স্বকীয়তায় দীপান্বিত কবিতা

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

স্বকীয়তায় দীপান্বিত কবিতা

সাজেদা শারমিন ৮:৪৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২০

print
স্বকীয়তায় দীপান্বিত কবিতা

মোস্তফা মহসীন শূন্য দশকের কবি। একবার নয়, কয়েকবার পড়লাম তার কাব্যগ্রন্থ ‘মননের মধু’। বইপড়া অনেক সহজ তার থেকেও অনেক সহজ রিভিউ লেখা! কিন্তু কবিতার পঙ্ক্তি ছেনে পাঠকের কাছে কিছু সোনালি ঝিলিক পৌঁছে দেওয়া এবং কবির ভাবের সঙ্গে ভাব মেলানো বেশ কঠিন! কবিতাগুলোতে ঢুকে পড়তে আমার কিছুটা সুবিধা হয়েছিল এই কারণে, একটি কবিতার সঙ্গে আমার প্রণয় ছিল আগে থেকে। বিষয়ের বহুমাত্রিকতা যেমন আছে, বলায়ও ঘনত্ব আছে। প্রতিটি কবিতায় বার্তা রয়েছে। স্বপ্ন লুটের বিষয়ও খেয়াল করলে পরিলক্ষিত হয়। লেখকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার তারিফ করতে হয়।

৪১টি কবিতার ভেতর অধিকাংশ প্রবহমান বাংলা অক্ষরবৃত্তে লেখা। কয়েকটি মাত্রাবৃত্তের কবিতাও রয়েছে। বাকিগুলোকে গদ্যকবিতাই বলা যায়। মাত্রাবৃত্তে লেখা একটি কবিতা থেকে বেশ ভালো লাগল-
আম্মা দরজায় দাঁড়িয়েই আছেন ডানপিটে ছেলের অপেক্ষায়... ওই দিকে
শিশু নাসারন্ধ্রে লেগেছে জলার্দ্র সুখের বুনোট
সৃজনতরঙ্গে অবুঝ শিশু বোঝে না মাতৃশাসন; বুঝেছে বুনোফুল! (উড়ুউড়ুচর্চা-এক)

সেরকম আরেকটি কবিতার পঙ্ক্তি-
কাপড় ধোয়ার মতো নিজ থেকে মোচড়ায় শরীরের হাড়-মাংসগুলো
ভাবি মেরুদণ্ড কি বেঁকে গেল, নাকি ছিল কখনও? (উড়ুউড়ুচর্চা-দুই)
কাব্যতৃষ্ণার প্রাবল্যে এ এক সম্মোহিতের আত্মকথা! কুয়াশার জঞ্জাল ভেদ করেও যে এ নিরক্ষবলয়ে ভীষণ একা! বহুদিন ফেরা হয় না তার; নির্দিষ্ট নারীর কাছে, প্রিয় জনপদে। সেই একাকিত্বের অনিঃশেষ যন্ত্রণা বহন করেই কিনা হৃদয়বৃত্তিই হয়ে ওঠে তার কবিতার মৌল জ¦ালানি শক্তি-
কী করে ফেরাবে বাড়ি?
অন্তর্গত নদী ভেঙে
করতলে ভাসে অবিশ্বাসের ভেলা।
দু’পা এগোলেই তা-ই পথের লাগাম টানে
পিচ্ছিল কলার খসা!

উড়ে আসা অন্ধ সময়ের বিজ্ঞাপন
আকাশও ধুয়োলীন
বলো, কী করে দেখব-
তোমারই শ্রীমুখ মনীষা? (শুভ অমাবস্যা)
সমকাল, ঘটনা এবং মানুষ থেকে কবি কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি। একটা শ্রেণি আর একটা শ্রেণিকে অপমান করছে, নিষ্পেষণ করছে এটা যেমন আছে তেমনি পুঁজির খেলাটাও আছে।
ভূতেদের মেগাসিটি জুড়ে
হাইরাইজের বিড়ম্বনা
চা-বিক্রেতা জয়নাল
ঠিকমতো দেয় নির্দেশনা;
গল্পের চূড়ান্ত ক্লাইমেক্স
কার, কখন, কী হবে- যথার্থ ভূমিকা? (ফুটপাত)

জীবন থেকে যারা পালাতে চান, মিথ্যে মায়ায়। টাকার মোহে। প্রবাস জীবন দর্শনে; তাদের ব্যথা যেন কবিকে বিমূঢ় করে দেয়। কবি লেখেন-
কোথায় এসেছি আমি? কোন দেশে?
কোন গ্রহে... আলো-অন্ধকার?
মাটিতে পা ফেললেই ঠাণ্ডা
মধ্যরাতে নীলজলে চাঁদ
ঝাঁপিয়ে লাফিয়ে পড়ে প্রিয়মুখ দেখি না কাউকে
দূরে-কাছে
চমকে উঠে দেখি যে
সেই পথ একই তো আছে রোদ-জল-প্রেমে; (প্রবাস)

পাঁজরের মধ্যে একধরনের শিরশিরানি অনুভূত হয়। স্বজন থেকে সাতসমুদ্র দূরে থাকা মানুষের ব্যথায় বোধহয় সকলেই ব্যথাতুর হন, কেঁপে ওঠেন। আবার মানুষের গোটা জীবনটাই অন্তিমে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি মাত্র। একটি কবিতাটাকে খুব ব্যতিক্রম মনে হল-
আলো প্রতারণা করে, অন্ধকার শুধু
শুইয়েই দেয়
জানি নিথরের মধ্যে আছে
ঈশ^রের চাবি; চূড়ান্ত মায়া! (চোরাস্রোতে যাপন)
আবার আরেকটি কবিতায়-
স্তব্ধতার ভেতরে ভেতরেও জ্বলে জোনাকি
নিয়ন আলোয়
ঝাঁপ দেয়
পিচের রাস্তায়
একটি সূক্ষ্ম শরীর নাকি মরণেও বিলীন হয় না! (পরাবাস্তবতা)

পরাবাস্তববাদ হচ্ছে যেখানে চেতনা জগতের বাস্তব ও মগ্নচৈতন্যের সব রহস্য এক হয়ে যায়। চিন্তা, কল্পনা, স্বপ্ন মিলেমিশে ভাবছি; এগুলো কি তবে কবির পরাবাস্তবের ছোঁয়া। যেমন-
কামনায় আত্মনাশি ঘুম। আলোড়িত বশীভূত তোমাকেই শেষ দখলে রাখে স্বপ্নে বর
ঐকিক নিয়ম! স্বপ্ন প্রত্যাখ্যান করো জান্তব আর্তনাদে; তখন তোমাকে স্বাগত
জানায় স্থলভরা হাজার শিশির। (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)
কিছু শব্দে ভেসে ওঠে জীবন। আর জীবন-স্বপ্ন নিয়ে, স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাতের নানামুখী স্তর। তবে ‘মুখোশে বৈশাখ’ এবং ‘মন পাহাড়ের প্রজাপতি’ মনে হয়েছে যেন কবির অবচেতনে লেখা। পরিশীলন এবং পরিচর্যার ছাপ এই দুটো কবিতায় একেবারেই ছিল না। এছাড়া রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধে সমুজ্জ্বল তার কবিতা ভুবন। বইটির প্রচ্ছদ এবং বাঁধাই গতানুগতিক। প্রকৃত মনীষাদীপ্ত পাঠকের দরজার কড়া নেড়ে স্বাগত জানাক; এটাই প্রত্যাশা।