ব্যথা

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ব্যথা

আবুল কালাম আজাদ ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২০

print
ব্যথা

লেবু ভাইকে রিকশা করে আসতে দেখে আমরা চায়ের কাপ ফেলে দৌড়ে গিয়ে রিকশা আটকালাম। তাকে কেমন কাহিল মনে হচ্ছিল। কেমন কোঁকাচ্ছিল।

আমি বললাম- লেবু ভাই, আপনার তো কোনো খোঁজ-খবরই নাই। কই থাকেন? এখন কোথায় যাচ্ছেন?

: ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।

: ডাক্তারের কাছে কেন? সমস্যা কী?

: ক’দিন ধরে কাঁধের বাম পাশটায় ভীষণ ব্যথা। নড়াচড়া করতে পারি না ঠিকমতো।

: বলেন কী! কিচ্ছু জানি না। একটা ফোনও তো দিলেন না।

: তোদের জানিয়ে লাভ কী? তোরা কি ডাক্তার?

: এটা কোনো কথা বললেন? আমরা এলাকার ছোট ভাই, আপনি আমাদের বড় ভাই.....।

আমরা লেবু ভাইকে রিকশা থেকে নামিয়ে চায়ের দোকানে নিয়ে বসালাম। লেবু ভাই কাতর হয়ে বলল, আমি ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। তোরা আমাকে এখানে এনে বসালি যে?

চান্দু বলল, বসেন, লাল চা খান। ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট বাদ।

: বাদ মানে? আমি ব্যথায় নড়তে পারছি না।

: কখনো কখনো শরীরে এরকম বিষ-ব্যথা হতে পারে। এজন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়? শোনেন, একটা তোয়ালে ভাঁজ করে চুলার ওপর দিয়ে গরম করবেন। তারপর দেবেন ছ্যাঁকা। দিনে তিন-চারবার এরকম ছ্যাঁকা নিলে দুই দিনেই ব্যথা শেষ।

: বলিস কী!

: যদি উপকার না পান তো আমার নাম চাঁন মিয়া না। আমাকে চান্দু চোরা বলে ডাকবেন।

নওশের বলল, ধ্যাত্তেরি! শোনেন লেবু ভাই... ।

: শুনতেছি, বল।

: চুলায় একটা কাঁসার বাটিতে খাঁটি সর্ষের তেল গরম করবেন। তেলের মধ্যে এক কোয়া রসুন ছেড়ে দিলে আরও ভলো হয়। সেই গরম তেল মালিশ করবেন। দিনে দুইবার। ব্যথা তো থাকবেই না, শরীর ঝরঝরে হয়ে যাবে।

সমশের উঠে গিয়ে ঠেলেঠুলে লেবু ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসল। বলল, অত ঝামেলা করার কোনো মানে নেই। জাস্ট একটু মেসেজ হলেই হবে। ভাবিকে বলবেন সকাল-বিকাল দুইবার খুব ভালো করে ব্যথার জায়গাটা মেসেজ করে দিতে। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

লেবু ভাই বড় চোখ করে তাকালো সমশেরের দিকে। বলল, তুই ভাবি পেলি কই? আমি কি বিয়ে করেছি?

: ওহ! সরি, মনে ছিল না। সমশের মন খারাপ করে এসে আগের জায়গায় বসল।

মারুফ বলল, আমি ব্যথা সারানোর খুব সহজ একটা পদ্ধতি জানি। যদি শুনতে চান তো বলব।

লেবু ভাই বলল, সবাই যখন বলছে, তুই বাকি থাকবি কেন?

