প্রতিদ্বন্দ্বী

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

প্রতিদ্বন্দ্বী

বিশ্বজিৎ দাস ৭:৩৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২০

print
প্রতিদ্বন্দ্বী

খুব ভোরেই বাসা থেকে বের হয় লক্ষ্মী।
হাতে বাজারের ব্যাগ।
তার আগে জমিয়ে রাখা টাকা থেকে দু’শ টাকা বের করে নেয়। তারপর বাকি টাকা লুকিয়ে রাখে স্বামী আর ছেলের ভয়ে। ওরা দেখতে পেলে হাত পাতবেই।
বিভিন্ন বাসায় হাত পেতে পেতে এই টাকাগুলো সঞ্চয় করেছে লক্ষ্মী।
কখনো বোনের বিয়ে।
কখনো মেয়ের বিয়ে।
কখনো মায়ের শ্রাদ্ধ।

ভিক্ষা চাইলে মানুষ এখন ভিক্ষা দিতে চায় না। বলে, সরকার তো ভিক্ষুকদের জন্য অনেক কিছু করছে। তুমি ডিসি অফিসে যাও।
বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদির কথা বললে মানুষ কিছু টাকা পয়সা দেয়।
ভিক্ষার চেয়ে বেশিই দেয়।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লক্ষ্মী।
বাবা-মা শখ করে নাম রেখেছিল লক্ষ্মী।
বাবা ছিল রাজমিস্ত্রি। ওর জন্মের পর হয়েছিল হেডমিস্ত্রি। টাকা আসতে শুরু করেছিল ঘরে। মেয়ে আমার সত্যি লক্ষ্মীÑ বলত বাবা।
আর এখন!
অসুস্থ স্বামী আর কিশোর ছেলেকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসারের ঘানি টানছে ও।
চাল বিক্রির জায়গায় পৌঁছে লক্ষ্মী দেখলÑ একের পর এক ব্যাগ রেখে সবাই লাইন করে রেখেছে। ওর আগেই চলে এসেছে দশ বারো জন খদ্দের। কমমূল্যে চাল বিক্রি হয় এখানে।
একটা ব্যাগ দেখে মনে মনে ফুঁসে উঠল লক্ষ্মী।
কমলার ব্যাগ!
হারামজাদি আজকেও ওর আগে চলে এসেছে। ওর জীবনে বিষফোঁড়া কেউ হয়ে থাকলে সেটা হলো এই কমলা।
এক বাসায় কাজ পেয়েছিল লক্ষ্মী। এই কমলা ঐ বাড়িওয়ালির কানে কানে কী যে বলেছিল, চাকরিটা আর হয়নি। সেই থেকে ওকে দু’চোখে দেখতে পারে না লক্ষ্মী।
এদিন ওদিক তাকাল ও। যারা ব্যাগ রেখেছে তারা দূরে বসে গল্প করছে। কমলাও আছে সেখানে।
লক্ষ্মী তার ব্যাগ সরিয়ে নিজেরটা রেখে দিল। কমলার ব্যাগ রাখল সবার পেছনে।
চালের দোকান খুলল আরো ঘণ্টাখানেক পরে। অমনি লাইনে দাঁড়িয়ে গেল সবাই। এক লাইনে পুরুষ, আর অন্য লাইনে মহিলা।
‘তুই আমার ব্যাগ সরাইছিস?’ সরাসরি প্রশ্ন করল কমলা।
‘আমি কেন তোর ব্যাগ সরাব। আমি কি তোর ব্যাগ চিনি?’
‘ভালোয় ভালোয় জায়গা ছেড়ে পিছনে গিয়ে দাঁড়া, হারামজাদি।’
‘তোর ইচ্ছা হয়, তুই-ই পেছনে যা হারামজাদি।’
‘তবে রে।’ বলেই লক্ষ্মীর গায়ে ধাক্কা দিল কমলা।
লাইন থেকে ছিটকে পড়ল ও। দাঁতে দাঁত চাপল লক্ষ্মী। আজ এর একটা হেস্তনেস্ত করবেই।
ওর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে কমলা। ওর চুল ধরে লাইন থেকে বের করে দিল, ‘বের হ, হারামজাদি।’
বেঁধে গেল দুজনের মধ্যে হাতাহাতি। ধুলোয় গড়াগড়ি। মুখে গালিগালাজ। চড় থাপ্পড়।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা নির্বিকার।
কেউ কেউ বলল, ‘এরা যে কী! চাল কিনতে এসেও ঝগড়া করে।’
পুরুষদের লাইন ছেড়ে কেউ বের হল না। একজন বলল, ‘এদের না তেল ধরছে! তেল!’
একটা গাড়ি এসে থামল। নেমে এল বুট পরিহিত ইউনিফর্মধারী একজন। কর্কশ কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘এখানে কী হচ্ছে?’
হাতাহাতি থেমে গেল। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল দুজনেই। সুড়সুড় করে লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল লক্ষ্মী আর কমলা।
‘কিছু হয় নাই স্যার। আমরা তো বন্ধু। গল্প করছিলাম।’
কেউ কেউ হেসে উঠল।
‘নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ান সবাই।’ পোশাকধারী অর্ডার করল।
সরে যাওয়ার আগে কমলা চাপাস্বরে বলল, ‘এরপর লাগতে আসিস মাগী, এমন ধোলাই দেব না বাপের নাম ভুলে যাবি।’
‘আচ্ছা।’ হাসিমুখেই বলল লক্ষ্মী।
আপাতত ও খুশি। আজকে কমলা তো আর ওর আগে চাল নিতে পারবে না।
তাই বা কম কীসের!