সরল স্বীকারোক্তির চিত্রাঙ্ক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ | ৭ কার্তিক ১৪২৭

সরল স্বীকারোক্তির চিত্রাঙ্ক

জোবায়ের মিলন ১২:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

print
সরল স্বীকারোক্তির চিত্রাঙ্ক

কুশল ভৌমিক-এর ‘দুঃখের কোন মাতৃভূমি নেই’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ছি। ‘পড়ছি’ বললাম এই কারণে, সদ্য পড়া এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়া শেষ করেও যেন শেষ হয়নি। কাব্যিক চিত্রাঙ্কের অমোছনীয় একটি রঙ মনের, মগজের ভাবনায় কোথায় যেন লেগে আছে মোটাদাগে। চলতি পথের ধুলোয় গ্রন্থস্থ কবিতা সময়ান্তে ঢেকে তো যায়ইনি বরং উজিয়ে সজাগ অতন্দ্র প্রহরীর মতো। বর্ণনাধর্মী কবিতাগুলো কাব্যগ্রন্থকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা।

কবিতাগুলো পড়ার সময় মনে হয়েছে খোলা কোনো মঞ্চে সহস্র শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে কবি নিঃসঙ্কোচে বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন একটানে। আরও মনে হয়েছে, কাব্যগ্রন্থটিতে সচেতন খেয়ালে কাব্যিক মারপ্যাঁচকে পরিহার করে সাধারণ পাঠকের বোধের কোরকে টোকা দেওয়ার জন্যই সরল, পক্ষান্তরে চিন্তাশৈলীর কৌশলটি অবলম্বন করেছেন; যা কবিতাগুলোকে দিয়েছে অমূল্য মূল্য। এখানেই গ্রন্থটির নিজস্বতা নিহিত। ‘আমার ঠাকুরদা একজন কৃষক ছিলেন/ মাটিগন্ধা হাতে তিনি শস্য ফলাতেন/ ধানের কাছে হৃৎপিণ্ড সমর্পণ করে/ তিনি শিশুর সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন/ প্রতিটি ধান তখন কবিতা হয়ে উঠত/ আদিগন্ত মাঠ তখন কবিতার খাতা।’ (আদিগন্ত ফসলের কবিতা)। সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ, সীমানা, প্রকৃতি, জীবন আর নশ্বর-অনশ্বর অনুষঙ্গ, উপকরণ, ফলশ্রুতি কবিতায় উদ্ধৃত সচেতন সাবলীলতায়।

কবি যে কেবল বর্ণনা-ধর্মকে আঁকড়ে ধরে কবিতা নির্বাচনে একরৈখিক হেঁটেছেন তেমনটি ভাবনারও অবকাশ পাওয়া যায় না, যখন তিনি তুলে ধরেন এমন কবিতা, ‘দুপুরের দুর্বিনীত রোদ/ বিকেল গড়াতেই হামাগুড়ি দিতে দিতে/ যেমন করে হারিয়ে যায় দেবদারু পাতার ভেতর/ সুইসগেটের অবাধ্যতা মেনে যেমন করে/ কল্পনার ভেতর হারিয়ে যায় পাল তোলা নৌকা/ তেমনি জীবন থেকে অনেক গল্প হারিয়ে যায়/ আমাদের কৃষ্ণচূড়া দুপুর, জলপাই বিকেল, কামরাঙা ভোর/ আমাদের নাতিশীতোষ্ণ বেঁচে থাকা।’ (গল্পের পটভূমি)। 

অন্যায়, অনাচার, বিচ্যুতি, বিদ্বেষ, বিভেদ, বিরোধ, বিনাশের বিরুদ্ধে সোচ্চার শব্দকণ্ঠও এই গ্রন্থের কবিতায় শান্ত বয়ানের ভাঁজে অশান্ত উচ্চারিত হয়েছে। মাটির প্রতি আনত নয়ন নিবিষ্ট রেখে তিনি যে উদাত্ত আহ্বানের বিশ্বস্বর ছুড়ে দিয়েছেন বিশ্বস্বরে তাও মলাটবদ্ধ হয়েছে সংকোচহীন ভাষায়। যারা পৃথিবীকে ধ্বংস করতে একাগ্রচিত্ত বিদ্ধ করে রেখেছে অপশক্তির পায়ে, যারা অবিসংবাদিত ‘মানুষ’ সত্যকে কোণঠাসা করে মানুষের ঘাড় মটকে রক্ত পিপাসা নিবারণের কূটচালে সদাব্যস্ত তাদের প্রতি কবির যে অনুরোধ বা আঙুল তোলা হুঁশিয়ারি তা পড়তে গিয়ে শিরশির করে উঠেছে রক্তের রেণু, ‘মানুষকে উড়তে দিন/ কেননা, প্রতিটি মানুষ ভেতরে ভেতরে একেকটা পাখি/ পরিযায়ী মেঘের মতো মানুষ ভেসে বেড়াতে চায়/ আত্মরচিত সুনীল আকাশে-/ দোহাই আপনাদের, অদৃশ্য শেকলে মানুষকে বাঁধবেন না/ তাকে দিন উড়বার স্বাধীনতা।/...মানুষকে উড়তে দিন; মানুষ বিশ্বাস করুক-/ উন্মুক্ত আকাশটাই মানুষের মাতৃভূমি।’ (মানুষকে উড়তে দিন)।

মানুষকে বাদ দিয়ে মানুষ কখনো বলিয়ান হয় না; মানুষের কথাই কবি কুশল ভৌমিক ‘দুঃখের কোন মাতৃভূমি নেই’ কাব্যগ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামের কবিতায়। মূলে আসলে সবগুলো কবিতা মিলিয়ে একটি বক্তব্যই উড্ডিন- মানুষ। কাব্যগ্রন্থটি পড়ে চেনা হল কবিতার উত্তরাধুনিকতায় আরেক স্বরের কবিতার সুর; দেখা হল, তার কথাই সত্য, ‘...মানুষের দুঃখের কোন মাতৃভূমি নেই/ না সে ঠাঁই পায় আসমানে না জমিনে।’ (দুঃখের কোন মাতৃভূমি নেই)। এককথায় গ্রন্থটি পাঠোপর মনে হয়েছে, এ যেন সরল স্বীকারোক্তির বাক্সময় এক চিত্রাঙ্ক। প্রত্যাশা করি, এমন কবিতা পাঠকের পাঠের দ্বারে দ্বারে পৌঁছুক, পৌঁছে ঋব্ধ করুক পাঠানুভবের শান্ত কোমল স্নিগ্ধ উঠান।