: নিমের পাতা পাটায় বেটে পেস্ট লাগালে ব্যথা চলে যাবে। সঙ্গে যদি গরম পানিতে নিমের পাতা চুবিয়ে গোসল দেন ডবল উপকার।

: আশপাশে কোথাও নিমগাছ আছে বলে জানি না।

: মলিদের বাড়ির সামনে একটা গাছ আছে। চাইলে এনে দিতে পারি।

: আচ্ছা, কাল নিয়ে আসিস।

মলি হলো মারুফের ভালোবাসা। একতরফা ভালোবাসা। মলির দুইটা গুণ্ডা ভাই থাকার কারণে মারুফ তাকে প্রপোজ করতে সাহস পাচ্ছে না। মলিদের বাসার আশেপাশে প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছে। কিন্তু বলতে পারেনি কিছু। সুযোগ পেলেই আমাদের নিয়ে মলিদের বাসার সামনের চায়ের দোকানে যেত। একদিন মলির বড় ভাই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কড়া থ্রেট করে। আমরা আর যাই না। মারুফও একাকী যেতে সাহস পায় না।

দুই.

পরদিন মারুফের আর দেখা নাই। এদিকে লেবু ভাই নিম পাতার জন্য বসে আছে। নিমপাতা বাটা পেস্ট লাগাবে। তারপর গরম পানিতে নিমপাতা চুবিয়ে একটা গোসল দেবে। মারুফকে কল দিলাম। সে কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, খুব বিপদে আছি।

মারুফের শরীরেও ব্যাথা ধরল নাকি? বললাম, কী বিপদ? ওমন কোঁকাচ্ছিস কেন?

: সারা শরীর ব্যথা।

: কীভাবে ব্যথা হল?

: মলির বেডরুমের সামনে নিমগাছে উঠেছিলাম নিমপাতা নিতে। মলির ভাই দেখে ফেলে। ওরা মনে করে, আমি জানালা দিয়ে মলিকে দেখার জন্য নিমগাছে উঠেছি। আমাকে ধরে পিলারের সাথে বেঁধে রেখেছে।

: বলিস কী!

আমরা লেবু ভাইকে নিয়ে গেলাম মারুফকে ছাড়াতে।

 গিয়ে দেখি সত্যিই অবস্থা খারাপ। গ্যারেজের একটা পিলারের সাথে নাইলনের দড়ি দিয়ে মারুফকে বেঁধে রেখেছে। পাশে দাঁড়িয়ে হম্বিতম্বি করছে মলির দুই গুণ্ডা ভাই।

লেবু ভাই তাদের বোঝাতে সক্ষম হল, মারুফ মলিকে দেখার জন্য নিম গাছে উঠেনি। উঠেছিল নিমপাতা পাড়ার জন্য। লেবু ভাইয়ের ব্যথার ব্যাপারটাও বোঝানো হল।

মলির দুই গুণ্ডা ভাই রিকশা ভরে নিম গাছের ডাল দিয়ে আমাদের বিদায় করল। মারুফের ব্যথা লেবু ভাইয়ের চেয়েও বেশি। হাতে লাল দাগ বসে গেছে। লেবু ভাই বলল, খালি কি বেঁধেই রেখেছে, নাকি মারও দিয়েছে?

মারুফ বলল, না, মার দেয় নাই। ভাগ্যিস আপনারা গিয়েছিলেন। না হলে...।

: শিক্ষা নে। তুই মলির কথা ভুলে যা।

: মলির কী দোষ? ওর গুণ্ডা ভাই দুটোই তো...। লেবু ভাই, ভাবিকে বলবেন বেশি করে পেস্ট বানাতে। আমিও লাগাব।

লেবু ভাই হুঙ্কার ছেড়ে বলল, ভাবি কই পাস তোরা? আমি কি বিয়ে করেছি?

: মনে থাকে না। আপনার বিয়ের বয়স তো যায় যায়। বিয়ে করেন না কেন? আমরা একটা ভাবি পাই।

: তুই ভালোবেসেই গরুর মতো বাঁধা থাকিস, বিয়ে করলে কী হবে একবার ভেবে দেখ।

: লেবু ভাই, চলেন ডাক্তারের কাছে যাই। মনে হচ্ছে, হাত অবস হয়ে যাবে। এইসব পেস্টে কিছু হবে না।

লেবু ভাই আর মারুফ একটা সিএনজি ডেকে ডাক্তারের কাছে চলে গেল। চান্দুটা হা হা- হো হো করে পাগলের মত হাসতে লাগল। হাসির কী ছিল বুঝলাম না।