লেখক যখন অদৃশ্য

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২০ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৭

লেখক যখন অদৃশ্য

খন্দকার মাহমুদুল হাসান ১২:২৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০

print
লেখক যখন অদৃশ্য

ছাপাখানার ভূত বলে একটা কথা চালু আছে। এই ভূত ছাপাখানায় বাস করে এবং শুদ্ধ বানানকে অশুদ্ধ করে দেয়। তাহলে ভুতুড়ে লেখকের কাজ কী? তার লেখায়ও কি উল্টোপাল্টা কিছু থাকে? আর কারাই বা ভুতুড়ে লেখক? ভুতুড়ে লেখক কথাটা অবশ্য তেমন প্রচলিত নয়, যতটা প্রচলিত ‘ঘোস্ট রাইটার’ কথাটা। ভূত আছে কি নেই সেই তর্কে না গিয়েও বলা যায়, ভূতের গল্প মানবসমাজে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। সেসব গল্পজুড়ে আছে ভূতদের কা--কারখানা। সেসব কাজ-কারবার তারা চালায় লোকসমক্ষে না এসেই। কাজ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যে কাজ করছে তার টিকিটিও নজরে আসছে না। লোকে তখন ধরেই নেয়, এই কাজ আড়ালে থেকে করে দিয়েছে ভূত।

স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি যেহেতু হয় না, তাই যেকোনো কাজ নজরে এলেই খোঁজ নেওয়া শুরু হতে পারে, কে করেছে সেই কাজ। প্রতিটি লেখাই লেখকের সৃষ্টি। কিন্তু যে লেখায় কোনো লেখকের নাম থাকে না অথবা প্রকৃত লেখকের নাম অনুপস্থিত থাকে সেই লেখা কে লিখে দেয় তা নিয়ে মাথা ঘামাতে ঘামাতেই মযড়ংঃ ৎিরঃবৎ কথাটা এসেছে। তার মানে, যে লেখায় প্রকৃত লেখকের নাম অনুপস্থিত থাকে সেই লেখা ঘোস্ট রাইটার লিখেছেন বলে ধরে নেওয়া হয়। অদৃশ্য লেখকও বলা যায়।

এখন কথা হলো, কেন প্রকৃত লেখক নিজেকে লুকিয়ে রাখেন (যদি তার সম্মতিতে এই কাজ হয়ে থাকে) কিংবা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হন? কোথায় কোথায় এই কাজ হতে পারে? কতকাল থেকে চলছে? লেখাটা লেখকের সন্তানের মতো। কোনো মা অথবা বাবা নিজের সন্তানকে যেমন পরিচয় মুছে দিয়ে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারেন না, তেমনি একজন লেখকও পারেন না মেধাজাত সন্তান বা ‘ব্রেইন চাইল্ড’কে স্থায়ীভাবে অন্যের হাতে সমর্পণ করে তা থেকে নিজেকে নাম-নিশানাহীন করে ফেলতে। তারপরও এই ঘটনা ঘটে। কেন ঘটে, কোথায় কোথায় ঘটে?

যেখানে লেখার ব্যাপার আছে সেখানেই এ ঘটনা ঘটতে পারে। গল্প, কবিতা, নাটক, গান, এমনকি চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রেও তা ঘটতে পারে। চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তা ঘটা সম্ভব। বই বা প্রবন্ধের কথা বলতে গেলে ফিকশন, নন ফিকশন, ধর্মীয়, পাঠ-সহায়ক যেকোনো ধরনের বই বা রচনার ক্ষেত্রেই ঘোস্ট রাইটিং হতে পারে। ইদানীং ওয়েবসাইটে এবং ব্লগের ক্ষেত্রেও ঘোস্ট রাইটারদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কখনো কখনো গোস্ট রাইটারদের পরোক্ষ স্বীকৃতি মেলে এবং তা প্রধানত নন ফিকশনের ক্ষেত্রেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘোস্ট রাইটারের নামও যুক্ত হয় সহযোগী লেখক বা গবেষক, কিংবা গবেষণা সহযোগী হিসেবে। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে সহযোগী গবেষক বা গবেষণা সহযোগীর আড়ালে অবস্থান নেন ঘোস্ট রাইটার।

অনেক প্রথিতযশা লেখক বা শিক্ষক তাদের অনুগ্রহভাজন কাউকে দিয়ে বই লিখিয়ে নিজের নামের নিচে তার নামটাও যুক্ত করে দেন। সহযোগী লেখকই এক্ষেত্রে আসলে লেখক। যার নাম ওপরে বড় করে লেখা থাকে তিনি এ বইয়ের কোনো লেখকই নন। ঘোস্ট রাইটিং প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত ন্যান্সি ডিউ রহস্য সিরিজের কথা উল্লেখ করা যায়। এই সিরিজটির লেখক হিসেবে সেই ১৯৩০ সাল থেকে ঈধৎড়ষুহ কববহব- এর নাম ছাপা হয়ে আসছে। (সূত্র : মাহফুজ রহমান, ভূত-লেখক, কিশোর আলো, ঢাকা, মে-২০১৪)। যে কেউ বুঝবে এতকাল ধরে তো আর একজন মানুষ লিখে যেতে পারেন না। প্রকৃত ঘটনা হল এর আসল লেখকের সংখ্যা অনেক এবং তাদের কেউই ক্যারোলিন কিন নন। অন্য কথায়, ক্যারোলিন কিন নামের কোনো লেখক কখনো ছিলেন না। অভাবে স্বভাব নষ্ট বলে একটা কথা আছে। অভাবি প্রতিভাবানদের কাছ থেকে টাকার লোভ দেখিয়ে পা-ুলিপি নিয়ে, অথবা দেখতে নিয়ে অনুমতি ছাড়াই নিজ নামে তা ছেপে ফেলার ঘটনা বিরল নয়। চলচ্চিত্রের কাহিনীকারের নাম বদলের ঘটনা এভাবে ঘটার কথা জানা যায়। যশশিকারি অর্থবানদের কেউ কেউ রাতারাতি লেখক বনে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন ঘোস্ট রাইটারের ওপর ভর করে।

