‘ছাপা বইয়ের পাঠক কমা নিয়ে শঙ্কিত নই’

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

‘ছাপা বইয়ের পাঠক কমা নিয়ে শঙ্কিত নই’

মাহমুদ কামাল, সম্পাদক, অরণি ৯:৩৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২০

print
‘ছাপা বইয়ের পাঠক কমা নিয়ে শঙ্কিত নই’

লিটল ম্যাগাজিনকে বলা হয় লেখক সৃষ্টির আঁতুড়ঘর। নবীন লেখকদের অধিকাংশ হাত পাকান এখানে লিখে। সারা দেশে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উদ্যোগে প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য লিটলম্যাগ। লিটলম্যাগচর্চার নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত ‘অরণি’ সম্পাদক মাহমুদ কামাল। সঙ্গে ছিলেন শফিক হাসান

আপনার সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন অরণির প্রথম সংখ্যা কখন প্রকাশিত হয়?
অরণির প্রথম সংখ্যাটি বেরিয়েছে ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সম্পাদক ছিলেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ। আমি এবং এখন ‘না লিখিয়ে’ কবি শফিকুল হাসান ছিলাম সহ-সম্পাদক। দুই ফর্মার কাগজটি নিস্তরঙ্গ শহরে ঢেউ তুলেছিল এর আঙ্গিক এবং নতুনধারার টাটকা কবিতার জন্য। ঐ সংখ্যার প্রায় সকল কবি প্রতিষ্ঠিত। প্রথম সংখ্যার পর বেশ কয়েক বছর অরণির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় জাহাঙ্গীর ফিরোজ ঢাকায় চলে যাওয়ার কারণে। এরপর ধারাবাহিক ৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। একটির সম্পাদক ছিলেন নীহার সরকার। ২০০২ সালে অরণির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অতিরিক্ত সচিব কবি ও কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে টাঙ্গাইলে যোগদান করেন। তার সম্পাদনায় অরণির নতুন যাত্রা শুরু হয়। তিনি পত্রিকাটির ৮ ও ৯ নম্বর সংখ্যাটি সম্পাদনা করেন। ১০ নম্বর সংখ্যা থেকে তিনি উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে যুক্ত থেকে পত্রিকা প্রকাশে প্রণোদনা জুগিয়ে যাচ্ছেন।

কোন লক্ষ্য থেকে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন?
’৭৬ সালে ছিলাম ঊনিশ বছরের তরুণ। তখন দৈনিক-সাপ্তাহিক বেরুত হাতেগোনা। মূলত নিজেদের লেখা ছাপানোর উদ্দেশ্যেই কাগজ বের করা। আমরা যে ধরনের কবিতা তখন লিখি তখনকার দৈনিকগুলোতে সেই লেখা ছাপা হওয়া দূরের কথা কখনো কখনো সম্মানিত সাহিত্য সম্পাদক উপদেশ দিতেন এবং বলে দিতেন ‘এইভাবে’ লিখবে। তো ‘সেইভাবে’ লিখতে পারতাম না বলেই নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশের তাড়না অনুভব করি। সম্পাদনায় তেমন কোনো অর্জন নেই। তারপরও একটু ফিরিস্তি দিইÑ অরণির বেশ কয়েকটি সংখ্যা বেরিয়েছে বিষয়ভিত্তিক। এর মধ্যে, গ্রন্থ আলোচনা সংখ্যা, গল্প সংখ্যা, গল্প প্রতিযোগিতা ও টাঙ্গাইল লেখক সংখ্যা অন্যতম। ষাটের কবি বুলবুল খান মাহবুব এবং সত্তরের কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজকে নিয়ে বের হয় অরণির দু’টো সংখ্যা। অনেকের মতে অরণির ১৬তম সংখ্যাটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ‘বাংলা কবিতার পঞ্চাশ বছর’ শিরোনামে ৮৮০ পৃষ্ঠার এই সংকলনে ১০১০ কবির কবিতা ছাপা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদশের গেল শতকের ষাট থেকে শুরু করে এই শতকের প্রথম শতক পর্যন্ত পাঁচ দশকের সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন দশজন সম্পাদক। এরা হলেন বাংলাদেশের মুহম্মদ নূরুল হুদা, মাহবুব হাসান, রহিমা আখতার কল্পনা, শামীমুল হক শামীম এবং মাসুদ হাসান। পশ্চিমবঙ্গ অংশের সম্পাদনা করেন উত্তম দাশ, শ্যামল কান্তি দাশ, রফিক উল ইসলাম, অংশুমান কর এবং অরুণ পাঠক। সমন্বয়ক ছিলাম আমি। অর্জন যদি বলেন, এটুকুই। 

