হেমন্তের শেষ প্রহরে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

হেমন্তের শেষ প্রহরে

জীবনানন্দ ডেস্ক ২:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

print
হেমন্তের শেষ প্রহরে

হেমন্তের হাঁস
জহির হাসান

আমার হয়নি ধোয়া ওগো শিশিরের তলে
আমার হয়নি নাচা মিশি যাওয়া ঊর্মিদলে।
আমার মিটিনি নেশা অলিকোলে শোয়া বাকি
আমায় ঢালিনি মৌন নূর বধির জোনাকি!

 

আমারে চিনিয়া চিনে নাই হেমন্তের হাঁস
আমার পানের পাত্রে বাদ গেছে শ্যামা ঘাস।
হারানো বোনের টিপ তারার মতোন গুনি
যে ছাতিম ফোটায়নি ফুল তার কথা শুনি!
আমার ইউসুফ শোনে নাই ভাইদের শোকর
বকুল তলায় আসি হাঁপায় প্রকৃত ভোর!


জীবনের মুখোমুখি
বীরেন মুখার্জী

জীবনের মুখোমুখি বসে আছে জীবন- অঘ্রাণের রাতে;

আহা জীবন! নিরীক্ষায় গেঁথে রাখা চতুর প্রতিভা ছুঁয়ে
সোৎসাহে দৌড়াচ্ছি; নিশ্চুপ- বিমর্ষমুখ- অবনত;
কখনও ক্লান্তির প্রলম্বিত ছায়া পড়ছে নির্জন খেতের আলে
আবার, ডুবেও যাচ্ছে জীবিকার ঘ্রাণে; তবুও- দিনশেষে
দেখতে পাচ্ছি না নিবিড় শিল্পতরু তোমাকে, বঙ্গঋতুনাট্যে!

নিমগ্ন এই রাতের ভাঁজ খুলে, যদি উড়ে যায় দীঘল জীবন
জীবনের খোঁজে, পঞ্চমীর চাঁদ ছুঁয়ে মায়াবী বিষণ্ন হে-
নিষ্ফল উজিয়ে দাঁড়াতে অন্তহীন, ছুড়ে দিয়ে ধূসর প্রতীক!
ঘুরে ফিরে জীবন একই- প্রত্যাশাকাতর প্রত্যুষে;

রাইচ মিল
মীর রবি

আহা কী সুন্দর ভোর! আসমান থাই নামি আইচে চকচকা দিন, গাও ঠাণ্ডা করি দিচে মৃদু সমীরণ। মুই রবি কিইবা কই- মুজিব ইরম মোরে গোত্রঋণ করে। আউশ ক্ষেতের আইলে বসি- বিহান ব্যালাত জাগের গান ধরে, চোকে কাটে না ঘোর। ঘোরের মইদ্যে বেটি মাইনসের মুখ দেহি, চান্দের লাহান হাসে। শাড়ির আঁচল ঢেউ খেলিয়া ধান গাছেতে ভাসে।

কে বিছায়াছে কলাপাতার রঙ, আহ্লাদে মন সাঁতার কাটে- দেহের ভেত্রে ঢঙ। সঙ সাজিয়া ব্যালা ওঠে। কী সুন্দর আলো! আলো আলো করি নাচে ঘরের বিবিজন। দূর থাকি হাসি কয়, রাইচ মিলত হামাক বন্দক থোন!

 

পাখি উড়ছে হেমন্ত বাতাসে
ফারহানা রহমান

দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আমি কী দেখি?
একটি নৌকা;
আমি বসে আছি।
আর?
আর একটি নদী
চারদিকে পাহাড় নদীটিকে ঘিরে আছে
অসংখ্য মাছরাঙ্গা পাখি উড়ছে হেমন্ত বাতাসে
আমি খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছি!
আর?
আর একটি নিরাপদ জায়গা দিয়েছি ওদের
যা, আমার নেই...


পোস্টম্যানের অভ্যেসে, আমাকেও এনে দাও হেমন্ত
শুভ্র সরকার

(কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে)

ঝরে পড়া ফুলের কানে তোমাকে গুঁজে রেখে- শুকিয়ে যাচ্ছে হেমন্ত। অন্ধ ভিখারিনির শুধু ছুঁয়ে চিনে নেওয়া পয়সার মতো বিশ^স্ত হতে চেয়ে- গাছের ওই পাতায় জমা জলের মতো আমিও অতিরিক্ত কেউ। এ যেন, সন্তানের কাছে নিরুপায় পিতার মিথ্যে বলার নির্বিকার ভঙ্গিতে- আমায় তুমি রেখে গেছো। এবার হেমন্ত ফিরলে, তারপর আবার একসাথে বাড়ি ফিরব।

তবু কেন কাঠগোলাপের উঠোনে, পোস্টম্যানের রেখে যাওয়া চাকার দাগে
তোমাকে পাওয়া যায় না, যাচ্ছে না, আমার ভিতর-

হেমন্ত তোমার আয়না,
কিন্তু-
আমার তো দেখানোর মতো
মুখ নেই

তোমার চলে যাওয়ার থেকে ফিরে না আসা, অধিক হেমন্তের-


হেমন্ত-সংগ্রহ
আলোময় বিশ্বাস

একজন দেখেছিল কার্তিকের রঙ শালিখের পায়ে
দেখেছিল খড়ের গাদার ওপর অপরাহ্নের ফাঁকা হাহাকার
তেমন মানব বিঁধে আছে মৃত, অঘ্রাণের কপালের ভাঁজে।
শুধু কর্মহীন-পাঠক নিয়ে গেছে তার বুকের ভেতর হতে
ঝরে পড়া ধূসর-কবিতাগুলি।
এবারের হেমন্তও যেন সেরকম
মৃতেরা ভিড় জমিয়েছে জ্ঞান-প্রকোষ্ঠে, পথে, কারাগারে।
যদিও রাতে হিজলের ছায়া পড়ে পঞ্চমীর মাঠে
মৃত-আলো-রাত ভেসে আসে ধানসিঁড়ি জলে
চারপাশে সেইসব রাতে জাগে নীরব-কোলাহল
ইঁদুরের, বাদুড়ের, সাপের...

সদ্য-প্রয়াত প্রাণেরাও আসে রাতের অশ্রুভেজা মাঠে
যাদের ছুটির জীবন, ঘুম নেই, স্বপ্ন নেই,
নেই আঘাতচিহ্ন কোনো। অসমাপ্ত-আত্মা তারা
কোনো অবহেলা ছোঁয় না হৃদয় আর
আমাদের প্রতিদিনের ভালোবাসা-জীবনের মতো!
তারা শুধু হলুদ খামারে বসে, কান পেতে সেই কবি
শোনে অবেলার গান, মগজের কোষে কোষে ধরে রাখে
অন্ধ-সময়ের হেমন্ত-সংগ্রহ।