শীতের কবিতারা

ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

শীতের কবিতারা

অমিত গোস্বামী ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

print
শীতের কবিতারা

বাঙালির শীতবিলাস হারিয়ে গেছে বেশ দ্রুতই। গ্লোবাল ওয়ার্মিং নাকি গ্লোবাল ভিলেজের লেটেস্ট সংস্করণগুলির প্রভাবে তা জানি না। সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকেই শীতের ছবি পোস্ট করে। কখনও শীতের দেশের ছবি, কখনও গ্রামবাংলার শীতের ছবি। দেখা যায় ‘কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে, নিথর দীঘির পারে বসে আছে বক।’ (যদি নির্বাসন দাও, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)।

শীতের এক অসাধারণ চিত্রকল্প। কিন্তু শীত বেশ জাঁকিয়ে পড়লেই তার বর্ণনায় বাঙালি অকৃপণ হন কবিতার পঙ্ক্তিকে উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে। শীত বর্ণনায় কবিতা কেন? গানও তো আছে। রবি ঠাকুরের ‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে। পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে ॥’ থেকে হালফিলের অনুপম রায়ের ‘আরো শীত চুয়ে পড়ুক গাছের পাতার তলায়/ আরো শীত ছড়িয়ে যাক তোর কথা বলায়,/ আরো শীত বাক্স বন্দি কিছু ইচ্ছে আছে/ আরো শীত লেপ তোষকমোড়া আমার কাছে।’

গানই তো আছে। তবে কবিতা কেন? উত্তরটা খুব ভালো দিয়েছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়- ‘শীতের যে লালিত্য আছে যে নমনীয়তা আছে বা যে পেলবতা আছে তাকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে কবিতা। সুর সংযোজন সার্থক বসন্তকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে।’ কাজেই শীতের সাথে মিলে মিশে গেছে কবিতা।

শীত আগে পড়ত তুমুল তীব্রতায়। কিন্তু কবিতায় শীতবন্দনার সূত্রপাত অনেক পরে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ। রূপকের আশ্রয়ে বৌদ্ধ সহজিয়াগণের কল্পনায় তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন চিত্রের প্রতিফলন থাকলেও শীতের অবস্থা ও প্রভাবের কোনো উল্লেখ নেই। বৈষ্ণব পদাবলিতে শীত এসেছে রাধার অভিসার-অনুষঙ্গে। শীত এখানে যত না আনন্দের অনুষঙ্গ, তারচেয়ে অনেক বেশি বেদনার শোকগাথা।

বাঙালির হাজার বছরের দুঃখের কথাই যেন ফুল্লরার মুখ দিয়ে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (আনুমানিক ১৫৪০-১৬০০) প্রকাশ করেছেন, নিচের কবিতাংশে শীতের অনুষঙ্গে- ‘কার্ত্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ।/ যগজনে করে শীত-নিবারণ বাস/নিযুক্ত করিল বিধি সভার কাপড়।/অভাগী ফুল্লরা পরে হরিণের ছড়।’ (মুকুন্দরাম চক্রবর্তী/ ‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্য)। মধ্যযুগের একজন খ্যাতিমান কবি আলাওলের (১৬০৭-১৬৮০) কাব্যে শীত রোমান্টিক আবহে নর-নারীর প্রেম ও মিলনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিধৃত হয়েছে। কবির কাব্য পঙ্ক্তিতে সে কথারই প্রতিধ্বনি ফুটে উঠেছে ‘সহজ দম্পতি মাঝে শীতের সোহাগে।/ হেমাকান্তি দুই অঙ্গ এক হইয়া লাগে/ পুষ্পশয্যা ভেদগুলি বিচিত্র বসন।/ ওরে ওরে এক হইলে শীত নিবারণ।’ (‘ষট্-ঋতু-বর্ণন’, ‘পদ্মাবতী’)। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫৪) শীতকালকে দেখেছেন ‘সর্বনাশী’ হিসেবে। ‘তব প্রতি পূরক নিঃশ্বাস আকষিছে দুর্নিবার টানে/ মৃত্যুভয়ভীতি সর্বজনে তব বক্ষ গহ্বর পানে।/ ...শীত ভয়ংকর!’

