির মুখ দেখালেন। সেদিনই বিএসএফের গুলিতে মারা গেল ছোট ছেলে কিশোর শরিফ। কী অপরাধে তাকে গুলি করা হলো, কিছুই জানা গেল না। বিডিআর-বিএসএফের ফ্ল্যাগ মিটিং চলল তিনদিন। তারপর ওরা লাশ ফেরত দিল! দুর্গন্ধ ভরা লাশ কলাপাতায় পেঁচিয়ে কোনোরকমে মাটি চাপা দেওয়া হলো।

শরিফকে হারিয়ে মা ও বড় ভাইয়ের দিন কাটতে লাগল পাগল প্রায়। স্মৃতির বন্দরে এক একটা মৃত্যুর ক্ষত ও গুলিবিদ্ধ শরীর দেখতে দেখতে সুরতা বেগম কখনো কখনো পাথুরে মূর্তি ধারণ করেন। ভেবে হিসাব মেলাতে পারেন না। পাহাড়ের ওপাড় থেকে এক একটা গুলিতে জীবন ঝরে যায়। আর ভাঙনের ছোবলে কবরগুলোও সেই পাহাড়ের দিকেই ধাবিত হয়। তাই তো সুরতা বেগমের কাছে দূরের ঐ পাহাড়গুলোই কবর রূপে দৃষ্টিগোচর হয়।

মৃত্যুস্মৃতি ভুলে আবারো বেঁচে থাকার স্বপ্নে নামে সংসারের জীবিত প্রাণীগুলো। কিছুদিন পরপর এক একটা গুলিবিদ্ধ মৃত্যু সংবাদ বউ-শাশুড়িদের কলিজা কাঁপিয়ে তোলে। কার সংসারে কোন মা সন্তানহারা হবে, কোন বউ বিধবা হবে তা নিয়েই আশঙ্কার কমতি নেই। মৃত্যু সংবাদ পৌঁছার পর মৃত ব্যক্তির উঠোন ভরে পদচিহ্নে!
সুরতা বেগমের বড় ছেলে আরিফের সংসারে দুটো সন্তান জন্মে। ওদের নাম রাখা হয়, রজব ও রহিম। রহিমের জন্মের চার বছর পরের কথা। আলো-আঁধারি এক ভোরে আরিফ বড় ছেলে রজবকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তে মহাজনের জমিতে মজুর খাটতে যায়। ভুট্টা তোলার আয়োজন চলছে। হঠাৎ ওরা সেখানে ওরা একদল লোককে দৌড়াতে দেখে। কিছুটা সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দুজন দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে পায় রাইফেল হাতে বিএসএফের জোয়ানরা দৌড়াচ্ছে। আরিফ সচকিত হয়ে উঠে। আরিফ ভাবে, নিজের সন্তানকে বাপ-ভাইয়ের মতো এভাবে মরতে দিতে সে পারে না। দৌড়াতে পা বাড়ায় ওরা, পেছনে চিৎকার করছে বিএসএফের জোয়ানরা। গতরাতের অভিযানে পালানো গরু পাচারকারী সন্দেহে ওদের পিছু নেয় বিএসএফ। পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ! দুটো শরীর লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কিছুটা সময় কাতরাতে কাতরাতে লাশ হয়ে যায়। টেনে হিঁচড়ে লাশ দুটো নেওয়া হয় বর্ডারের ওপাড়ে। রাতে বিজিবি লাশ দুটো সুরতা বেগমের বাড়িতে পৌঁছে দেয়।

আরিফের কবরটা দেওয়া হলো চাষারচরের গোরস্তানে। নদী ভাঙনে কবর ছিনিয়ে নেওয়ার ভয়ে, মায়ের তীব্র কান্না আবদারে ছেলের কবরটা উঠোনে দেওয়া হলো। বছর ঘুরতেই আরিফের কবর উধাও, উঠোনে টিকে আছে রজবের ছোট্ট কবরখানা।

কিন্তু মাটির কোষ ভেঙে প্রতি বছরই নদীর পাড় কাছে এগিয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে স্রোতের জিহ্বা! মা ছেলের কবরটা আর কতদিন আগলে রাখবেন?

রহিম দাদির মুখে ভাই ও পিতার মৃত্যুর ঘটনা শুনে শুনে দরদর কাঁদে। সেও হিসাব মেলাতে পারে না বর্ডার থেকে এত গুলি আসে কেন? কেন কবরগুলো ভাঙনের মুখে পড়ে, কেন স্মৃতিচিহ্নটুকুও মিলিয়ে যায় পাহাড়ের দিকে। বিএসএফের প্রতি পৃণার প্রবল ঝড় সৃষ্টি হয় রহিমের বালক মনে। জাগে প্রতিশোধপ্রবণতা।
রহিম ক্ষেপে সুরতা বেগমকে জিজ্ঞেস করে— দাদি, বিএসএফ আমগোরে এত গুলি করে ক্যানে? জিনজিরাম গাঙ এত কবর গিলে ক্যানে?

সুরতা বেগম নিরুত্তর!

বর্ডারের পাশে ওয়াচ টাওয়ারে বসা বিএসএফ জোয়ানদের দেখলেই রহিম ঘৃণায় চোয়াল শক্ত করে তাকায়, তারপর লুঙ্গি কাঁধে তুলে সীমান্তের দিকে লিঙ্গ উঁচিয়ে প্রস্রাব করে দেয়। সে প্রস্রাব ধানখেত থেকে এঁকেবেঁকে ছুটে যায় জিনজিরাম নদীর বুকে।