দার্জিলিংয়ের গল্প

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৬

দার্জিলিংয়ের গল্প

খন্দকার মাহমুদুল হাসান ৭:১৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০২, ২০২০

print
দার্জিলিংয়ের গল্প

দার্জিলিংয়ে যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আছে। কোনোটাই সমতলে নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার ফুট ওপরে মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে এসব বাঁক। একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্য পাশে গভীর খাদ। বাঁকগুলো সব খাদের প্রান্ত ঘেঁষে।

নেপালের বীরগঞ্জ থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার পথেও এমন বাঁক দেখেছি। যেন শূন্যের ওপরে এঁকেবেঁকে চলে যায় গাড়ি। অকপটেই স্বীকার করি, বাঁকগুলো পেরোনোর সময় বেশ ভয় ভয় করেছিল আমার।

শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিংয়ের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৭৭ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব প্রায় ৫২০ কিলোমিটার। আমি অবশ্য ঢাকা থেকে যাইনি। গিয়েছি কলকাতা থেকে। প্রথমে কলকাতা থেকে রাতের বেলার পদাতিক এক্সপ্রেসযোগে নিউ জলপাইগুড়ি, সংক্ষেপে যাকে এনজেপি বলা হয়। কলকাতা থেকে রাত ১১টার দিকে রওনা দিয়ে নিউ জলপাইগুড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা প্রায় সাড়ে ন’টা বেজে গিয়েছিল।

দক্ষিণ থেকে উত্তরে রওনা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ জেলাকে স্পর্শ করে নিউ জলপাইগুড়িকে ছুঁতে কেটে গেল পুরোটা রাত। এসি স্লিপারে আরামদায়ক দ্রুতগামী ট্রেনে যাত্রা করে মনে কোনো উৎকণ্ঠা ছিল না, তবে সময়টুকুই যা লাগল। রেল স্টেশন থেকে শিলিগুড়ি শহরের দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার। অটোয় চেপে পাড়ি দিলাম পথটা। কোনো হোটেলে উঠিনি।

প্রকাশক মারুফ হোসেনের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় চলে গেলাম বাবুপাড়ায় কবি অনুজ মজুমদারের আবাসনে। সেখানে ভালোবাসার প্লাবন বয়ে গেল। দুপুরের পর চলে গেলাম উত্তরবঙ্গ বইমেলায়। শিলিগুড়ি শহরের কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে বসেছিল সেই মেলা। বেশ জমজমাট বইমেলা। বাংলাদেশের বেশকিছু বইও পাওয়া গেল।

অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। দেখা হলো আমার অনেক বই এবং পাঠকের সঙ্গেও। অনেক পাঠককে হস্তাক্ষর নিদর্শন দেওয়ার সুযোগও মিলল। সে ছিল এক আনন্দের দুপুর। আনন্দের বিকেল। আনন্দের সন্ধ্যা। রাতে চলল তুমুল আড্ডা। দুনিয়ার কত বিষয় নিয়ে কত চুলচেরা বিশ্লেষণ, কত আলোচনা, কত সমালোচনা! ভোরে উঠেই দার্জিলিং যাত্রা।

অভাবনীয় দ্রুততায় প্রায় আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের শহরে। যাওয়ার পথে বহু নিচে মেঘের আনাগোনা দেখে চমৎকৃত হলাম। তবে কারশিয়াংয়ে মেঘ এসে যখন পথ আগলে দাঁড়াল তখন আমিও থমকে গেলাম। বলা যায় হতবাক হলাম। কারণ গাড়িকে তখন ঘিরে ধরেছে মেঘ। একটু আগেই যা ছিল হাওয়ায় ভেসে আসা তুলোর মতো সাদা জিনিস, এখন তা দলা পাকানো অন্ধকার যেন। তবে বেশিক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার জিনিস ওরা নয়। তাই পাশের পাহাড়ের গায়ে উড়ে গিয়ে যেই না লাগল ধাক্কা, অমনি ঝমঝম করে নেমে এলো বৃষ্টি। কেটে গেল অন্ধকার। ঝলমল করে উঠল চারদিক। তরতর করে উঠল গাড়ি আরও ওপরে আকাশের দিকে। রোমাঞ্চে রুদ্ধ হয়ে গেল আমার শ্বাস।

যাওয়ার পথেই দেখলাম, পাহাড়ের গায়ে গায়ে থরে থরে উঠে গেছে সব ঘরবাড়ি। এ যেন বাস্তবের দৃশ্য নয়, পুরোটাই ছবি। পাহাড়ের গায়েই বসানো রয়েছে স্কুল, বৌদ্ধমন্দির। একেক উচ্চতায় একেকটা দালান। চলবে...