শ্রাবণ সন্ধ্যা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | ১৩ কার্তিক ১৪২৭

শ্রাবণ সন্ধ্যা

ছন্দা দাশ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

print
শ্রাবণ সন্ধ্যা

শ্রাবণের সন্ধ্যা। বেলা তার বাঁশি বাজিয়ে গেল। একটু আলো তখনও রয়ে গেছে পাতিলের তলার ক্ষীরের মতো। টুনটুন চেয়ে দেখে সে আলো ওদের বাড়ির মাঠ ছাড়িয়ে অনেক দূরে ইউক্যালিপটাস গাছের মাথায় তাকিয়ে আছে। সূর্য এখন টকটকে লাল। ওখানে কিছু রাধাচূড়া, সোনালু ফুলের গাছ আর কৃষ্ণচূড়া গাছও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। গাছে এখন ফুল নেই। তবুও গাঢ় সবুজ পাতা নিয়ে ওরা মহান। অনেকদিন পর টুনটুন আজ ওদের হৃদয়পুরের বাড়িতে এসেছে।

তার শরীরের ভেতর আরেকটা শরীর জেগে আছে। টুনটুনের কেমন অদ্ভুত লাগে। নিজের শরীরের ভেতর প্রাণ দিয়ে, আলো দিয়ে, খাবার দিয়ে সে তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলছে। রোজ সে পেটে হাত দিয়ে দেখে কতটুকু বড় হলো। তখন সে টের পায় তার স্পন্দন। টুনটুন আদর করে বলে, হ্যাঁ রে সোনা, বল তো আমি কে? তুই আসবি কখন? আমি যে তোর জন্য অপেক্ষা করে আছি। তুই এলে তোকে আমার সব মনের ইচ্ছেগুলো বলব। তারপর দুজনে মিলে গড়ে নেব ইচ্ছের পৃথিবী। শ্রাবণের বাইশ তারিখ টুনটুনের সন্তান পৃথিবীর মুখ দেখবে।

টুনটুন তার নাম ঠিক করে রেখেছে কাব্যরবি। এজন্যই সে বাবার বাড়িতে এসেছে। সবাই বলে প্রথম সন্তান মায়ের বাড়িতে মায়ের কাছে হওয়া ভালো। তাই না শাশুড়ি আসতে দিল। নইলে কি আর ছাড়ত! এসব কথা টুনটুন তাদের বাড়ির পেছনের মাঠে একটা খড় ছাওয়া চাতালের মতো জায়গায় বসে ভাবছিল। এখানে রোজ বিকেলে টুনটুনের বাবা এসে বসত মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। সব কেমন ভেজা ভেজা। শালিকের দল ঘাস থেকে খুঁটে খাচ্ছে পোকা। ভিজে গায়ে গাছের পাতা থেকে টুপটাপ টুপটাপ জল ঝরে পড়ছে। ভিজে মাটির গন্ধ, ঘাসের বুকের গন্ধ, বৃষ্টির গন্ধ, সন্ধ্যামালতীর গন্ধ, পোকা আর পাখির গন্ধের সঙ্গে টুনটুনের মনের গন্ধ মিলে টুনটুনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন দূরে দূ...রে কোথায়।

টুনটুন তন্ময় হয়ে আছে। হঠাৎ এক ঝলক রোদ এসে পড়েছে যেখানে টুনটুন দেখে একটা গাছের গুঁড়ি থেকে নতুন করে কচি দুটো পাতার ওপর। টুনটুন তাকিয়ে আছে তো আছেই। তার চোখে এখন হরিণের দৃষ্টি। তার চোখ চারপাশের জগৎ ভুলে গাছের গুঁড়িতে আটকে আছে। কোনাকুনি হয়ে আসা রোদের একফালি আলো কচি পাতার ওপর পরে ঝকঝক করছে। টুনটুন জানে ওইটি রক্তচন্দনের চারা। অনেক আগে তার বাবার লাগানো গাছ। অনেক বড় ছিল সে গাছের শরীর। সে গাছের গন্ধে তাদের বাড়ির নামই হয়ে গেছিল চন্দনবাড়ি।

বাড়ির পেছনে আরও অনেক গাছ আছে। কিন্তু তাদের গন্ধ আলাদা করে আর মুখর হতো না। বাবা সেই গাছ এনেছিল মেলা থেকে। টুনটুন তখন খুব ছোট। তাকে নিয়ে চারা লাগাতে লাগাতে বলেছিল, দেখবি এ গাছ যখন বড় হবে কেমন গন্ধ ছড়ায়। আমাদের বাড়িটাই মন্দির মনে হবে। আমি যখন থাকব না এই গন্ধে তোদের মনে হবে আমি সবসময় তোদের কাছাকাছি রয়ে গেছি। কিন্তু সেই গাছ তো বাবার সঙ্গেই মরে গেছে। সেও প্রায় দু’বছর হয়ে গেছে। এতদিন পরে মরা গাছের গুঁড়ি থেকে কি আবার নতুন চারার জন্ম হয়?