স্বাধীনতা-উত্তর উল্লেখযোগ্য ম্যাগ কোনগুলো?
ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে বর্তমানে প্রচুর লিটলম্যাগ বের হচ্ছে। মুদ্রণ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার কারণে উপজেলা থেকেও দৃষ্টিনন্দন কাগজ বের হচ্ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী অনেক লিটলম্যাগ বেরিয়েছে, কয়টার নাম বলব! চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে- ঊষালোকে, টোঙ, লোক, অ্যালবাম, মাদুলি, পুনশ্চ, দূর্বা, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, কালধারা, ঋতপত্র, নোঙর, গল্পকথা, ভাস্কর, দোআঁশ, শালুক, অদ্রি, নিজকল্পা, দ্রষ্টব্য, নান্দীপাঠ, ঈক্ষণ, প্রকাশ, বেহুলা, মৃদঙ্গ, অপরাজিত, স্বতন্ত্র, ময়মনসিংহ জং, দ্বিতীয় চিন্তা, অদ্বৈত, দাগ, মরাল, লেখাবিল, দাহপত্র, অলক্ত, ড্যাফোডিল, কালের পাতা, দৃষ্টি, নবপ্রকাশ, ময়ূখ, ধমনি, উতঙ্ক, কথা, শব্দ, সবুজ স্বর্গ, চালচিত্র, অনুভূতি, আড্ডাপত্র, উলুখাগড়া, একবিংশ, নিসর্গ, পর্ব, এবং মানুষ, কবি, কালের ধ্বনি, খেয়া, কাশবন, কোরাস, চারবাক, গা-ীব, চিহ্ন, শাশ্বতিকী, হালখাতা, গোলাঘর, হাইফেন। যেভাবে মনে পড়েছে তালিকা সেভাবেই। আবার বাদও পড়ল অনেক।

লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা কতটুকু?
আগে মনে হতো লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা আছে। এখন মনে হয় লেখা সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা অপরিসীম।

সম্পাদনা করতে গিয়ে কী ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করছেন?
ভালো লেখা না পাওয়া যেমন সমস্যা তার চেয়ে বেশি ‘অনুরোধের আসর’ মোকাবেলা করা। আবার মতের বিরুদ্ধে গেলে কিংবা কোনও লেখা পরিমার্জন করলে লেখককে মানভঞ্জন করা এইসব প্রতিকূলতা অনেক ক্ষেত্রে পত্রিকা প্রকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

কী বৈশিষ্ট্যে লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রিকাকে আলাদা করবেন?
লিটল ম্যাগাজিন যেমন নতুন লিখিয়েদের জন্য বীজতলা পাশাপাশি নতুন চিন্তা চেতনারও একটি উপযুক্ত স্থান। বিষয় বৈচিত্র্য, আঙ্গিক, উপস্থাপনায় নতুনত্ব যা কখনো কখনো চমকে ওঠার মতো লিটলম্যাগ হবে এসবের বাহন। সাহিত্যপত্রিকার সঙ্গে লিটলম্যাগের পার্থক্য চিন্তার। ইদানীং লিটল ম্যাগাজিনের আক্ষরিক বাংলায়ন হয়েছে, ছোট কাগজ।

তাহলে বড় কাগজ বলতে কি দৈনিক ও সাপ্তাহিকীকে বোঝায়? আকারে ছোট, মুদ্রণ সংখ্যা সীমিত- লিটল ম্যাগাজিনের অর্থ কি তাই? ছোট কাগজে কি বড় মাপের সাহিত্য রচিত হচ্ছে না? সাহিত্যপত্রিকাগুলো কি আবর্জনা ছেপে যাচ্ছে? ধরা যাক ‘লোক’ একটি লিটল ম্যাগাজিন এবং ‘কালি ও কলম’ সাহিত্যপত্রিকা। ‘লোক’-এর চিন্তা ও প্রকাশ এবং ‘কালি ও কলমের’ চিন্তা ও প্রকাশ ভিন্ন কিন্তু পরিত্যাজ্য নয়। কাজেই দুটো পত্রিকার চারিত্র্য ভিন্ন কিন্তু বর্জনীয় নয়। প্রায় কাগজের সম্পাদকেরই নিজস্ব ভাবনাচিন্তা থাকে। থাকে চিন্তার বৈপরীত্যও।

অরণিতে কী ধরনের লেখা প্রাধান্য পায়? এর লেখক ও পাঠক কারা?
শুধু কবিতা নিয়ে অরণির প্রথম কয়েকটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। এরপর যোগ হয় গল্প ও প্রবন্ধ। মাঝে কয়েকটি বিষয় নিয়ে। বিষয়ভিত্তিক করতে গিয়ে লেখক সমস্যায় ভুগেছি। দেখা গেল একই লেখক প্রায় সংখ্যাতেই উপস্থিত। এই সমস্যা আবার পাঁচমিশালী। অরণির লেখক ও পাঠক নির্দিষ্ট নয়।

