আগুনের পরশমণির গেরিলা-আখ্যান

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আগুনের পরশমণির গেরিলা-আখ্যান

মোহাম্মদ আজম ২:৪২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

print
আগুনের পরশমণির গেরিলা-আখ্যান

হুমায়ূন বোধহয় মুক্তিযুদ্ধের লেখকদের মধ্যে একমাত্র লেখক, যিনি সাধারণ মানুষের মিশ্র দৈনন্দিনতার মধ্যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন এবং বেশ অনেকদূর পর্যন্ত সফল হয়েছেন। অন্য বেশিরভাগ লেখকের লেখা বা পরিচালকদের সিনেমা আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র; তাও আধুনিক জীবনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জনজীবনের কোল ঘেঁষে হওয়া যুদ্ধের মতো নয়, বরং মহাভারতের বা পানিপথের যুদ্ধের মতো- দুই পক্ষ বেশ স্বতন্ত্র সব চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে দুপাশে। ফলে তাদের পারস্পরিকতা নেই, চিহ্নে কোনো ভেজাল নেই। তারা পরস্পর শত্রু হিসেবে আর দশ বাস্তবতা থেকে বিযুক্ত হয়ে যুদ্ধটাই করে। হুমায়ূন দুই পক্ষকেই স্থাপন করেন বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে।

প্রশ্ন হলো, হুমায়ূন জনজীবনের প্রাত্যহিকতার মধ্যে যুদ্ধকে চিহ্নিত করতে গিয়ে কি জাতীয়তাবাদী আবেগ বা শত্রুপক্ষের চিহ্নায়নে কোনো সমস্যায় পড়েছেন? না। তার লেখায় জাতীয়তাবাদী আবেগ সম্ভবত বেশিই, অন্তত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্য অনেক বড় লেখকের তুলনায়। আর মানুষের দুর্দশা, শয়তান ও ফেরেশতার আলাদা বা যুগপৎ লীলা শনাক্ত করার জন্য হুমায়ূনের পদ্ধতিই আসলে বেহতর, এই অর্থে যে, কোনো বেদনা বা আনন্দ কেবল তখনি স্পষ্ট মাত্রায় উপলব্ধি করা সম্ভবপর, যখন সংশ্লিষ্ট চরিত্র বা পরিস্থিতির পূর্বতন পরিচয় সামনে থাকে।

আগুনের পরশমণি উপন্যাসে গেরিলা দলটিকে আশফাকের ডেরা মডার্ন নিওন সাইন-এ ঢুকিয়ে দিয়ে, পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে আলমের মনের দোনোমোনা আমাদের জানিয়ে, তিনি ঘুরে আসেন বেশ কয়েকটি প্রাঙ্গণ। মতিন সাহেব সেদিন অফিসে যায়নি, আর সুরমা রোদ দেখে একগাদা কাপড় ভেজাতে দিয়েছে- এরকম একটা দৈনন্দিনতায় চলেছে ওই বাড়ির দিনটি, যে বাড়ি থেকে আলম নামের ছেলেটি ঢাকায় এবার প্রথম অপারেশনে বেরিয়েছে।

এ বাড়ির মেয়ে রাত্রির বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল অন্যত্র, ঠিক ওই সময়েই, যখন আলমরা একটি অপারেশনের প্রতিকূলতা খতিয়ে দেখে বিপর্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধটা আসলে আছে এসবের মধ্যেই। যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আছে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যত মানুষ যুক্ত ছিল তার চেয়ে বহুগুণে মানুষ ছিল সাধারণ জীবনযাপন আর আত্মরক্ষার বিচিত্র কৌশল উদ্ভাবনে- শুধু এ তথ্যই আমাদের এ মন্তব্যের কারণ নয়। বস্তুত, যুদ্ধের বাইরেই আসলে যুদ্ধটা হয়। প্রস্তুতির দিক থেকে, যে মানুষগুলো যুদ্ধটা করছে তাদের ইতিহাস ও বর্তমানের দিক থেকে, আর চারপাশের মানুষ ও সামগ্রিক বাস্তবতার দিক থেকে।

