‘লিটলম্যাগ যদি বিপ্লবী হয় সাহিত্যপত্রিকা ধ্রুপদী’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

‘লিটলম্যাগ যদি বিপ্লবী হয় সাহিত্যপত্রিকা ধ্রুপদী’

পুলক হাসান, সম্পাদক, খেয়া ৩:৩১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২০

print
‘লিটলম্যাগ যদি বিপ্লবী হয় সাহিত্যপত্রিকা ধ্রুপদী’

লিটল ম্যাগাজিনকে বলা হয় লেখক সৃষ্টির আঁতুড়ঘর। নবীন লেখকদের অধিকাংশ হাত পাকান এখানে লিখে। সারা দেশে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উদ্যোগে প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য লিটলম্যাগ। লিটলম্যাগচর্চার নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ‘খেয়া’ সম্পাদক পুলক হাসান। সঙ্গে ছিলেন শফিক হাসান

আপনার সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনটির প্রথম সংখ্যা কখন প্রকাশিত হয়?
১৯৮৩ সালে শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা ‘খেয়া’ সম্পূর্ণ কবিতা পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আজকের অনেক প্রতিষ্ঠিত তরুণ কবির লেখা ছিল তাতে। যেহেতু সময়টা ছিল কবিতার বাঁক বদলের এবং নতুন একটা স্বর সন্ধানের আর আমরাও ভুগছিলাম কবিতা জ¦রে। ফলে বিচিত্র ধরনের কবিতা নিয়ে প্রকাশিত সংখ্যাটি বেশ সাড়া পেয়েছিল। নিজের টেরাকোটা চিত্রকর্মে সংখ্যাটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্তর দশকের কবি ও চিত্রী প্রয়াত মাহবুব কামরান।

কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থেকে সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন?
অনেকের অনেক রকম উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে আমার বেলায় বলব, কবি হওয়ার ব্রত নিয়েই মূলত পত্রিকা সম্পাদনায় আসা। কারণ, এতে একই সঙ্গে নিজেকে যেমন প্রকাশ করা যায় তেমনি অনেক লেখকের সঙ্গে একটা যোগসূত্র সৃষ্টি করা সহজ হয়। সেটা হয়েছে বৈকি। আর অন্য অর্জনের কথা যদি বলি তবে বলব, নিতান্তই আত্মসুখে এ পাগলামি! বৈষয়িক দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা কম বাহাদুরি নয়। সেই সঙ্গে পোড়খাওয়া নানা রকম অভিজ্ঞতা তো আছেই। তাতে জীবনবোধে আমার মতো আমি হয়ে উঠেছি। এ প্রাপ্তিকে এখন বলতে হবে ‘লোকসান হতে হতে আমার লাভও হয়েছে’। কারণ, আমি এখন এ ক্ষেত্রে ভালোমন্দের বিচার করতে পারি। সৃষ্টি হয়েছে আলাদা একটা রুচিবোধও।

বর্তমানে লিটলম্যাগচর্চা কেমন হচ্ছে?
আগের মতোই বিক্ষিপ্তভাবে চর্চা হচ্ছে, তবে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নেপথ্যে কারণ হয়তো অনেক।
অনেক কিছুর হাতছানিতে হয়ত চেতনায় আজ সেই ধার নেই। প্রবল প্রাপ্তি প্রবণতা আলগা করে দিয়েছে শিল্পের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে কারণেই হয়তো এ ধস। অথচ স্বপ্ন ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে লিটলম্যাগেরই জ¦লন্ত বারুদের মতো ভূমিকা রাখার কথা। স্বাধীনতা উত্তর বাস্তবতায় ঐ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ছিল খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে দু’টি ছোটকাগজের কথা উল্লেখ করতে চাই- নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরকাল’ ও কবি আহমদ রফিক সম্পাদিত ‘নাগরিক’। একটি তৈরি করেছে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে নতুন স্বপ্ন নির্মাণের পথে সামাজিক অবক্ষয় উত্তরণে অনিবার্য সাহিত্য আন্দোলনের গতিপথ। অন্যটি একইসঙ্গে চিহ্নিত করেছে প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য তারুণ্য।

লেখক সৃষ্টিতে লিটলম্যাগের ভূমিকা কতটুকু?
বিকশিত হওয়ার আগে জরুরি আত্মপ্রকাশ। লিটলম্যাগ সেই আত্মপ্রকাশের প্লাটফর্ম। নতুন লেখক সৃষ্টির জন্য এর ভূমিকা তাই অতুলনীয়। যে কারণে লিটলম্যাগকে বলা হয় নতুন লেখক সৃষ্টির ‘ড্রিম ফ্যাক্টরি’।

