মধ‍্যবিত্ত ও সুপারম‍্যান

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মধ‍্যবিত্ত ও সুপারম‍্যান

আল শাহরিয়ার ওছমান ৩:৩০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২০

print
মধ‍্যবিত্ত ও সুপারম‍্যান

নাম তার আকাশ, মনটাও ঠিক আকাশের মতো বিশাল। কখনো সে থেমে থাকে না। যখনি সে দেখে কোনো দুঃখী মানুষ। উড়ন্ত বেগে ছুটতে ছুটতে চলে যায় সে, অপরদিকে দুঃখী মানুষটিও তাকে পেয়ে হরহামেশায় চোখের জল ফেলে দেয়। তখন যেনো ঠিক আকাশের মনটা অতৃপ্ত এক আনন্দ অনুভূতিতে ভরে যায়।

আকাশ মধ‍্যবিত্ত পরিবারের এক পরিশ্রমী ছেলে। দুই বছর হলো তার বাবা প‍্যারালাইজড হয়ে বাসাতেই আছে এখন। এক সময় তার বাবা এক প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করতো এখন আর নেই। দুই ভাইয়ের মধ্যে আকাশ বড়ো তাই পরিবারের দায়িত্বটা তার উপরেই বর্তায়। ছোট ভাই স্কুলে যায় বয়স দশ বছরের মতোই হবে তার দায়িত্বটাও আকাশের উপরে।

আজ আকাশের মনটাও যে ভালো নেই। আকাশের বুকে জমেছে অনেক মেঘ। চুপিসারে বসে বসে কি যেনো ভাবছে। মনে হয় এখনি বারিধারা শুরু হয়ে যাবে। টং দোকানের সামনে এক কোনায় খুব জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে। মনে হয় অনেক দিন অভুক্ত কিছুই খায়নি। চোখের কোনের সিক্ত জলগুলো টপটপ করে পড়ছে।

এদিকে দেশে মহামারি দেখা দিয়েছে। যার কারণে পুরো দেশ লকডাউন। সকল অফিস আদালত সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব বন্ধ । সরকার মানুষকে ঘরে থাকতে বলছে বাহিরে দেখলেই শাস্তি দিচ্ছে অথবা বুঝিয়ে বাসায় পাঠাচ্ছে।

এমনসময় হঠাৎ টং দোকানের সামনে পুলিশের গাড়ির শব্দ। গাড়ি থেকে একজন পুলিশ অফিসার নামলো। নেমেই হনহন করে হেটে আকাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। পুলিশ অফিসারকে দেখে আকাশও দাঁড়িয়ে গেলো। অফিসার আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো কি ব‍্যাপার আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো আর আপনার চোখে পানি কেনো? আপনি জানেন না সরকার সবাইকে ঘরে থাকতে বলছে আর আপনি আছেন বাহিরে! কি হয়েছে আপনার বলেন তো।

আকাশ অঝোরে চোখের পানি ফেলতে শুরু করলো আর বলতে লাগলো স‍্যার আজকে দুইদিন না খেয়ে আছি বাড়িতে অসুস্থ বাবার ঔষধ পযর্ন্ত কিনতে পারছি না। পায়ের নীচে মাটি নেই স‍্যার! কি করবো কিছুই বুঝছি না। তাই এখানে এসে বসে আছি। অফিসার আকাশকে বললো কোনো ত্রাণ পাননি? আকাশ তখন বললো, স‍্যার আমি যাত্রাবাড়ীতে এক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে জব করতাম। এই লকডাউনের কারণে আমার জব চলে গেছে। ম‍্যানেজার কিছু টাকা দিছিলো ওইটা দিয়ে কিছুদিন চলছিলো। আজকে আমার কাছে একটা টাকা নেই স‍্যার। আমি খুব টেনশনে আছি স‍্যার! আমার বাবার ঔষধ কিনবো কিভাবে। এই কথা বলে আকাশ হুহু করে আরো জোরে কেঁদে উঠলো।

আকাশ আরো বললো, স‍্যার জানেন সবাই খালি ত্রাণ রাস্তায় দেয় তাই হাতও পাততে পারি না। জানেন স‍্যার আমি সব সময় অসহায় মানুষের পাশে ছিলাম আজ আমি নিজেই খুব অসহায় হয়ে গেছি।

আকাশের কথাগুলো শুনে পুলিশ অফিসারের চোখে পানি চলে আসলো। অফিসার আকাশকে বললো আমি পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছি এটা আপনি রাখেন আপনার কিছুদিন চলে যাবে। আকাশ টাকাটা হাতে পেয়ে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো বলতে লাগলো স‍্যার আপনি আমাকে বাঁচালেন আমি আপনার এই ঋন শোধ করে দিবো আপনার নাম্বারটা দেন। স‍্যার আমার এক সময় অনেক ভালো সময় আসবে। স‍্যার আপনার নাম্বারটা দেন স‍্যার। অফিসার তখন আকাশকে বললো আপনি এগুলো এখন আমাকে দেওয়া লাগবে না। যখন আপনিও এমন কাউকে দেখবেন বিপদে পড়েছে এগুলো দান করে দিবেন।

আকাশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অফিসার আকাশকে বললো এখন বাড়িতে যান বাহিরে বেশিক্ষণ ঘুরাঘুরি করবেন না। দেশের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। আকাশ বললো, ওকে স‍্যার ভালো থাকবেন।

পরিশেষে দেশে আজ খুব ক্রান্তিকাল সময় যাচ্ছে। এমন হাজারো আকাশ আছে যারা অগোচরে চোখের পানি ফেলে যাচ্ছে আড়ালে থেকে। পরিবারের মুখে আহার না দিতে পেরে কষ্টে নিজেকে কুকড়ে কুকড়ে খাচ্ছে। এরা কখনো হাত পাতে না। কারণ এদের আত্মসম্মানবোধ আছে অনেক। তাই এরা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কখনো ঘরের মেঝেতে কখনো টং এর দোকানের এক কোনে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। অপরদিকে পুলিশ অফিসারদের মতো কিছু সুপারম‍্যান থাকে সবসময় আকাশদের পাশে থাকে ছুটে থাকে শহরের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মানুষের জন‍্যে। ভালো থাকুক এসব সুপারম‍্যান ভালো থাকুক আকাশরা।