সম্পাদনা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? লিটলম্যাগচর্চার গুরুত্ব কতটুকু?
কবিতা থেকে ছন্দ প্রায় নির্বাসিত। জেনে কম, না জেনে অনেকেই ছন্দ বিমুখ। অরণির আগামী সংখ্যায় মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতা এবং ঐ বিষয় দুটোর ওপর প্রবন্ধ ছাপা হবে। ঘোষণা হয়েছে ছয় মাস আগে। নিকটজনদের ফোনও করেছি। দুঃখের বিষয় সাড়া পাচ্ছি খুবই কম। তবুও আমরা হতাশ নই। বিদ্যমান বাস্তবতায় লিটলম্যাগ চর্চার অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। সাহিত্যের এই ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম কখনোই নিঃশেষ হবে না। চিন্তার পার্থক্য প্রকাশে এই মাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে...।
ভালোই তো। তবে, টাকার বিনিময়ে আবর্জনা যেন বেড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করে কোনো কোনো লিটলম্যাগের জন্ম হয়েছে। অরণির অবস্থান কী?
ছোট কাগজের চরিত্রের মধ্যে অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা।

দেখা যায় প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়েও কেউ কেউ ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ফেলেন। সেই বলয়ে ঘুরপাক খান নির্দিষ্টরাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধী নই। আবার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিজেকে সমর্পণ করতেও রাজি নই। কোথায় লিখলাম সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে কী লিখলাম সেদিকেই সুদৃষ্টি দিলে লেখকের দায়বোধ অবশ্যই কমে যাবে।

ছোটকাগজের সঙ্গে বাণিজ্যিক কাগজের কী ধরনের দূরত্ব থাকা জরুরি?
দূরত্ব একটাই। বাণিজ্যিক কাগজের অর্থ নামেই প্রকাশ। ছোট কাগজ এর উল্টো। পার্থক্য এখানেই।

প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রসারে লিটলম্যাগ আন্দোলন সংকুচিত হচ্ছে কিনা?
জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে পাঠবিমুখতাও সেভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ কিছুটা কমেছে। বইপাঠ এবং প্রযুক্তিপাঠ এখন পাশাপাশি। কখনো সাংঘর্ষিকও। ফেসবুক নিয়ে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অদূর ভবিষ্যতে ছাপা বই কেউ আর পড়বে না। আমি শঙ্কিত নই। কারণ, ফেসবুকের আবিষ্কর্তা মার্ক জাকারবার্গ তার শিশু পুত্রের প্রথম জন্মদিনে বই উপহার দিয়েছেন। বিল গেটসের সন্তানদের কম্পিউটার ধরার অনুমোদন নেই। কাজেই কোনটা কতটুকু ভালো আমাদের সন্তানরা ঠিক করে নেবে। তবে, আমরা তো হুজুগের জাতি, সহজেই অন্যকে অনুসরণ করি। ভালো-মন্দ বুঝতে তাই সময় লাগে। প্রযুক্তির মন্দ দিককে অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতা, দলবাজিকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
কখনোই ভালোভাবে দেখি না। দলবাজি যদি রাজনৈতিক হয় তাহলে আরও বিরক্তির ব্যাপার। মধ্যযুগের শেষের দিকে এবং আধুনিক যুগের শুরুতে কবিওয়ালদের একটি শাখা ‘পক্ষীর দল’ নামের কিছু কবি যারা একসঙ্গে একই ঘরে থাকতেন একই খাবার খেতেন, নিজেরা কবিতা রচনা করতেন, একে অপরের লেখা শুনতেন।

এরা ঘর থেকে বের হতেন না। অর্থাৎ এরা ছিলেন চূড়ান্ত রকমের অসামাজিক। এটাই ছিল ‘পক্ষীর দল’-এর উদ্দেশ্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পক্ষীর দলের স্থান ইতিবাচক নয়। মৌলবাদকে কঠোরভাবে দূরে রেখে যে কোনো চিন্তা এবং চিন্তার পার্থক্যকে মর্যাদা দিয়ে পত্রিকায় স্থান করে দিলে তো কোনো অসুবিধা দেখি না ।

দুই বাংলার লিটলম্যাগচর্চার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখতে পান?
আকারে-প্রকারে তেমন পার্থক্য নেই। তবে, পশ্চিমবঙ্গের ছোট কাগজগুলোতে থাকে জীবনঘেঁঘা লেখা। তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের মতো নয়। ভাষাতেও রয়েছে পার্থক্য। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় কবির ঝোলাতেই থাকে তাদের ঘামের ফসল। একজন কবি মানেই একটি লিটলম্যাগ। পত্রিকা প্রকাশে দরদের মাত্রাও বেশি। কম-বেশি আমাদের এখানে বিজ্ঞাপন মেলে। ওদিকে বেশিরভাগই বিজ্ঞাপন ছাড়া।