এ কথা সত্যি যে আগে শীত মানুষের কাছে ততটা উপভোগ্য ছিল না। তার মূল কারণ এই যে আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশে আবরণের আধিক্যের অভাব। দিন কয়েক কাটিয়ে দিতে পারলেই হল। ইচ্ছে ও চেষ্টা কোনোটাই ছিল না এ শীতবস্ত্র লাভের। যেটুকু ছিল তা ধনীদের মধ্যেই। কথাটি আধুনিক যুগের প্রারম্ভের কবি ঈশ^র গুপ্তের (১৮১২-১৯৫৯) কবিতায় ফুটে উঠেছে ‘বসনে ঢাকিয়া দেহ গড়ি মোরা আছি।/ উহু উহু প্রাণ যায় শীত গেলে বাঁচি/ হাসিয়া নাগর কহে, খোল প্রাণ মুখ।/ শীত-ভীত হায় এত ভাব কেন দুখ/ ছয় ঋতু মধ্যে শীত করে তব হিত।/ হিতকর দোষী হয় একি বিপরীত।’ (‘মালিনী নায়িকার মানভঙ্গ’, ‘কাব্য কানন’)।

শীতের বহুমাত্রিক রূপ অঙ্কিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের (১৮৬১-১৯৪১) হাতে। শীত ঋতু নিয়ে তার অজস্র কবিতা রয়েছে যা জীবনঘনিষ্ঠতায় জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। তার দর্শন ও অনুধাবন কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে- ‘ডেকেছো আজি এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু/ শীতের সাথে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু।/ ভাবিয়াছিনু গতিবিহীন/ গোধূলি ছায়ে হল বিলীন/ পরাণ সম, হিমে-মলিন আড়ালে তারে হেরি-/ এমন ক্ষণে কোন গগনে বাজিল তব ভেরি?/ উত্তরায় কারে জাগায় কে বুঝে তার বাণী-/ অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর খানি।’ (‘উদ্বোধন’, ‘বনবাণী’)।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) দৃষ্টিতে শীত মোটেই সুখকর নয়। শীতের আগমনে পৌষ তার অনুভবে কবিতায় ব্যঞ্জিত হয়ে উঠেছে- ‘পউষ এলো গো-/ এক বছরের শ্রান্তি পথের কালের আয়ুক্ষয়,/ পাকা ধানের বিদায় ঋতু, নতুন আসার ভয়।/ পউষ এলো গো! পউষ এলো-/ শুকনো নিঃশ্বাস, কাঁদন-ভারাতুর/ বিদায় ক্ষণের, (আ-হ) ভাঙ্গা গলার সুর-/ ওঠ পথিক! যাবে অনেক দূর/ কালো চোখের করুণ চাওয়া দাঁড়ায়ে।’ (‘পউষ’, ‘দোলন-চাঁপা’)।

তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তার মগ্নচৈতন্যে উপমা অলংকারের সাযুজ্যে শীত মৃত্যুর মতো জীবনের সামনে সমাসীন হয়। কবি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছেন শীত ঋতুর শাখাচ্যুত পাতা, ঝরে পড়া নিশির প্রগাঢ় শিশির আলো-আঁধারের সন্ধিক্ষণে পেঁচার আকুতির অন্তর্জাত উপলব্ধিতে। এ সময়ে চারদিকে আবৃত কৃয়াশার অন্ধকারে কবি জীবনের উচ্ছ্বাস প্রত্যক্ষ করলেও হিমশীতের প্রগাঢ়তায় কেবলই শূন্যতা ও রিক্ততার প্রতিচ্ছবিই কবির চোখে দৃশ্যমান।

