বাটোয়ারা

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩ আশ্বিন ১৪২৭

বাটোয়ারা

গোলাম মোর্তুজা ২:৪৮ অপরাহ্ণ, জুন ০৫, ২০২০

print
বাটোয়ারা

তিন-তিনটি বৌয়ের মালিক আজিজুল হক ওরফে ইংরেজ। আজিজুল হক নামে তাকে কেউ না চিনলেও আশপাশের দু’পাঁচ গ্রামে ইংরেজ নামে তাকে কেউ চেনে না তা বলা যাবে না। প্রথম বউ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল বিয়ের বিশ বছরের মাথায়। দি¦তীয় বউ মৌ বিয়ের পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুনিয়াদারির বন্ধন ছিন্ন করে চলে গেল পরপারে। সংসার সচল রাখার মানসে অগত্যা তৃতীয় বউয়ের মুখ দেখা।

এক বিঘা ধানি জমি। পাঁচ কাঠা ভিটা। এক বিঘার আলিশান আমবাগানসহ টাকার মালিক ইংরেজ। তৃতীয় বৌ রেবেকা ইংরেজের এমন গল্প ঘটকের কাছে শুনে লোভের খিড়কি খুলে ‘বিয়ে করলে অনেক কিছুই হাতিয়ে নেওয়া যাবে’ বিশ্বাসে গলায় মালা পরিয়েছে। সেই থেকে রেবেকা ও ইংরেজের সংসারে লুটোপুটি চলে। বিয়ের প্রথম রাতেই রেবেকা স্বামীকে পানিপড়া খাইয়ে দিয়েছে। করিম চাচার পানিপড়া কোনোকালে হয়নি বিফল। স্বামী বশীকরণ পানিপড়াতে এক জাদু আছে বটে। না হলে স্বামীকে পানি পান করানোর সময় কেন ইংরেজ হেঁচকি তুলল। পানিতেই কাজ হচ্ছে জেনে রেবেকার মনে এক দুর্দমনীয় আনন্দ আবেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। উড়ো মেঘের মতো ইংরেজের মাথায় জুড়ে বসে। বলে, ‘হামায় কী কী দেবেন? বলেন কী দেবেন হামায়?’ রেবেকার কথার বৃষ্টির ঝাপটায় ইংরেজের মন বৃষ্টিময় হয়ে যায়। ইংরেজ যেন রেবেকার কথার অ্যাকুরিয়ামের মধ্যে নড়াচড়া করছে বটে কিন্তু কিছু ঠাহর করতে পারছে না।

বলে, ‘কী বল! কী দেব তোমহায়! দ্যানমোহরের হঞ্চাশ হাজার ট্যাহা আজি লিবে নাহি? বাড়িভিটা তো হামার প্রথম পকখের ছাওয়ালদের। মাঠের জমি দ্বিতীয় পকখের। তোম্হারে বাহিরে কিইনা দিমু।’ ইংরেজের কথায় রেবেকা গলল, কিন্তু জমল না। সে রাতে ঘরের আলো নিভল, কোনো উড়ো খুচরো বাতাসে নয়, ইংরেজই বন্ধ করল। রাতে ঘরের আঙিনায় জোনাকিরা জ্বলছিল ল্যাজে ছোট বাল্ব জে¦লে।

দুজনের বয়সের পার্থক্য প্রায় পনের থেকে বিশ বছর। তাতে কোনো যায় আসে না রেবেকার। সে এর আগেও এক স্বামীকে পেছনে ফেলে এসেছে। ও পক্ষে তিন-তিনটি আস্ত ধাড়ি সন্তান রয়েছে। স্বামী নাকি নেশাগ্রস্ত ছিল।

প্রথম স্বামীর স্মৃতি এবং সন্তানগুলোর আলাপন মাঝে-মাঝে সজারুর গায়ের কাঁটা হয়ে বুকে বেঁধে। তাতে কীইবা তার করার আছে। যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ। রেবেকার মনে বিদ্যুৎ খেলে যায়, ইংরেজের কাছে থেকে জমি-জিরাত, ভিটা কিংবা টাকা হাতিয়ে নিতে হবে। প্রতি রাতে স্ত্রী রেবেকার ঘ্যানঘ্যানানিতে ইংরেজ অতিষ্ঠ। কিছু দিতেই হবে রেবেকাকে। ইংরেজের মুখে পাকা দাড়ি।

সমাজের মানুষ নতুন বউকে নিয়ে মুখরোচক চটকা কথা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে চুপিচুপি বলে। ইংরেজ বউকে শান্ত করবার ফন্দি আঁটলেন।

একদিন রাতে মুখ দিয়ে ফড়ফড়িয়ে বের হয়, ‘কাল থেইকা তোমহার বাড়ির বাইরোত বাহির হওনের দরহার নাই।’ ইংরেজের কথা রেবেকার তেঁতুলের মতো লাগে। তবুও নিশ্চুপ। যা অনাস্থা করবে তা ওর মনেই আছে। নিয়মের চক্রজালে রেবেকাকে ধরে রাখা যাবে না, যায় না। দূরাগত ট্রেনের হুইসেঁলের মতো রেবেকার স্বপ্নীল সৌরভ ভাসে মনে। ভাসায় নিজেকে। শোনা যায় বাইরে ঘোরার সময় রেবেকার সঙ্গে পরপুরুষ থাকে।

ইংরেজ দমবন্ধ কাজে ব্যস্ত। মরণ আসছে ধেয়ে তাই জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসছে নিমেষেই। ইংরেজের মনে নেই স্থিরতা। রাক্ষসী মৃত্যুচিন্তা বাঘের ছোবলের মাঝে ফেলে দিয়েছে। হাতে উঠেছে তসবিহ। মাথা থেকে টুপি সরে না। স্ত্রী রেবেকা আশ্চর্যের বৈঠা হাতে দাঁড়ায়। বলে, ‘হামারে কই কিচু তো দিলেন না। হামি কী আশাতোত থাকমু।’ স্ত্রী রেবেকার কথা যেন বড়শী হয়ে বুকে লাগে। সেদিন ইংরেজ রেবেকার কথার জবাব দেয় না। এভাবে দিন যায়। দিনটি ছিল বৈশাখের পাঁচ তারিখ। কিন্তু মনে হয় বর্ষার কোনো সময় গুঁজে দেওয়া হয়েছে এ বৈশাখের ভেতরে। রোদের ফাঁক গলে বৃষ্টি হয়। রাতে রেবেকা খাবার পর্বে গিয়ে মুখে মুচকি হাসির আলতো ভাব নিয়ে বলল, ‘হুনছেন, হামার বাপের বাড়ির কাছে দু’কাঠা জমি বিকরি হবে। মাত্রো পঁচিশ হাজার ট্যাহা কাঠা। হেইডা কিইনা দিবেন?’

ইংরেজের প্রথম ও দ্বিতীয় পরিবারে কেউই এ বাড়িতে থাকে না। আবার কেউ সব নিতেও আসেনি। তাই বলে কেউ কিছু নেবে না তা নয়। বহুবার ছেলেরা এসে সব চাইলেও ইংরেজ পাহাড়ের মতো অচল-অটল ছিল। কিন্তু আজ রেবেকার কথায় সায় দিল। জীবন যাপিত ক্যানভাস আঁকতে ইংরেজ আজ ব্যাকুল।