স্মৃতির ঘ্রাণ

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

গল্প

স্মৃতির ঘ্রাণ

ইমরুল কায়েস ১:৩৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০২০

print
স্মৃতির ঘ্রাণ

হায় রে...! সেই সম্মোহন? একই পুলক! পেলেই হারিয়ে ফেলি। সেই বছর দশেক আগে পেয়েছিলাম আর আজকে- তপ্ত দুপুর। কালো কুচকুচে পিচঢালা রাস্তা ধরে চলছি। হাঁটার পথে কোনো সঙ্গী না হলে চলার আনন্দ যেমন ছন্দ হারায় সঙ্গে সঙ্গে চলার পথটাও যেন লম্বা হতে থাকে। চলছি তো চলছিই। গরমের সঙ্গে বিরক্তি সেই সঙ্গে একাকিত্ব। মনে হচ্ছে সামনে কোনো গাছের ছায়া পেলে বসে একটু জিরিয়ে নেব...।

হঠাৎ আমার বাঁ দিক ধরে হনহন করে সামান্য একটু পাশ কাটিয়ে ছাতা হাতে আলগোছে মধ্যবয়সী এক নারী তাড়া করে হেঁটে গেল। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ১০ সেকেন্ড বিরতিতে একটি ঘ্রাণ পেলাম। ঘ্রাণটি খুবই পরিচিত মনে হল। মনে পড়ল এ সে ঘ্রাণ যার টানে মোহিত হয়ে মধ্যরাত থেকে ভোর অবধি বিভোর থাকতাম। যা এতদিন পরে পেলাম।

এ এক অন্যরকম আবেগী মাদকতা। তাই মনের অজান্তেই বাইরের গাম্ভীর্য আর ভদ্রতার লেবাসকে এক নিমিষেই ঝেঁটিয়ে দিয়ে দশ বছর আগের দুরন্ত যুবকের মতোই উদ্দেশ্যহীন, তবু ভালো লাগে এমন কাজের পেছনে ছোটার মতো ছাতাওয়ালীর পিছু নিলাম। দুটি সমান্তরাল লাইনের ছোট-বড় অংশের মতো সন্তর্পণে হেঁটে চলছি তার সঙ্গে। এভাবেই হাঁটছি আর হাঁটছি। মনে নেই, আমিও মধ্যবয়সী একজন সাংসারিক পুরুষ। চলছি সেই মাদকতার টানে নিজের বর্তমান বয়সকে দূরে ঠেলে। এ সেই ঘোরলাগা নেশা যাতে বুঁদ হয়ে কেটে যেত সারা দিন রাত।
পরিচিত আমোদি এ সম্মোহনী টানেই কত না ঘটন-অঘটন ঘটিয়েছিলাম তার বিশদ বিরতিহীন বর্ণনার অল্প কিছুই বলা যায়। বলতে ভালোই লাগছে; কেবলই ঘ্রাণের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। থাক সে কথা; পুরনো সেই ঘটনায় আসি। সবে মাধ্যমিকের চৌকাঠ ডিঙিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের কুশীলব। জানি না, সেই বয়সে সব ছেলেদের এমন অনুভূতির দোলা আসে কি না? কোনো উঠতি বয়সের মেয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেই যেন হালকা অনুভূতির সঙ্গে মৃদু বাতাস আর একটা ভালোলাগার অজানা ঘ্রাণ পেতাম। নিমিষেই সেই ঘ্রাণের সঙ্গে হারিয়ে সুখের ভেলায় ভিড়তাম; কী যে টান লাগত! আর কি রকম একটা সম্মোহন? এক মিনিটের এ বিচিত্র-চিরায়ত কাজটি করতে পারলে মনে হত যেন হাজার বছরের পিপাসা নিবারণের অমৃত পেলাম।