মতিন সাহেব বাসায় ফিরে স্ত্রী সুরমাকে প্রাত্যহিক কাজকর্মেই আবিষ্কার করলেন। কিন্তু অনেকদিন পরে ওঠা রোদটুকু ব্যবহারের জন্য যে গৃহিণী বেশি করে কাপড় ধোয়ার এনতেজাম করছেন, মতিন সাহেব অন্তত অংশত খেয়াল করেছেন, তার মন ও মর্জি অন্যদিনের মতো নয়। আর হুমায়ূনের পরোক্ষ বয়ানের সূক্ষ্মতায় পাঠকের মোটেই জানতে বাকি থাকে না, এখানেও হচ্ছে আরেক গেরিলা অভিযান- এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া গেরিলা যোদ্ধাটির কল্যাণ কামনায় রকমের মধ্যেই অন্যরকম এক সুরমাই পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। স্ত্রীর মনের অবস্থা বুঝতে না পারার উৎকণ্ঠা নিয়ে মতিন সাহেব ঢুকে পড়েন বাগানে। আর বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করেন, বাগানে বিস্তর ঝোপ-জঙলার মধ্যে তাদের চোখের সামনে অথচ মনোযোগের আড়ালে বেড়ে উঠেছে তাজা শাকসবজি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এদিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত পাননি তারা কেউ। খেয়ালও করেননি। অথচ একসময় কী ভীষণ চেষ্টাই না করেছেন এই ঊষর মাটিতে সবজি ফলানোর। নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর মাটি পরীক্ষার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন গাজিপুরের পরীক্ষাগারে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সে পরীক্ষা আর হয়নি। চেষ্টা তিনি ঠিকই চালিয়ে গিয়েছিলেন। এবারও রোপণ করেছিলেন নানা ধরনের বীজ। হয়তো ভেবেছিলেন, আগের মতোই নিষ্ফলা থেকে যাবে এ প্রাঙ্গণ। কিন্তু যুদ্ধের বিপর্যয়ের কালে তাদের সচেতন পরিচর্যার অভাবের মধ্যেই স্রেফ বর্ষার প্রশ্রয়েই সবজিচারাগুলো নিজ নিজ ঐশ^র্যে ফলবান হয়ে উঠেছে। একটু প্রযত্নের দরকার ছিল। বাগানটিকে ব্যবহার-উপযোগী করার প্রয়োজন ছিল। তাতেই প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে শোভিত হয়ে ওঠে বহুদিনের নিষ্ফলা এই বাগান। পরিচর্যাকারী মতিন সাহেবসহ বাগানটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নিকট-অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের এক চৌকষ প্রতীক। এই মতিন সাহেবদের মতো নিরীহ, ভীতু কিন্তু মরিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিত্রায়ণ ছাড়া কীভাবে সম্ভব আলমদের গেরিলা লড়াইকে চিহ্নিত করা। কীভাবে একটি যুদ্ধকে সর্বাত্মক গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রূপে আবিষ্কার করা যাবে?

হুমায়ূন অবশ্য এই ধরনের আবেগী সমর্থন আর দৈনন্দিনতার বিবরণীতেই তার মুক্তিযুদ্ধকে প্রতীকী মহিমায় শেষ করতে চাননি- আগুনের পরশমণিতেও নয়, অন্যত্রও নয়। আগুনের পরশমণিতে গেরিলা অপারেশনের যে নিখুঁত ছবি আছে, সেকালের ঢাকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় ছাড়া হয়তো তা কিছুতেই সম্ভবপর হতো না। গেরিলা অপারেশনের ব্যাপারে হুমায়ূনের আগ্রহের রাজনীতি আছে, এবং সেটা যে খুব গোপন কিছু তাও নয়। মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ হিসেবে দেখার বা দেখানোর একটা রেওয়াজ আছে।