কবির উপলব্ধিতে ‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;/ বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,/ কিংবা পেঁচার গান; সেও শিশিরের মতো হলুদ পাতার মতো। .চারদিককার আবছায়া-সমুদ্রের ভিতর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে মৃত মাছের পুচ্ছের শৈবালে,/ অন্ধকার জলে, কুয়াশার পঞ্জরে হারিয়ে যায় সব।’ (‘শীতরাত’, ‘মহাপৃথিবী’] প্রকৃতি ও নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ ‘শীতরাত’ ছাড়াও ‘শীতের রাতের কবিতা’, ‘সে এক শীত’, ‘শীত শেষ’, ‘এইসব শীতের রাত’, ‘শীতের কুয়াশা-মাঠে’, কিংবা ‘শীতের সকাল’ সর্বত্রই একধরনের নির্জনতা প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলার প্রকৃতিতে শীতের উপস্থিতি ও তার প্রভাব বিষয়ে অনন্য অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ পল্লীকবি জসীম উদদীনের (১৮৯৯-১৯৭৬) কাব্যভূমে পরিলক্ষিত হয়। উত্তরের হিমশীতল বায়ে শ্যামল বাংলার প্রকৃতি রুক্ষতার রূপ ধারণ করে। গাছের পাতা ঝরে যায়। পল্লবহীন বৃক্ষ যেন আভরণ পরিত্যাগ করে ধ্যানী তাপসীর মূর্তি ধারণ করে।

কবির চোখে পল্লব শূন্যবৃক্ষ যেন ধ্যানমগ্ন মুনি ঋষির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে কোনো কিছুর একনিষ্ঠ প্রত্যাশায়- ‘তবু কি তাহার সময় হইবে হেথায় চরণ ধরি,/ মোর কুঁড়েঘর দিয়ে যাবে হায়, মনি-মানিকেতে ভরি।/ সে কি ওই চরে দাঁড়ায়ে দেখিবে বর্ষার তরুগুলি,/ শীতের তাপসী কারে যা স্মরিছে আভরণ গায় খুলি!/ হয়তো দেখিবে হয় দেখিবে না; কাল সে আসিবে চরে,/ এপারে আমার ভাঙ্গা ঘরখানি, আমি থাকি সেই ঘরে।’ (‘কাল সে আসিবে’, ‘বালুচর’)।

কবি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) তার কলমে শীত চিত্রিত করেছেন তাকে ডাইনী উপমা দিয়ে- ‘বাইরে বরফের রাত্রি। ডাইনি হাওয়ার কনকনে চাবুক/ গালের মাংস ছিঁড়ে নেয়,/ চাঁদটাকে কাগজের মতো টুকরো করে/ ছিটিয়ে দেয় কুয়াশার মধ্যে, উপড়ে আনে আকাশ, হিংসুক/ হাতে ছড়িয়ে দেয় হিম; শাদা, নরম, নাচের মতো অক্ষরে/ পৃথিবীতে মৃত্যুর ছবি এঁকে যায়।‘ (শীতের প্রার্থনা : বসন্তের উত্তর/ শীতরাত্রির প্রার্থনা/ বুদ্ধদেব বসু)।

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) শ্রেণি সংগ্রামের কবি। তার ভাবনায় নিসর্গের চেয়ে জনজীবন প্রাধান্য পাবে এমনটাই স্বাভাবিক। সুকান্ত শীতে দরিদ্রের কষ্ট দেখেছেন, দেখেছেন পথের ছেলেগুলোর জন্য শীত কতটা যাতনাময়, কতটা বিভীষিকাময়। গরিবদের শীত নিবারণের জন্য সূর্যই হয়ে দাঁড়ায় উষ্ণতার অবলম্বন।

সেই সূর্যের প্রতি সুকান্তের আহ্বান- ‘হে সূর্য!/ তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে/ উত্তাপ আর আলো দিও/ আর উত্তাপ দিও/ রাস্তার ধারের ওই উলঙ্গ ছেলেটাকে।’ (‘প্রার্থী’, ‘ছাড়পত্র’)। শীতের উষ্ণতার কথা ভাবলেই প্রেমাস্পন্দনে কাছে পাওয়ার বাসনায় আনচান করে ওঠে মন।