নজরুল সাহিত্যে নিম্নবর্গের স্বর

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

নজরুল সাহিত্যে নিম্নবর্গের স্বর

প্রদিতি রাউত প্রমা ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

print
নজরুল সাহিত্যে নিম্নবর্গের স্বর

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯- ১৯৭৬) তার ছেলেবেলা থেকে জীবনের বড় একটি অংশ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন, উপলব্ধি করেছেন এর যন্ত্রণা। অর্থনৈতিক মানদ-ে তিনি নিজেই সাব-অল্টার্ন (নিম্নবর্গ) শ্রেণির সদস্য ছিলেন। একাধারে খাদেমগিরি, লেটোর সর্দারি, মৌলভীগিরি, বাবুর্চিগিরি করেছেন। তিনি যে বয়সে উপার্জনে নামেন তাকে আধুনিক সময়ে ‘শিশুশ্রম’ বলে অভিহিত করা যায়। ব্যক্তি জীবনে দীন-দারিদ্র্যের সঙ্গ পাওয়ার কারনে তার সাহিত্যে পশ্চাৎপদ মানুষের গল্প এসেছে, রাজনৈতিক ভাবনার অনেকখানি জুড়ে ছিল নিম্নবর্গ।

মোটাদাগে নিম্নবর্গ বলতে আমরা বুঝি শ্রেণি, জাতি-বর্ণ, পদমর্যাদা, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনগ্রসর জাতিকে। রণজিত গুহ প্রথম তার প্রবন্ধে নিম্নবর্গ শব্দটি ব্যবহার করেন। শব্দটি ‘বাইনারি’ বা বৈপরীত্য চেতনায় তৈরি। অর্থাৎ নিম্নবর্গ চেতনার সঙ্গে উচ্চবিত্ত চেতনা আপনা-আপনি এসে হাজির হয়। একটার সাপেক্ষে অন্যটি। যেমনÑ প্রত্যেক নিম্নবর্গই তার চেয়ে নিচু শ্রেণির কারো কাছে উচ্চবর্গ।

বিদ্রোহী রণতূর্য নজরুল তার সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে যে নিম্নবর্গের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন তা মূলত দেখিয়েছেন ‘শাসক’ ও ‘শোষিত’ এই দুই শ্রেণির সম্পর্কের টানাপোড়েন দিয়ে। শোষককে উচ্চবর্গ আর শোষিতকে নিম্নবর্গে চিত্রিত করেছেন। তাদের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। কিন্তু নজরুল কলমে নিম্নবর্গের ঘুরে দাঁড়ানোর সুরও পাওয়া যায়। অর্থাৎ নিপীড়কের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের ধ্বনি।

