অসাম্প্রদায়িক নজরুল

ঢাকা, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১১ মাঘ ১৪২৬

অসাম্প্রদায়িক নজরুল

পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী ৩:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২০

print
অসাম্প্রদায়িক নজরুল

‘আমি হিন্দু মুসলমানের পরিপূর্ণ মিলনে বিশ্বাসী। তাই তাদের সংস্কারে আঘাত হানবার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই।’ এমন উক্তি যার তিনি নজরুল। গোটা ভারতবর্ষের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার রূপকার তিনি। তার মতো এত বিরাট অসাম্প্রদায়িক মহীরুহ ভারতবর্ষে দ্বিতীয়জন ছিল বলে আমার মনে হয় না। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিমকে পৃথক করে দেখার ইচ্ছা তার মনে কোনোদিনই ছিল না। বরং তিনি উভয় সম্প্রদায়কে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাই তো লিখলেন-

মোরা এক বৃন্তে দু’টি ফুল হিন্দু-মুসলমান
মুসলিম তার নয়ন মণি, হিন্দু তার প্রাণ।
মোরা এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে, কেউ শ্মশানে ঠাঁই;
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরেতে গাই গান।

শুধু সাহিত্যে নয় বাস্তবেই তিনি হিন্দু-মুসলিম মিলনের আকাক্সক্ষা বোধ করতেন। আশালতা সেনগুপ্তাকে (কবি প্রদত্ত নাম প্রমীলা) বিয়ে এবং ধর্মান্তরিত না করা- এর চেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িকতার নজির আর কী হতে পারে? তবে হিন্দু মেয়ে বিয়ের কারণে দীর্ঘদিন কবিকে অনেক কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় তিনি লিখলেন-
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা কন আড়ি চাচা!

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলভী আর মোল-লারা কন হাত নেড়ে
দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে।
ফতোয়া দিলাম কাফের কাজীও
যদিও শহীদ হইতে রাজীও।’

শুধু কি তাই! সন্তানদের নামও রাখেন হিন্দুয়ানী-মুসলমানি নামের সমন্বয় সাধন করে। যেমন প্রথম পুত্রের নাম- কৃষ্ণ মোহাম্মদ, দ্বিতীয় পুত্রের নাম অরিন্দম খালেদ, তৃতীয় পুত্র সব্যসাচী ইসলাম এবং চতুর্থ জনের নাম অনিরুদ্ধ ইসলাম। নজরুল বাস্তবে কতটা অসাম্প্রদায়িক ছিলেন এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়।

কলকাতা এলবার্ট হলে ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘জাতীয় কবি’ সম্মানে সংবর্ধিত করার জবাবে কবি বলেছিলেন- ‘আমি মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’

এ অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন- ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব তখনও তার গান গাইব।’

সেদিন সভাপতির ভাষণে প্রফুলচন্দ্র রায় বলেছিলেন- ‘ফরাসি বিপ্লবের সময়কার কথা একখানি বইতে সেদিন পড়িতেছিলাম। তাহাতে লেখা দেখিলাম সে সময় প্রত্যেক মানুষ অতি মানুষে পরিণত হইয়াছিল। আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবি বংশধররা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হইবে।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই অতি মানুষ হয়েছিলেন। যেখানে নজরুলের ক্ষুরধার লেখা মানুষের মনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
হিন্দু-মুসলিমকে অভিন্ন কল্পনা করে কবি আরও লিখলেন-
ভারতের দুই নয়ন, তারা হিন্দু-মুসলমান
দেশ জননীর সমান প্রিয় যুগল সন্তান।
(হিন্দু-মুসলমান)

‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি-ধর্ম-ভেদ আমার কোনো দিনও ছিল না, আজও নেই। আমাকে কোনো দিন তাই কোনো হিন্দু ঘৃণা করেননি। ব্রাহ্মণেরাও ঘরে ডেকে আমাকে পাশে বসিয়ে খেয়েছেন ও খাইয়েছেন।’
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় ভারতভূমির স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন-
হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?
কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।
‘কুলি মজুর’ কবিতায় অসাম্প্রদায়িক কবি সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেন এভাবে-
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা কামনায় সব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে কবি তার দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় লিখলেন, ‘এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ। এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব গণ্ডী কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই
বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখ, পাশে তোমাদের মহাশয়নে শায়িত ঐ বরি ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান- ঐ
শ্মশান ভূমিতে শোন শোন তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন।’

সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় সারা ভারতবর্ষের মানুষকে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জাগিয়ে তোলাই ছিল তার ঐ বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে বিভেদ, সম্প্রদায়গত দাঙ্গা-সংঘাত বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম জাতিগত দ্বন্দ্বে নজরুল সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাই সকল সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠে তিনি ঘোষণা করলেন-
‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি
সব দেশে সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
(মানুষ)
তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মহামিলন এবং একতা। আর তাই তিনি সব ধর্মের বিভেদ ঘুচিয়ে অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন। তার ভাষায়-
‘গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’
(সাম্যবাদী)
শুধু তাই নয়। তিনি ইসলামি গজল-গান রচনার পাশাপাশি অসংখ্য শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও দেবস্তুতিমূলক সংগীত রচনা করে হিন্দু-মুসলিমের সমান ভালোবাসায় সিক্ত হন।