মুনাফালোভী প্রতিভাহীন ধনীদের কেউ কেউ এ পথে এগিয়েছেন। কোনো কোনো সিরিজের বইয়ে এক বিশেষ লেখকের নাম ছাপা হলেও বইগুলোর প্রকৃত লেখক একাধিক হওয়ার ঘটনা আছে। এক্ষেত্রে একেক বইয়ের লেখার স্বাদ একেক রকম হতে পারে। তবে বুঝলাম পাঠকের কাছে ফাঁস হয়ে যায় গোমর। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, সবসময় প্রতিভাহীনরাই ঘোস্ট রাইটার জোগাড় করে তার ওপর ভর করেন না।

প্রতিভাবান ব্যক্তি বা লেখকও অধিক খ্যাতি ও বিত্তের লোভে ঘোস্ট রাইটারদের নিয়োগ করেন। নিজের ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে যেসব বই তিনি লিখে উঠতে পারছেন না সেসব বই লিখিয়ে নেন তাদের দিয়ে। প্রকাশক বেশি লাভের লোভে বিখ্যাতজনদের নাম লেখক হিসেবে ব্যবহার করে ঘোস্ট রাইটারদের দিয়ে বই লিখিয়ে নেন। আবার অনেকসময়ই ঘোস্ট রাইটার বেশ টাকাপয়সা পান। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী হিলারি ক্লিন্টনের মেমোরিজ লেখার জন্যে ঘোস্ট রাইটারকে পাঁচ লাখ ডলার দেওয়া হয়েছিল।

পাশ্চাত্যে ঘোস্ট রাইটিংয়ের জন্য কোম্পানি পর্যন্ত আছে। এর উদাহরণ- ম্যানহাটন লাইব্রেরি। যা হোক, ঘোস্ট রাইটার নিজে মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন। আবার অন্যের লেখা নিজের বলে চালিয়ে দিতে পারেন। এছাড়া অন্যের সাহিত্যকর্মের ছায়া অবলম্বনে লিখতে পারেন। মূল লেখকের স্বীকৃতি না দিয়ে যেকোনো ধরনেই অন্যের লেখা প্রকাশ অনৈতিক। যে লেখক নিজেই প্রকাশক তার নৈতিক স্খলন ঘটলে এমন ব্যাপার ঘটার বেশি সুযোগ থাকে। তবে একক বা সিরিজ বইয়ের ক্ষেত্রে বহু পরেও যদি ঘোস্ট রাইটিংয়ের বিষয়টা ফাঁস হয়ে যায়, তখন কৃতিত্ব প্রদানের প্রশ্নে একথা মনে রাখা দরকার, বিশেষ কোনো সৃষ্টির ক্ষেত্রে মূল ধারণার উদ্ভাবন করেছিলেন।

সিরিজের কিছু বইয়ের লেখক অন্য কেউ হলেও ধারণার উদ্ভাবককে সাফল্যের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করা যায় না। অবশ্য দুই পক্ষই নৈতিকতার মানদ-ে স্খলিত বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য। দুই পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগে ও সম্মতিতে যা ঘটে তার দায় কোনো একটি বিশেষ পক্ষের নয়। প্রথম পক্ষের প্রস্তাবে দ্বিতীয় পক্ষের অসম্মতি থাকলে এই কর্মযজ্ঞ সম্ভব হয় না। কথিত আছে, অবাঞ্ছিত (১৯৫০) উপন্যাসের (পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রায়িত) লেখক আকবর হোসেন উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য যখন কোনো প্রকাশক পাচ্ছিলেন না, তখন কেউ কেউ তাকে দাবি ত্যাগ করে কিছু টাকা নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি গ্রহণ করেননি। তার লেখা দেরিতে ছাপা হয়েছে, কিন্তু মৌলিক সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে আমাদের সাহিত্যে তার আসন স্থায়ী হয়েছে।

সম্পাদনা করে ছাপা হওয়া লেখার ক্ষেত্রে, এমনকি বইয়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাও ঘটে, লেখাটার আদিরূপ আর থাকে না। কখনো কখনো সম্পূর্ণ আলাদা লেখায় পরিণত হয়। কিন্তু ছাপা হয় সেই লেখকের নামে, যিনি লেখাটা পাঠিয়েছেন। এ অবস্থায় সম্পাদনা যিনি বা যারা করেছেন তারাই ঘোস্ট রাইটারের ভূমিকা পালন করেন।

বহুকাল আগে থেকেই পৃথিবীতে অদৃশ্য লেখক বা ঘোস্ট রাইটার ও ঘোস্ট রাইটিং আছে। অতীতকালে রাজা-বাদশারা এবং আধুনিককালে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কেউ কেউ ঘোস্ট রাইটিংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। সে কারণেই বিষয়টি একটি প্রকাশিত গোপনীয়তা।