তুমি শুয়ে রবে তেতলার পরে আমরা রহিব নীচে অথচ তোমারে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে।
(কুলিমজুর, সাম্যবাদী)
কুলি-মজুর কবিতায় তিনি কুলি আর বাবু দুই চরিত্র দিয়ে সমাজের স্পষ্ট দুটি বিপরীত শ্রেণিকে তুলে ধরেছেন। এখানে কুলি শ্রমিক তথা বঞ্চিত শ্রেণির প্রতিনিধি, অন্যদিকে বাবু শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি। সমগ্র বিশ্বের অনেক কর্মক্ষেত্রের দিকে তাকালেই এর নজির দেখা যায়। এখনো বেতন, ন্যূনতম মানবিক সুবিধার জন্য গার্মেন্টস শ্রমিকদের মালিকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। শ্রমিকদের পক্ষে তিনি বলেনÑ
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান
তাদের ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান।
‘ধীবরদের গান’ কবিতায় যে জেলেদের কথা তিনি তুলে ধরেছেন তারা নিম্নবর্গেরই প্রতিনিধি। হাঙর- কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরে এসব জেলে, কিন্ত তার বৃহৎ লভ্যাংশ মালিক পায়।
ও ভাই
আমরা জলে জাল ফেলে রই
হোথা ভাঙার পরে
আজ জাল ফেলেছ জালিম যত
জমাদারের চরে।
(ধীবরের গান, সর্বহারা)
একই কাব্যের ‘শ্রমিকের গান’ কবিতায় কবি শ্রমিকের গাইতি-হাতুড়িতে গড়ে ওঠা সভ্যতায় তাদেরকেই ব্রাত্য করে গড়ে তোলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। আবার ‘রাজা-প্রজা’ কবিতায় নজরুল সাম্যবাদের ছবি আঁকতে চেয়েছেন। ঘোচাতে চেয়েছেন রাজার সঙ্গে প্রজার প্রভেদ। তার মতে, প্রজার প্রয়োজনে রাজার পদ সৃষ্টি হয়, রাজার প্রয়োজনে প্রজা তো নয়! তবে কেন এই শোষণ! রাজা-প্রজার এই কবিতাকে মেটাফোরিক ধরাই যায়, আর বলা যায় আজকের দিনেও এই উদাহরণ সম প্রাসঙ্গিক! তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছেনÑ
প্রজারা সৃজন করেছে রাজায়, রাজা তো সৃজেনি প্রজা,
কৃতজ্ঞ রাজা তাই কি প্রজারে ধরে করে দিল খোজা?!
(রাজা-প্রজা, সাম্যবাদী)
উপরের উদাহরণগুলো কবিতার, কিন্তু ব্যত্যয় ঘটেনি তার কথাসাহিত্যেও। সেখানেও জায়গা পেয়েছে প্রান্তিক মানুষ। ‘ব্যথার দান’র গুলশান, ‘রাক্ষসী’ গল্পের বিন্দি, ‘কুহেলিকা’র জাহাঙ্গীরের মা কিংবা ‘মৃত্যুক্ষুধা’র প্যাকাল নিম্নবর্গের সীমানা পেরিয়ে সর্বজনীনতা লাভ করেছে। ১৯২৭-১৯৩০ সময়ের মধ্যে সওগাত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়া ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে বস্তিতে বাস করা এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারকে ঘিরে। এতে প্রথম মহাযুদ্ধ পরবর্তী অর্থ সংকট, শ্রেণি বৈষম্য প্রাধান্য পেয়েছে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান কেন্দ্রে হয় না। এই সমাজকাঠামো পুরুষের সাপেক্ষে নারীকে নিম্নবর্গীয় মর্যাদাই দেয়। ক্ষমতার প্রশ্নে উচ্চবর্গের নারীরাই যেখানে পুরুষের সাপেক্ষে ‘নিম্নবর্গ’, সেখানে প্রান্তিক নারীর অবস্থান সহজেই বোঝা যায়। অর্থাৎ তারা প্রান্তিকের ভেতরে প্রান্তিক! নজরুল প্রান্তিক নারীকে কেন্দ্রের ম্যাপে আনতে চেয়েছিলেন। অন্ত্যবাসী নারীর কন্ঠে তিনি কথা বলিয়েছেন। যেমনÑ ছোটগল্প রাক্ষসী! স্বামীর লাম্পট্যে অতিষ্ঠ হয়ে দরিদ্র বাগদী গৃহবধূ বিন্দি একপর্যায়ে তাকে হত্যা করে। পুরুষতন্ত্রের উদ্দেশ্যে বলতে চায়, পুরুষরা চেঁচায় সেটাই স্বাভাবিক, সেই মান্ধাতার আমল থেকে শুধু মেয়েরাই কাটা পড়েছে তাদের দোষের জন্য। ইতিহাস পর্যালোচনা করে সাম্যবাদী নজরুল দেখেছেন কীভাবে নারীর ভূমিকা, প্রেম, প্রেরণা আত্মত্যাগ সব অগ্রাহ্য করা হয়। নারী বিষয়ে তার ভাবনার প্রতিফলনÑ