তবে কি বাবা আবার ফিরে আসছে? ভাবতে ভাবতে টুনটুন তার স্ফীত উদরের দিকে তাকিয়ে এক আনন্দ পুলকে কেঁপে ওঠে। বাবার মৃত্যু যেদিন হয়েছিল সেও ছিল ২২ শ্রাবণ। অন্য মানুষের মতো বাবার ধর্ম বোধ একরকম ছিল না। ধর্মের চলিত আচার, নিয়ম কোনোটাই বাবা মানত না। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল অন্ধের মতো। বাবা বলত এদের মধ্যেই ঈশ্বর বেঁচে থাকেন। এদের ভালোবাসবি। তাহলেই ঈশ্বরকে ভালোবাসা হবে। বাবাকে বরং রবীন্দ্রনাথকে ঈশ্বরজ্ঞানে ভক্তি করতে দেখেছে টুনটুন। টুনটুন বাবার সঙ্গে ছায়ার মতো থাকত।

সবাই বলত টুনটুনের মুখ বাবার মুখটা কেটে বসান। বাবাই ওকে শিখিয়েছে রবীন্দ্রনাথকে কেমন করে ভালোবাসতে হয়। বাবার গায়ের গন্ধও ছিল চন্দনের মতো। ঠাকুমা বলত যেসব মানুষরা পবিত্র হয় তাদের গায়ের গন্ধও চন্দনের মতো হয় যাতে অন্য মানুষরা সে গন্ধে সুবাসিত হয়। টুনটুন এতসব তখন বুঝত না সুবাসিত কাকে বলে। এখন বোঝে সুবাসিত মানে জ্ঞানের আলো। তাদের আত্মীয়স্বজনরা যখন টুনটুনের মাকে বলত মেয়ে তো বাবার মতো আলাভোলা। মা ভয় পেয়ে ঠাকুমাকে বলত, ‘মা, এ মেয়ে কি স্বামীর ঘর করতে পারবে?’

ঠাকুমা পানের রস গিলে নিয়ে বলতেন, বালাই ষাট। এমন কথা বলতে নেই বউমা। মায়ের কথা অনেক সময় ফলে যায়। আমি তো কখনও মিথ্যে বলিনি, অন্যায়ও করিনি। তাই তো ঠাকুর আমার কোলে অপুর মতো এমন সন্তান দিয়েছে। টুনটুন অপুর সন্তান। তুমি দেখ টুনটুনের কপালে রাজতিলক এঁকে দিয়েছেন ভগবান। সেই কথা শুনে মায়ের মুখে যেন পৃথিবীর সব আলো এসে উজ্জ্বল করে তোলে টুনটুনদের ঠাকুরঘরের দুর্গাপ্রতিমার মতো।

ঠাকুরমার কথা সত্যি সত্যিই ফলেছিল। টুনটুনের বাবার সবচেয়ে উজ্জ্বল আর প্রিয় ছাত্র শৌর্য যেদিন তার ডিগ্রি আর গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেছিল, ‘স্যার, জীবনের শুরুতেই যদি আপনার মতো শিক্ষক না পেতাম তবে আমার আজ মানুষ হওয়া সম্ভব হতো না। আজ আপনার জন্য আমি কিছু করতে পারলে ভাবব আমি সত্যিই কিছু করতে পেরেছি।’

টুনটুনের বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘বেশ। যদি তোমার আপত্তি না থাকে তবে আমার টুনটুনকে তোমার হাতে দিতে চাই। তুমি তার মর্যাদা দিও।’
শৌর্য বাবার পায়ে প্রণাম করে সেদিনই তার বাবা-মাকে পাঠিয়ে টুনটুনকে আশীর্বাদ করে গিয়েছিল। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই আকাশ আবার কালো হয়ে এল। তাই দেখে টুনটুন উঠে দাঁড়াতেই কোমরে টান খেল। সে উহ্ করে খুঁটি চেপে দাঁড়াল। শরীর তার ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। আগের মতো ছুটে যেতে পারে না।

