‘পরীক্ষামূলক লেখায় আত্মপ্রকাশ সহজ’

ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০ | ৭ কার্তিক ১৪২৭

‘পরীক্ষামূলক লেখায় আত্মপ্রকাশ সহজ’

ড. শাহনাজ পারভীন সম্পাদক, দ্যোতনা ১২:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

print
‘পরীক্ষামূলক লেখায় আত্মপ্রকাশ সহজ’

লেখক সৃষ্টির আঁতুড়ঘর লিটল ম্যাগাজিন। নবীন লেখকদের অধিকাংশ হাত মকশো করেন এখানে। লিটলম্যাগচর্চার নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন যশোর থেকে প্রকাশিত ‘দ্যোতনা’ সম্পাদক ড. শাহনাজ পারভীন। সঙ্গে ছিলেন শফিক হাসান

কোন লক্ষ্য থেকে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন? অর্জন বা বিসর্জন কী?
ছোট কাগজ তো সবসময় একটি গোষ্ঠীবদ্ধ কাগজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আমার ভাবনা এই গোষ্ঠীবদ্ধতার বিপরীত মেরুতে। সব ঘরানার ভালো মানসিকতার মানুষগুলোকে এক কাতারে আনতে চাই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্থানিক কোনো বিভেদ আমি মানি না। আমার কাছে একটিই শর্তই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে সত্যিকারের ভালো মনের মানুষ হওয়া। সকল প্রকার নীচতা, দীনতা, হীনতা ও কুটিলতার ঊর্ধ্বে এক পরিচ্ছন্ন মানবিক মানুষ।
অর্জন বলতে মানুষকে চিনতে শেখা। বর্জন বলতে সময় এবং অর্থের অপচয় হয় বটে, তবে অর্জন ও বর্জনের মাঝখানে আত্মতৃপ্তিটাই মূল। মননশীলতার পক্ষে কিছু একটা করার চেষ্টা। করতে পারা।

বর্তমানে লিটলম্যাগচর্চা কেমন হচ্ছে? আপনার দৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ম্যাগ কোনগুলো?
ডিজিটাল যুগে দেশে দেশে ভার্চুয়াল যোগাযোগের এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এই সময়ে প্রচুর উল্লেখযোগ্য ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে। সেখান থেকে দু’একটির নাম উল্লেখ করা আসলেই সম্ভব নয়। লেখক সৃষ্টিতে লিটল ম্যাগগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ লেখকেরই আবির্ভাব হয়েছে লিটলম্যাগের মাধ্যমে। পরীক্ষামূলক লেখার মাধ্যমে লেখকের আত্মপ্রকাশ সহজ। যেটা দৈনিক কাগজের সাহিত্য পাতায় সম্ভব নয়।

সম্পাদনায় কী ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করছেন? কী বৈশিষ্ট্যে লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রিকাকে আলাদা করবেন?
একজন যোগ্য সম্পাদককে বলিষ্ঠ হাতে সম্পাদনা করতে হয়। পর্যাপ্ত সময়, ফান্ড, ভালো লেখা জোগাড় করার ব্যাপারেও বেশ প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয়। লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রিকার মধ্যে মূলত পার্থক্যটা আদর্শের। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে নিয়মিত ‘দ্যোতনা’ প্রকাশ করতে চাই। বর্তমানে অনলাইন পোর্টালের ভিড়ে প্রিন্টেড পত্রিকার গুরুত্ব একটু কমেছে ঠিকই তবে তার প্রয়োজন এখনো অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতেও সমান গুরুত্ব থাকবে।

কোনো কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখেন? ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক কাগজের কী ধরনের পার্থক্য থাকা জরুরি?
পর্যাপ্ত সময়, নিষ্ঠা এবং লেগে থাকা। এই তিনের সমন্বয়ে যদি কেউ দাঁড়িয়ে যেতে পারে, সেটাতে খারাপ কিছু দেখি না। ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক পার্থক্য- বিষয়টি আসলে একটু স্পর্শকাতর। উত্তরটা এরকম হতে পারে, ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক কাগজের পার্থক্যটা আসলে বাণিজ্যিক। বাণিজ্যিক মানসিকতা নিয়ে ছোটকাগজ করা যায় না। ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা- মূল পার্থক্যটা থাকা জরুরি।

দ্যোতনা’র প্রকাশিত সংখ্যা কতটি? বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যাটি, কেন?
দ্যোতনা’র প্রকাশিত সংখ্যা ছয়টি। আমি যেহেতু ‘ছড়াঘর’ নামের আরও একটি ছোটকাগজ (ছড়া সাহিত্যের কাগজ) সম্পাদনা করি; যেটি প্রত্যেক বৈশাখে প্রকাশিত হয়। তাই দ্যোতনা’র খুব বেশি সংখ্যা করা হয়নি। এর প্রতিটি সংখ্যাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রবন্ধ, মুক্ত গদ্য, সাক্ষাৎকার, গল্প, কবিতা, ছড়া, গ্রন্থালোচনাসহ দেশের বিশিষ্ট লেখকদের লেখা নিয়ে দ্যোতনা এক নান্দনিক অবয়বে প্রকাশ পায়। প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল নবীন লেখকদের লেখাকে বিশেষ গুরুত্ব দিই। নতুন লেখক সৃষ্টিতে ‘দ্যোতনা’ সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

কথাসাহিত্যের কাগজ হাতেগোনা, কবিতার কাগজ অগণন। নেপথ্য রসায়ন কী বলে মনে করেন?
নেপথ্যের মূল রসায়ন বলতে আমার মনে হয় কাগজের কলেবর। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে অর্থনৈতিক ব্যাপারটা। তাছাড়া সাহিত্যজগতে অসংখ্য কবির উপস্থিতি চোখে পড়লেও কথাসাহিত্যিকের সংখ্যা কিন্তু অপ্রতুল। সবসময় মানসম্মত লেখা পাওয়াটাও বেশ সহজ হয়ে ওঠে না।

লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতা আমার খুব পছন্দ নয়। যেখানে সাহিত্য শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘সহিত’ বা ‘মিলন’।
সেখানে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে সাধারণের থেকে দূরে থেকে এক সংকীর্ণতার পরিচয় দেওয়াটা আমার মনোঃপুত নয়। আমি মনে করি নতুন, পুরাতন, জাতি, ধর্মের ঊর্ধ্বে অবস্থান করাই হচ্ছে সত্যিকারের সাহিত্য কাগজের বৈশিষ্ট্য। তবে অবশ্যই নৈতিকতা এবং মানসিকতার দিক থেকে তাদের একই প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হবে। সাহিত্যজগতে কোনো সীমানা থাকা উচিত নয়। সত্যিকার সাহিত্য কাগজের ক্ষেত্রে দুই বাংলার লিটলম্যাগচর্চার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখি না।

আপনার জন্ম-জেলার লিটলম্যাগচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জানতে চাই। এখানে আপনার পছন্দের লিটলম্যাগ আছে কি?
আমার জন্ম-জেলা ফরিদপুর। বৈবাহিক এবং কর্মসূত্রে যশোর জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করি। সেক্ষেত্রে দুটি জেলাই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। যশোর জেলার লিটলম্যাগচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমেই জেলা প্রশাসন, যশোর কর্তৃক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ‘মধুকর’; যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃক প্রকাশিত দূর্বা, পরবর্তীকালে ‘নৈকট্য’; যশোর সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ভাঁজপত্র ‘পদ্যপত্র’; যশোর শিল্পীগোষ্ঠী কর্তৃক প্রকাশিত ‘সৃষ্টি’; যশোর সাহিত্য কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত ‘মই’; যশোর বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক ‘একুশের পত্র’, বাৎসরিক ‘বিদ্রোহী’; অগ্নিবীণা কেন্দ্রীয় সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক ‘সবুজ লাঙল’, বাৎসরিক ‘অগ্নিবীণা’; প্রাচ্য সংঘ কর্তৃক ‘প্রাচ্য সংবাদ’; মুক্তেশ্বরী সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘মুক্তেশ্বরী খেয়া’ প্রভৃতি সংগঠন কর্তৃক প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগ।

এর মধ্যে আমি যশোর শিল্পীগোষ্ঠী সাহিত্য কেন্দ্র, যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি, যশোর জেলা প্রশাসন এবং অগ্নিবীণা কেন্দ্রীয় সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত লিটলম্যাগ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছি এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত করছি।

সংগঠনের পাশাপাশি যশোর জেলায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু পছন্দসই লিটলম্যাগ রয়েছে। তার মধ্যে অনি আলমগীর সম্পাদিত ‘আরক’, ‘রংতুলি’; আনোয়ারুল ইসলাম সম্পাদিত ‘সময়’, শিমুল আজাদ সম্পাদিত ‘বিবর’, ‘শিল্পগ্রাম’; তহিদ মনি সম্পাদিত ‘স্রোত’, ‘দোদুলমন’; শাহরিয়ার সোহেল সম্পাদিত ‘ফেরা’, ‘পথিক’; শাহনাজ পারভীন সম্পাদিত ‘দ্যোতনা’, ‘ছড়াঘর’; কাসেদুজ্জামান সেলিম সম্পাদিত ‘লিরিক’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য মানোত্তীর্ণ। তবে বর্তমানে ‘দ্যোতনা’, ‘ছড়াঘর’, ‘পথিক’, ‘শিল্পগ্রাম’ ছাড়া অন্য কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশ পায় না। ফরিদপুর জেলা থেকে বর্তমানে প্রকাশিত মফিজ ইমাম মিলন সম্পাদিত ‘উঠোন’ ও মাজেদুল হক লিটু সম্পাদিত ‘শব্দকাহন’ উল্লেখযোগ্য।

আপনার লিটলম্যাগের নামকরণের পেছনে কী ভাবনা কাজ করেছিল?
‘দ্যোতনা’ অর্থ সূচনা। লেখক হিসেবে নিজের চিন্তা-চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করতে নিজের সম্পাদিত ছোটকাগজের কোনো বিকল্প নেই। নিজস্বতা সৃষ্টির সূচনাকেই ‘দ্যোতনা’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি।