শিশিরে স্নাত হেমন্ত

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শিশিরে স্নাত হেমন্ত

আসমা চৌধুরী ২:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

print
শিশিরে স্নাত হেমন্ত

মিষ্টি মিষ্টি রোদ আর হিমেল বাতাস ভরা হেমন্ত মানেই যেন ভোর, হেমন্ত মানেই যেন জীবনের প্রত্যুষ, প্রত্যুষ মানেই কাঁচা সবুজ আর সোনার বরণ রোদের মাখামাখি। রুক্ষতা, ক্লান্তি, ক্লিষ্টতা, প্রতারণা আর পরাজয়ের প্রহার কাটিয়ে এমন জীবনই যেন চায় মানব মন। মুঠো মুঠো ঘোর লাগা আনন্দ, রিনিঝিনি বাতাসের ছন্দ। বর্ষা ও শরতের বৃষ্টির পরশছোঁয়া প্রকৃতি হেমন্তে খুলে ধরে সৌন্দর্যের অবারিত দ্বার। টুপটাপ শিশিরের ধ্বনিতে পল্লবিত ভোর, সোনার আলোর ঝালরে রাঙা দুপুর, স্নিগ্ধ হিরন্ময় বিকেল আর কুয়াশার পোশাক পরা না শীত না গরমের মায়াবী রাত। বকুল, শিউলি, ছাতিম, বকফুল রজনীগন্ধা ও কচি ঘাসের শিহরণ বয়ে যায় তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। ফুলে ফুলে নেচে বেড়ানো প্রজাপতির দলবাঁধা ওড়াউড়ি জাগ্রত হেমন্তের উজ্জ্বল ছবি- সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা দেশটির প্রকৃত রূপ পরিগ্রহ করে। কচুরিপানার বেগুনীতে ভরে ওঠা খাল, ডোবা, পুকুর যে সৌন্দর্য ছড়ায় তা হেমন্তেরই জয়গান।

হেমন্ত এলে কবির কলমে, শিল্পীর কণ্ঠে, চিত্রকরের তুলিতে ক্যানভাস চিত্রময় হয়ে ওঠে। মধ্যযুগের কবিগণের কলমে হেমন্ত ধরা দিয়েছে অপরূপ মূর্ছনায়। কবি কংকন মুকুন্দরাম চক্রবতী রচিত ‘কালকেতু’ উপাখ্যানে হেমন্তের নমুনা পরিদৃষ্ট হয়। কবির ভাষায় : ‘কার্তিক মাসেতে হয় হিমের প্রকাশ/যগজনে করে শীত নিবারণ বাস।’ মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতে বৈষ্ণব পদকর্তা লোচন দা পদে তার প্রকাশ ঘটেছে এভাবে- ‘অগ্রাণে নোতুন ধান্য বিলাসে।/সর্বসুখ ঘরে প্রভু কি কাজ সন্ন্যাসে।/পাটনেত ফোটে ভোটে শয়ন কম্বলে।/সুখে নিদ্রা যাও তুমি আমি পদ তলে’

বৈষ্ণব পদকর্তাগণের মধ্যে গোবিন্দচন্দ্র দাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার রচিত পদে তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ জীবনের নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। অঘ্রাণে কৃষাণ-কৃষাণির সমৃদ্ধি ও সুখের সময়ে কুলবধূরা স্বামীগৃহ থেকে পিতৃগৃহে নায়রে গমন করে। তার রচিত পদে উল্লিখিত : ‘আঘাণ মাস রাস রস সায়র/নায়র মাথুরা গেল।/পুর রঙ্গিনীগণ পুরল মনোরথ/বৃন্দাবন বন ভেল’

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় প্রকৃতি ও ঋতু বৈচিত্র্যের আবহ ফুটে উঠেছে বিচিত্র ভাব ও রঙিন আভায়। কবির আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনায়, গান ও কবিতায় আত্মা পরমাত্মার ধ্যান ও সাধনায় লৌকিকতা থেকে অলৌকিকতার মহারূপে আত্ম নিবেদিত হয়েছে সুর ও আরাধনায়। সেখানে হেমন্ত সেজেছে অপরূপতায়। কবির বাণীতে হেমন্ত ভেসে উঠেছে প্রশান্তির বিমূর্ত ছন্দ ও লালিত্যে- ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/রয়েছে পড়িয়ে শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