অন্তত অংশত এ দাবি প্রায় যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই করা যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, ২৫ মার্চ কালরাতের অব্যবহিত-পরবর্তী প্রতিরোধ-লড়াই, সেক্টরভিত্তিক লড়াইয়ের বিবরণী, বিমান বা নৌবাহিনীর বিলম্বিত কিন্তু কার্যকর তৎপরতা, প্রবাসী সরকারের সফল রাজনীতি ও কূটনীতি, আর শেষের আন্তর্জাতিক সংযুক্তিসহ ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা- এই প্রভাবশালী বয়ানের ভাঁজে জনযুদ্ধের পরিসরটা ঠিক কোথায়? হুমায়ূনের বিবরণীতে এই পরিসর ভালোভাবেই তৈরি হয়েছে। তিনি যুদ্ধটাকে দেখেছেন গেরিলা যোদ্ধাদের দিক থেকে। তার বিপরীতে এঁকেছেন পাক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং হানাদার বাহিনীর ছবি।

এই যে গেরিলা তৎপরতার দিক থেকে যুদ্ধটাকে দেখা, তাতে মুক্তিযুদ্ধের দিক থেকে সামগ্রিকতার ঘাটতি যেন না হয়, কাঠামোগত পক্ষগুলো যেন বাদ না পড়ে, সেদিকে ঔপন্যাসিক হুমায়ূনের কড়া নজর ছিল। কাজটা তিনি করেছেন উপন্যাস-লেখকের খুব প্রাথমিক ধরনের এক কৌশল ব্যবহার করে। একটা বিশেষ অপারেশন এবং তার কুশীলবদের সম্ভাব্য কোনো এক তৎপরতাকে চিত্রিত-চিহ্নিত করতে গিয়ে হুমায়ূন প্রায়ই টেনে এনেছেন অন্য অনেক তৎপরতার খবর। তাতে বড় পরিসরটা ধরা পড়েছে। আর তার পটভূমিতে জনজীবনের কোল ঘেঁষে ঘটা বর্তমান গেরিলা তৎপরতার ছবিটা বেশ প্রগাঢ় মাত্রা পেয়েছে। ঠিক এখানেই হুমায়ূন খুব সাফল্যের সঙ্গে ওই কাজটি করেছেন, যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের উপস্থাপনায় অদ্যাবধি অনন্য বলে চিহ্নিত করেছি।

হুমায়ূন গেরিলা অপারেশনের প্রতিটি সদস্যকে আলাদা চরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের হিম্মৎ দেখিয়েছেন। কুশলী শিল্পী তিনি। নিছক শব্দ বাছাইয়ে আর ইঙ্গিতধর্মিতায় ঢুকে যেতে পারেন চরিত্রের অন্দরে। এই শক্তিতে ভর দিয়েই তিনি গেরিলা অভিযানে তৎপর একটি দলকে ব্যক্তি-স্বরূপে উপস্থাপনের সাহস করেন এবং ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরল সাফল্য দেখান।

হুমায়ূন গেরিলা যোদ্ধাদের পেশাদার হয়ে ওঠার কিছু মুহূর্ত জুতমতো এঁকে দেন। তাতে যুদ্ধের ব্যাকরণে অন্য অনেকের মধ্যে বদিউল আলম কেন গ্রুপ কমান্ডার হয়ে ওঠে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। একই দলে পরে যোগ দেওয়া আশফাক তার যাবতীয় নিবেদন ও বিশ^স্ততা সত্ত্বেও নিছক প্রশিক্ষিত পেশাদারিত্বের অভাবে ঘোরতর বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। আশফাকের ডেরার ওই বুড়ো কর্মী জহুর মিয়া আর আচমকা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অপারেশনে যেতে না পারার যন্ত্রণায় ছটফট করা রহমান- এরকম তরতাজা মুক্তিযুদ্ধ কোথায় পাওয়া যাবে?

যুদ্ধের কলাকৌশল ও বাস্তবতার দিক থেকে এর তাৎপর্য এই যে, ঘোরতর অনিশ্চয়তার মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধ পরিচালিত হয় বলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, তৎপরতার ছক বদলানো আর অন্যদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য বিধান অনেক বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। ফলে ব্যক্তির কর্তাসত্তার সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতির সার্বিকতার মেলবন্ধন গড়ে ওঠাই এ ধরনের যুদ্ধে সফল হওয়ার প্রাথমিক শর্ত। আগুনের পরশমণি এবং অন্য অনেক রচনার গেরিলাযুদ্ধে এমনটাই ঘটেছে। এরকম কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন অনেক অনেক উপস্থাপনাই হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি।