মাল্য বিসর্জন

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

মাল্য বিসর্জন

ইমরুল কায়েস ১:৫৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

print
মাল্য বিসর্জন

তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিকের কুশীলব। অবস্থা এমন ছিল যেখানে রাত সেখানে কাত। আবেগের ঢেউয়ে কোনো বাঁধ নেই। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে উথলে ওঠা অজানা অনুভূতিগুলো সদা মনে, মুখে ও চোখে চোখে ভাসত আর থৈ থৈ করত তেমনি পাড়ার ছেলে-ছোকরাসহ রইরই আর হৈ হৈ করে দিন কাটত। চোখের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রাস্তা পানে চলিতে চলিতে চকিতে যে চপলাই চোখের সামনে দেখি তাকেই কয়েক মিনিটের জন্যে হৃদয় দেবী করে পুষ্প নিবেদন করতে থাকি। এই হল সেই সময়ের অবস্থা। ভালোবাসা নামক গূঢ় রহস্যের বিন্দু-বিসর্গ নিয়ে আগাপাশতলা করার ভাবনা ছিল না বা মাথায় আসেনি।

কলেজ শেষে ও ছুটির দিনগুলোতে হরিবোল বলে বেড়িয়ে পড়তাম এই অবধি কোন জলে নেমে আর কোন গাঙে ভেসে উঠব তার কোনো দিক-দিশা ছিল না। বড়ই খেয়ালী ও শিকলবিহীন জীবন পার করেছি সেই রাস্তার কোনো তন্বীকে দেখলে যে কারণ ছাড়াই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পড়ত সেই নিধিরাম সর্দারও যে এই বয়সে কারও হৃদয় আসনের পাদপদ্মে পুষ্পমাল্য পেতে পারে তা ভাবনায় ছিল না। ঘটনার রটনা যেমনটি ছিল-

আমাদের সেই হরিবোল বাহিনীর ডেরা ছিল পাড়ার একজন ভাবির ঘর। ভাবি বড়ই আমুদে এবং রসিক। ভাবি বলতে যেমন হয় তার ষোলকলায় আরও ডজন খানেক যোগ করলে বেশি বলা হবে না। ভাবির ছিল দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় মেয়েটি আর বড় ছেলেটি দুজনেই ছিল হরিবোল বাহিনীর অনিবন্ধিত নিবেদিত সদস্য। রাত বিরাতে, সন্ধ্যে, সকালে এমন কোনো সময় ছিল না সেই ডেরায় আমরা আড্ডায় মজে উঠতাম না। ভাবির বাড়ির আঙিনায় পা না রাখলে কারও পেটের ভাত হজমই হত না।

আড্ডা জম্পেশ হয়ে উঠত বর্ষাকালে। বাইরে ঘনঘোর বারিষ আর ভাবির হাতের খিচুড়ি কিংবা নতুন জলের রাঙা পুঁটি মাছের চচ্চড়ি দিয়ে গরম ধোঁয়াওঠা ভাত বা মুড়ি মুড়কির সঙ্গে গাছের শুকনো নারকেলের আঁশ। আহা দারুণ সব সভার জন্য খাওয়ার আয়োজন চলত আর আষাঢ়ে গল্প। কত বিচিত্র রকমের সভার আপ্যায়নের পদ রচনা করে আমাদের পরিবেশন করত ভাবির মেয়েটা তার ইয়ত্তা নেই।

তখনকার দিনে টেলিভিশন নামক বস্তুটা অত সস্তা ছিল না। খুব কদর ছিল সব বয়সের সঙ্গে উঠতি বয়সের স্পেশাল কাঁচা প্রেমিক-প্রেমিকা প্রবররা ছায়াছন্দ আর সাপ্তাহিক সিনেমা ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বিটিভিই বিশাল বাংলার একমাত্র বিনোদনের বাতায়ন। ভাবি একদিন বলল, তাকে একটি সাদা-কালো টিভি এনে দিতে হবে। আমাকে আর একজন নিবেদিত ভক্তকে ভাবি দায়িত্ব দিল রংপুর টাউনের সুপার মার্কেট থেকে টিভি নিয়ে আসার।

সাদা-কালো টিভি হলেও ডেরায় প্রথম কয়েকদিন বেশ আনন্দের নহর বয়ে গেল। ডেরায় এমন দুর্লভ চমৎকার বিনোদনের যোজনা হওয়ার দরুন হরিবোল বাহিনীর আড্ডার গোপনীয়তা নষ্ট হতে লাগল। এবার পাঁচ সদস্যের এই বাহিনীর আনন্দ লাটে উঠল। ভাবির ঘরে তো মানুষ কমে না। বাধ্য হয়ে হরিবোল বাহিনীর সভার সময় সূচির পরিবর্তন করে নিতে হল। রাতের আড্ডা জমে গেল দারুণ করে হিন্দি সিনেমা দেখার জন্যে ভারতের ন্যাশনাল চ্যানেলের পর্দায় ঝিরঝির হিন্দি সিনেমা দেখার জন্যে। কোনোভাবেই পরিষ্কার পর্দায় সিনেমা দেখা যেত না। এ্যান্টেনার সঙ্গে কত ভাবির নতুন ও শখের তুলে রাখা হাঁড়ি, ঢাকনা জুড়ে দেওয়া লাগত। একজন চ্যানেল সার্ফিং করত আর একজন বাইরে অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে দিত। তবুও কোনো বিরক্তি তো নেই বরং হাসি আর থামত না।

ঘটনা ঘটল ভাবির টিভি কাম মাল্টিপ্লেক্স ঘরে এক বর্ষায়। সেদিন এত ঝুম বরষা যে মনে হয় আকাশ তার দুয়ার খুলে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। বৃষ্টি থামার বালাই নেই। সেদিন কলেজ আর যাওয়া হয়নি। ভাবির ডেরার মধ্যে শুয়ে থেকে সবাই খোশগল্পে বেহুঁশ। বিদ্যুৎ নেই। আকাশে বাজের উদ্দাম নৃত্য চলছে সঙ্গে বিরামহীন জলের ধারা। গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা আর জানি না। বাইরে বেশরম বৃষ্টির বেহুলা নাচ আর আমার মোহিনী ঘুম। নাকে এমন মন কাড়া সুঘ্রাণ লাগছে; মনে হচ্ছিল কোনো রাজপ্রাসাদের বাগিচায় রাজা বেশে স্বয়ং আমি শুয়ে আছি।

আবার একটু পর হাঁটছি। চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল, নানা বর্ণের, রূপের, গন্ধের; মনমাতানো প্রাণজাগানিয়া সুবাসে ঘুম আরও জেঁকে বসেছে। বাম পাশে পাশ ফিরিয়ে শোবো একটু চোখ খুলে দেখি বাকিরা বাইরে নতুন জলের পানিতে মাছ ধরতে গেছে। চোখ বড় করে খুললে নাকের কাছে ভাবির নকশা করা বালিশের ওয়াড়ের ওপর সদ্য ফোটা বেলি ফুলের মালা! মালাটি বড় বটে সুন্দর করে গোছানো। এত সজীব আর শুভ্র বেলি ফুলের মালা আর দ্বিতীয়টি আসেনি। মালা রহস্য উদঘাটন করতে পারলেও ততদিনে মাল্য রচয়িতার বিয়ের মাল্যবরণ করে ফেলছে...।