কবি নজরুল ইসলাম তার বিদ্রোহী সত্তার বাইরে নিটোল প্রকৃতি প্রেমী। তার কবিতায়ও ঋতু বৈচিত্র্য ও হেমন্তের জয়গানে মুখরিত- ‘হেমন্তের ঐ শিশির নাওয়া হিমেল হাওয়া/সেই নাচনে উঠল মেতে।/টইটুম্বুর ঝিলের জলে/ফাটা রোদের মানিক জ্বলে/চন্দ্র ঘুমায় গগন তলে/সাদা মেঘের আঁচল পেতে।’

হেমন্তে আবিষ্ট কবি জীবনানন্দ দাশ মিশে আছেন হেমন্তের আবহে, মিলনে, বিরহে। অনুভূতির গভীরতম অনুধ্যানে জীবনানন্দের কবিতা আমাদের মানসলোকে ব্যাপ্তি ও সৌন্দর্যের আলোকে প্রসারিত করে প্রাণ সম্ভার। কবির ভাষায়- ‘আমি এই অঘ্রাণেরে ভালোবাসি-বিকেলের এই রং-রঙের শূন্যতা/রোদের নরম রোম-ঢালু মাঠ-বিবর্ণ বাদামি পাখি-হলুদ বিচালি/পাতা কুড়াবার দিন ঘাসে ঘাসে কুড়ানির মুখে তাই নাই কোনো কথা,/ধানের সোনার কাজ ফুরায়েছে জীবনেরে জেনেছে সে কুয়াশায় খালি/তাই তার ঘুম পায়- ক্ষেত ছেড়ে/ দিয়ে যাবে এখনি সে ক্ষেতের ভিতর/এখনি সে নেই যেন ঝড় পড়ে অঘ্রাণের এই শেষ বিষণ্ন সোনালি।’

হেমন্ত শস্যের ঋতু, হেমন্ত সহ্যের ঋতু, হেমন্ত পরিতৃপ্তির আশ্চর্য ঢেকুর। সুফিয়া কামালের ‘হেমন্ত’ শীর্ষক কবিতা আজও সকল পাঠককে হেমন্তের অবারিত শস্য ও সৌন্দর্যের প্রাণ প্রবাহে জাগিয়ে তোলে- ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/কোন পাথারের ওপার থেকে/আনল ডেকে হেমন্তকে?’

এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকা তৈরির সময় ‘অগ্রহায়ণ’ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ব হয়। অগ্রহায়ণে ফসল ঘরে তোলা। বলা হয়ে থাকে, ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব ‘নবান্ন’। হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। পিঠা পায়েসের মৌতাতে সাড়া পড়ে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত পরিজন।

গাছিদের দা ও রসের হাড়ি চড়ে খেজুর গাছে আর রসের পায়েস ও ফিরনির উৎসব। রাত জেগে চিড়া কুটা উৎসব শুরু হয় হেমন্তের প্রহরে। মাঠ ভরে যায় সর্ষে ও মটরসুঁটির হলুদ সবুজ হাসিতে তেমনি গ্রামের খেলার মাঠে, চষা ও নাড়ার ক্ষেতে বৌচি দাঁড়িয়াবান্দা, ডাংগুলি ও গোল্লাছুটের কলকোলাহল। শীতের স্থবিরতা দিয়ে শুরু বসন্তের গুঞ্জরন, গ্রীষ্মের ধাবদাহ ও বর্ষার রাগিণী, শরতের পাঠ শেষে হেমন্তের জয়গান। চৈত্রের রুক্ষতা, গ্রীষ্মের ধাবদাহ, বর্ষার তলিয়ে নেবার পর জাগরণের মুক্ত পদক্ষেপ হেমন্ত। বলা যেতে পারে নিজেকে উজাড় করার মূর্ত আবেগ হেমন্ত।