সম্পাদনা করতে গিয়ে কী ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করছেন, কী সম্ভাবনা দেখছেন?
লিটলম্যাগ সম্পাদনার অন্তরায় হলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ব্যক্তি কি প্রতিষ্ঠান, কোন পক্ষই একে আমলে নিতে নারাজ। সম্ভাবনার কথা বলব কি? কোনো অনুকূল ছায়া নয়, বরং দিনে দিনে তা প্রকট হচ্ছে।

যথার্থ লিটলম্যাগের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত?
লিটলম্যাগ কেমন হবে সময় তা নির্ধারণ করে। সময়ের প্রতিকূলতায় লিটলম্যাগেরই শাণিত ভূমিকা রাখার কথা। তা হচ্ছে কি? লিটলম্যাগ ও সাহিত্য পত্রিকাকে আলাদা করে দেখতে চাই এইভাবে, লিটলম্যাগের চরিত্র যদি বিপ্লবী, তবে সাহিত্যপত্রিকা ধ্রুপদী। একটি সময়, অন্যটি চিরকালীনতাকে ধারণ করে আছে।

আপনার সম্পাদিত লিটলম্যাগে কী ধরনের লেখা প্রাধান্য পায়? এর লেখক ও পাঠক কারা?
মত ও পথ নয়, সৃজনশীল ও মননশীল লেখাকেই আমার প্রথম অগ্রাধিকার। সে সূত্রেই আবদ্ধ আমার পত্রিকার লেখক ও পাঠক। তবে একটি মানসম্পন্ন ছোট পত্রিকার জন্যে সৃজন ও মননশীল যে গদ্যের প্রয়োজন তার আকাল এখন। ফলে হাতে নেওয়ার মতো তেমন পত্রিকা চোখে পড়ে না। সৃজনশীল লেখক সৃষ্টির জন্য এ সংকটকালে লিটলম্যাগচর্চার গুরুত্ব অনেক। কারণ, যুগ যুগ ধরে লিটলম্যাগ থেকেই বড় মাপের লেখক বেরিয়ে এসেছে।

কোনো কোনো লিটলম্যাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এতে দোষের কিছু নেই, যদি তা সত্যিকার সাহিত্য পৃষ্ঠপোষক হয়। যেমন এই অমর একুশে বইমেলায় সিলেট থেকে লিটলম্যাগ প্রকাশনা ‘চৈতন্য’ ষাটের দশকের স্বতন্ত্র ধারার শক্তিমান কবি নূরুল হকের কাব্যসমগ্র প্রকাশ করে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এটাকে সাধুবাদ জানাই।

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করে কোনো কোনো লিটলম্যাগের জন্ম হয়েছে। আপনার অবস্থান প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নাকি বিপক্ষে?
লিটলম্যাগের জন্মই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার তকমা নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তা তত্ত্বে ও তর্কে ঝড় তুলে হঠাৎ নিভে যায়। আমি এর ধারাবাহিকতা কামনা করি। যদিও আমি সাময়িক উত্তেজনায় নয়, চিরকালীনতায় বিশ^াসী। ফলে আমি পিওর সাহিত্যের পক্ষে। ছোটকাগজ চৈতন্যকে নাড়া দেয়। বিশেষ চিন্তাভাবনায় আকৃষ্ট করে। বাজারি নয় বলে সেখানে বাণিজ্য করার প্রশ্নই উঠে না। বাণিজ্য পত্রিকার সঙ্গে লিটলম্যাগের পার্থক্য এখানেই।

আপনার কাগজের প্রকাশিত সংখ্যা কতটি? বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোন সংখ্যাটি, কেন?
সুদীর্ঘ ৩৭ বছরের পথ চলায় আমার সম্পাদিত ‘খেয়া’ পত্রিকার ইতিমধ্যে ৫৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংখ্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সার্ধশত সংখ্যাটি। তাতে তাঁর (রবীন্দ্রনাথ) সময়কাল থেকে এই প্রজন্ম পর্যন্ত পক্ষে-বিপক্ষে সুচারু বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ এক রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংস্কৃতির উল্টোস্রোত, পাঠবিমুখতা, প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রসারে লিটলম্যাগ আন্দোলন সংকুচিত হচ্ছে কিনা?
এসবই লিটলম্যাগচর্চার অন্তরায়। ফলে সংকুচিত নয় শুধু, ঝিমিয়ে পড়েছে লিটলম্যাগ আন্দোলন। লিটলম্যাগের গোষ্ঠীবদ্ধতা, দলবাজি যে চর্চার বারোটা বাজিয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে কি?

দুই বাংলার লিটলম্যাগচর্চার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখতে পান?
দুই বাংলার জীবনধারা এক নয়, এক নয় অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিকোণও। এপারে যদি দেশকাল ও জীবনঘনিষ্ঠ চিত্র ওপারে যান্ত্রিক জীবনের ছায়া আবৃত। দুই দেশের লিটলম্যাগচর্চাকে এভাবে দেখলে অত্যুক্তি হবে না বলে মনে করি।