এদিকে সন্ধ্যাও পা বাড়িয়ে আছে। শাঁখের আওয়াজ পড়ল বলে। তার আগেই ঘরে না ফিরলে মায়ের উৎকণ্ঠা বাড়বে। এখন আর আগের গন্ধটা নেই। হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে বাতাবি ফুলের গন্ধ। গুড়গুড় করে আবার মেঘের ডাক। কাদের বাড়িতে গরু ডাকল হাম্বা হাম্বা... আ... আ...।

টুনটুন গুঁড়িটার কাছে যেতেই হাল্কা চন্দনের গন্ধ নাকে এসে লাগল। মনে হচ্ছে সেই আগের মতো বাবা এসে দাঁড়িয়েছে। টুনটুনের চোখে জল। তার বিয়ের পর বাবা আর দুবছরও বাঁচেনি। হঠাৎ করেই বাবা দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছিল। সামান্য জ্বর আর দুর্বলতা। প্রথমে তো দুলাল কাকুর চিকিৎসা চলছিল। শেষে দুলাল কাকুই বলল, দাদা, এবার শহরে গিয়ে একবার দেখিয়ে আসুন। আর শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর পরই জানা গেল বাবার রক্তে লিউকেমিয়া।

সেদিন ওদের চন্দনবাড়ির আকাশ ভেঙে পড়েছিল।

এরপর তো বাবা মাত্র একমাস বেঁচে ছিল। সে একমাস টুনটুন ছায়ার মতো বাবার পাশে পাশে ছিল।

তাই দেখে বাবা বলেছিল, এমন করতে নেই মা। জন্মের মতো মৃত্যুকেও আপন ভাবতে হয়। দেখবি আমি ঠিক আবার ফিরে আসব তোর ভালোবাসায়। তোর সন্তান হয়ে। টুনটুন জানত বাবা তাকে মন ভালো করার জন্য মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছে। মরলে কি মানুষ ফিরে আসে?

সবচেয়ে যেটা ওদের অবাক করেছিল যেদিন থেকে বাবার অসুস্থতা শুরু সেদিন থেকেই রক্তচন্দনের পাতাও শুকিয়ে আসছিল। রোজ কত পাতা ঝরে পড়ত। আর যেদিন বাবা চির শান্তির ঘুমে ঘুমিয়েছিল, সেদিনও ছিল শ্রাবণের বাইশ তারিখ। বাবার সঙ্গে সঙ্গেই রক্তচন্দন গাছটি বিনা ঝড়েই ভেঙে পড়েছিল। সেই চন্দনের কাঠেই বাবার শ্মশান সাজানো হয়েছিল। তার গন্ধে চন্দনবাড়ি ছাড়িয়ে পুরো গ্রাম জেনেছিল অপূর্ব বাবু আর নেই।

আজ দীর্ঘ দিনের পর সেই মরা গাছের গুঁড়ি থেকে নতুন চারা কী করে জন্ম নিল, টুনটুনের খুব বিস্ময়। সে খুব কাছে গিয়ে তার পাতায় আলতো হাত রাখে। তবে কি সত্যিই বাবা তার কথা রেখেছে? বাবাই তার সন্তান হয়ে ফিরে আসছে! টুনটুন ঘরে ফিরে আসে। বৃষ্টি যখন বড় বড় ফোঁটায় নেমে এসেছিল। তারও বিশদিন পরে ২২ শ্রাবণ।

টুনটুন বাবার মতো করেই কবি ঠাকুরের ছবিতে ফুলের মালা দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যে ছুঁইছুঁই। শ্রাবণের সন্ধ্যার গন্ধই একদম আলাদা। তার শব্দও আলাদা। বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাক। জোনাকের দল জ্বলছে আর নিভছে। সন্ধ্যার সেই নীরবতাকে খণ্ডন করে চন্দনবাড়ি থেকে ভেসে এল নবজাতকের কান্না। আর তার সঙ্গে ভেসে এল শিশু রক্তচন্দনের গন্ধ। সবাই বলছে টুনটুনের বাবা আবার ফিরে এসেছে তার গর্ভ থেকে। তার সন্তানের মুখখানি নাকি বাবার সেই মুখ। টুনটুন অজানা কারও উদ্দ্যেশ্যে প্রণাম করে।