‘সেদিন দূরে নয়
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’
(নারী, সঞ্চিতা)
‘সাম্যের গান গাই,
আমার চোখে পুরুষ-নারী কোন ভেদাভেদ নাই।’
(নারী, সঞ্চিতা)
অধ্যাপক মীরাতুন নাহার নারী বিষয়ে নজরুল দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলছেন, ‘তার (নজরুল) নারী কবিতাটি ভালোভাবে পড়লে নারী সম্পর্কে তার ভাবনার এ পিঠ ও পিঠ দেখে ফেলা যায়।’
(মকবুল, পৃ. ৭৫)
নারীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায়, নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর চেষ্টায় নজরুল যে কতটুকু উন্মুখ ছিলেন তার আরও একটি প্রমাণ ‘বারাঙ্গনা’ কবিতা। অনৈতিকতার শাস্তি শুধু নারী পেতে পারে না, তা পুরুষেরও প্রাপ্য তাই তিনি জানাতে চেয়েছেন এই কবিতার মাধ্যমে। নিজের দাসত্ব কাটাতে নিজেকেই লড়ে যেতে হবে। অন্দরবাসিনী থেকে, ভয়ে জড়সড় হয়ে তা সম্ভব না। ‘নারী’ কবিতায় বারবার শৃঙ্খলের ভীতি ঘোচাতে নারীর প্রতি আহবান জানিয়েছেন তিনি।
নজরুল মার্কসের মতো প্রবল বস্তুবাদী ছিলেন না। কিন্তু আর্থিক সাম্যের পাশাপাশি সামাজিক সাম্যের প্রতিও তার নজর ছিল। চরম দারিদ্র্য তার শৈশব সঙ্গী ছিল বলেই হয়ত তিনি অবলীলায়, বিনা সংকোচে নিষ্পেষিত শ্রেণির পক্ষে কলম ধরতে পেরেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ তাই নজরুলকে উনিশ শতকের শেষ প্রান্তিক নিঃসংশয়বাদী কবি বলেছিলেন।
নজরুল সাহিত্য কেন্দ্রচ্যুত, দলিত-পীড়িত-নির্যাতিত শ্রেণিকে মহিমান্বিত করেছে। এই গোষ্ঠীর দারিদ্র্যের ছাপ সামাজিক অসহায়ত্ব, ঔপনিবেশিক শোষণের চিহ্ন তাকে প্লাবিত করেছে। এলিটের রুচির সঙ্গে ফোকের প্রয়োজন সমভাবে গুরুত্ব পেয়েছে তার লেখায়।
‘নিম্নবর্গ’ ভাবনাটিতে বহু ধারা সৃষ্টি হয়েছিল শুরু থেকেই। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধারণাগত বৈচিত্র্যও অনেক। তবে নজরুলের নিম্নবর্গ ভাবনা মূলত নিপীড়িত শ্রেণিকে কেন্দ্রে রেখে আবর্তন করেছে। আদি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত শোষিত শ্রেণি নিজের অধিকার, যাতনা নিজে জানাতে পারে না। তার কণ্ঠ অন্য কাউকে হতে হয়। কিন্তু ইতিহাসে এরকম মানুষ বিরল। নজরুল সেই শ্রেণির কলম হয়েছিলেন। নজরুল বিদ্রোহী কবি, নজরুল অসাম্প্রদায়িক কবি আর নজরুল প্রেমের কবিও। বহু পরিচয় তার রয়েছে। কিন্তু তিনি শোষিত মানুষের কবি এই প্রভাব যেন তার বাকি সব পরিচয়কে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তার সাহিত্য জীবন হয়ত আরও বলিষ্ঠ হয়েছিল নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা আর নিম্নবর্গের যাতনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পেরে। তবে শুধু তার ‘কলম’ শোষিত শ্রেণির ভাষা হোক তা চাননি, চেয়েছেন দলিত শ্রেণি নিজ অধিকার দাবি করুক, সোচ্চার হোক প্রান্তিকজন।

তথ্যসূত্র
১. আবদুল আজীজ আল আমান (সম্পাদিত); নজরুল রচনা সম্ভার, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮০।
২. আবদুল কাদির (সম্পাদিত); নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৬।
৩. শেখ মকবুল ইসলাম, নজরুল: নানা মাত্রা, বর্ষা প্রকাশনী, ২০১২।
৪. Gayatri Chakravarty Spivak, Can the Subaltern speak?, reprinted with abridgemens in Williams and Chrismad (eds.) Colonial Discourse and Post-colonial Theory, Harvester Wheatsheaf, London, 1983.