জীবন-শিল্পী দীলতাজ রহমান

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

জীবন-শিল্পী দীলতাজ রহমান

শফিক হাসান ১:৫৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

print
জীবন-শিল্পী দীলতাজ রহমান

লেখককে থাকতে হয় সতত সচেতন। বাক্যের সঠিক প্রয়োগ, আধুনিক বানানবিধি, নির্ভুল তথ্যসহ নানাদিকেই রাখতে হয় সতর্ক চোখ। অন্যথায় পা হড়কানোর ভয়! অপ্রিয় সত্য, কতিপয় লেখক নাম ছাপানোর বিষয়ে যতটুকু আগ্রহী, লেখায় তার ছিটেফোঁটাও নয়। বাক্য-বানানের ছিঁরিছাদ নিয়ে ভাবেন না। অল্প কয়েকজন লেখকের মধ্যে দীলতাজ রহমানকে পেয়েছি ব্যতিক্রম, বানান বিষয়ে শতভাগ সচেতন। প্রায়ই মেসেনজারে তার ডাক পাই- এই শব্দের বানানটা কি এমন?

এই সচেতনতা মুগ্ধ করে। মনে হয়, বানান শুদ্ধ রাখার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্মান জানাচ্ছেন ভাষাশহীদদের, মুক্তিযোদ্ধাদের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নানাদিক থেকে অনন্য দীলতাজ রহমান। লেখক হিসেবে কতটা বড়, হিসাব করার ঢের সময় পড়ে আছে। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার তুলনা হয় না, দ্বিমত করবেন না ঘনিষ্ঠ শত্রুটিও। অনেক লেখক বইয়ের ফ্ল্যাপ লেখানোর জন্য বড় মানুষের দোরে ধর্না দেন। কিন্তু দীলতাজ রহমান নির্ভর করেন নিকটাত্মীয় ও নবীন লেখকদের ওপর। বিভিন্ন সময়ে তার বইয়ের ফ্ল্যাপ লিখেছেন বোন নাসিমা ভূঁইয়া থেকে শুরু করে সন্তানরা। বিদ্যুৎ বিহারি, ফারুক সুমন থেকে আমিনুল হক বিরাশির মতো ছড়াকার-পাঠকও।

নবপর্যায়ে বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে কোর্স করেছি। একদিন ক্লাসে আবিষ্কার করলাম দীলতাজ রহমানকে। চুপিসারে বসেছেন সন্তানতুল্য কচি-কাঁচাদের পাশে! তাজ্জব ব্যাপার। তিনি তো উল্টো ক্লাস নেওয়ার যোগ্য, সতীর্থ হবেন কেন! এরপর প্রায়ই দেখতাম, সময় পেলেই চলে আসতেন। লেখালেখির ব্যাকরণ আরও শেখার জন্য এমনই উদগ্র বাসনায় মনোভুবন জারিত। সৈয়দ শামসুল হক, শামসুজ্জামান খান, ভীষ্মদেব চৌধুরী, খায়রুল আলম সবুজ, খালেদ হোসাইন প্রমুখ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের নির্দেশনা ও পরামর্শ আমরা গোগ্রাসে গিলেছি, দীলতাজ রহমানও হয়তো পুষিয়ে নিয়েছেন অপূর্ণতাটুকু। অথচ অনেক গৌণ লেখকেরও অহঙ্কারে পা পড়ে না মাটিতে। অহেতুক অহমিকা নেই বলেই দীলতাজ রহমান শনাক্ত হন মানুষ হিসেবে। তার পরিচয়ের পরিধি, বিশিষ্টজন থেকে সাধারণ মানুষটি পর্যন্ত। স্নেহের পেলব স্পর্শ কিংবা ভালোবাসার একটুখানি ছোঁয়া এই ভেজালের যুগে তিনিই বিলিয়ে যান অকাতরে, অবলীলায়। তাতে ঐশ্বর্যশালিনীর ভাণ্ডার শূন্য না হয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বইমেলায় হাঁটতে হাঁটতে তিনিই পারেন সামনে পরিচিত কাউকে দেখে দাঁড়িয়ে ভ্যানিটি ব্যাগে হাত দিয়ে বের করতে শিঙাড়া, সমুচা। তারপর বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, খাও! এভাবেই ফেরি করেন মমতার বিস্তৃত মায়াজাল।

বাসায়ও তিনি অনেককে দাওয়াত করেন, অকৃপণ হাতে ভুরিভোজন করান। দীলতাজ রহমানের ডেরায় পা পড়েনি এমন সাহিত্যিক ও শিল্পজন কমই আছেন। একবার প্রখ্যাত এক রাজনীতিবিদ মজা করে বলেছেন, দীলতাজ হয়ত দৈন্য-দানবও পোষেন; নইলে বড় বড় হাঁড়ি-পাতিলগুলো কে তোলে!

এখানে অন্তত সন্দেহ পোষণ করি না। তিনি আসলেই দৈত্য-দানবেরও মালকিন। নইলে এতকিছু একত্রে সামলান কীভাবে! ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামী হঠাৎ গতায়ু হলে একাই হাল ধরেছেন সংসারের। চার সন্তানকে গড়ে-পিটে মানুষ করার যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে টিকিয়ে রেখেছেন লেখকসত্তাও। আড়ালে-আবডালে দীলতাজ রহমানকে গুণ্ডা ডাকি। আবার হতে চাই তারই মতো সৃজনপ্রয়াসী, মানবপ্রেমী গুণ্ডা। ফেসবুকে, বইয়ে, পত্রিকায় এই ‘গুণ্ডা’ আমাকে নিয়ে কয়েকবার লিখেছেন। এমন আরও অনেককে নিয়ে। মানুষকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা তার প্রবল। বলেছি, প্রশংসা বেশি হয়ে যাচ্ছে। উত্তর দিলেন, বেশি হোক, কম যেন না পড়ে! এমনই দরাজ দিল। নামের সঙ্গে মিলিয়েই কি নিজেকে বদলে নিয়েছেন আমূল! তার সবকিছুই বেশি বেশি! অতিকথনে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেলেও তিনি বক্তব্যে স্থির থাকেন। কিশোর শফিক হাসানের উত্থানকালের সাক্ষীও তিনি। সেটা অন্য কোনো সময় বলা যাবে।

একবার ভোরের পাতা কার্যালয়ে গিয়েছি। অগ্রজ লেখক আলমগীর রেজা চৌধুরী বললেন, ‘গেদা, তোর জন্য চাকরি ঠিক করতাছি।’ অবাক কাণ্ডা, চাকরি নেই কীভাবে বুঝলেন! পরে জানলাম, দীলতাজ রহমানই সুপারিশ করেছেন। আরেকবার সাবেক কর্মস্থলে কী যেন বলে এসেছেন। উৎস প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম তা শুনে পরে মন্তব্য করলেন, শফিকের বড় একজন শুভানুধ্যায়ী পাওয়া গেল। তিনি অনেকেরই পরম সুহৃদ, দুঃখ কিংবা আনন্দের বন্ধু। একের সঙ্গে অপরের যোগাযোগ স্থাপন করে দেন। অপরিচয়ের ফাঁকটুকু মিলিয়ে দিতে প্রয়াসী সর্বদা। ফেসবুকেরও ইতিবাচক ব্যবহার করেন। লেখালেখির চর্চাকে শাণিত রাখতে প্রযুক্তি তার সহায়ক। সময় নষ্ট করেন না তিনি, অনেকের মতো নিজেকে ব্যবহৃত হতে দেন না।

গতকাল ছিল তার জন্মদিন। শ্রমনিষ্ঠ একজন লেখকের শুভ জন্মদিনে পাঠক হিসেবে জানাই শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। জীবনবাদী শিল্পীর লেখার ভুবন বিস্তৃত হোক আরও, বাসিন্দা হিসেবে এটাই আকাক্সক্ষা।