চলছি দুজনে আগে পিছে, সেই মধ্যবয়সিনী কেন জানি আনমনা হয়ে রাস্তার পাশে একটু দাঁড়িয়ে পড়ল; আচমকা তার দাঁড়িয়ে পড়ায় একটু বিস্মিত ও ধাক্কা খেলাম! এ ভেবে, মহিলা আবার আমার মিশন ও ভাব-ভঙ্গিমা বুঝে উঠল কিনা? খুব কাছেও না আবার খুব দূরেও না, এমন নিরাপদ দূরত্বে এসে গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম।

জানি না, কোন সে টানে। নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছি তার দিকে। বেশ ছিপছিপে গড়ন; পড়নে ধোপ ভাঙা শাড়ি মার্জিত রুচিতে পরা। কোন ইচ্ছেতে না আবার কোন মহা উদ্দেশ্যে না তাকিয়ে আছি একচিত্তে। কোন এক গভীর কিন্তু সেই অজানা আকর্ষণে পিছু নেওয়া।
উৎসাহের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ভিন্ন দিকে চেয়ে চোখ বাঁকা করে তাকাচ্ছি। দেখি কী করে; না, দাঁড়িয়েই আছে। বারবার তাকে লুকোচুরি নজরে দেখে সেই উচ্চ মাধ্যমিকের বয়সে চলে গেলাম; বয়স তো তখন সবে সতেরর কাছাকাছি। কলেজে যাই বাইসাইকেলে চেপে; বালিকা বিদ্যালয়ের ঠিক সামনের পথ ধরে। কেন জানি বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েদের স্কুলের পোশাকে দেখতেই এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করত ওই বয়সে। লিখছি আর চোখের সামনে ভাসছে সেই পোশাক; বেশ আকর্ষণ ও পুলক বোধ হতো।

প্রতিদিন সকালে কলেজ যাওয়ার পথে বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে এসে অজানা কারণে বাইসাইলের গতি কমে যেত। রাস্তার পাশ ধরে সারি সারি মেয়ে বুকের মধ্যে বইকে পরম যত্নে জড়িয়ে মৃদু মৃদু পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেন জানি পায়ের গতির আগেই সাইকেলের গতি কমে যেত নিজের অজান্তেই। পা চলতেই চাইত না। রাস্তার কিনার ধরে; বিশেষ করে তিনজন মেয়ের হাতের ডান পার্শে^ রাস্তার কিঞ্চিৎ যে ফাঁকা অংশটুকু থাকত; ওই টুকু দিয়েই তার কাছ ঘেঁষে চলে যেতাম। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে তার হাঁটার জন্য যে বাতাসের দোলটুকু এসে লাগত আর আমি পেঁজা তুলোর মতো সেই পুলকজাগা ঘ্রাণে ক্ষণিকের জন্য ডুবে যেতাম। সাইকেলে আছি নাকি বাতাসেই ভাসছি বুঝতেই পারতাম না; যতক্ষণ না পেছন থেকে কোনো ভ্যানগাড়ি বা সাইকেল ক্রিং ক্রিং বেল বাজায়। বেলের সতর্ক সংকেত পেয়ে দ্রুত সাইকেলের প্যাডেল চেপে হালকা লজ্জায় সাইকেল ছাড়তাম। যেন পলকেই তার দৃষ্টিসীমা ছেড়ে যাই। কী সে ঘ্রাণ আর তার টান। বাকি রাস্তাটুকু স্নায়ু সরোবরে টান টান রেশ থাকত।

স্বপ্নে হারিয়ে অতীতের সেই পুলকে দুটো মিনিট চোখ বন্ধ করেছিলাম; চোখ খুলেই দেখি সামনে কিছু মানুষের জটলা; জটলার ফাঁক গলিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম। কয়েকজন লোক সেই মহিলাকে ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বিমূঢ় মূর্তির মতো দাঁড়িয়েই থাকলাম...। সব অতীত সুখস্মৃতি আর এ বর্তমানে রোমন্থন ক্ষণিকেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। যা আজ আর বছর দশেক আগেই আরেকবার সময়ের শত্রুতায় হারিয়ে গেছে সেই সম্মোহন আর পুলক!