চলচ্চিত্র ও হীরালাল সেন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

চলচ্চিত্র ও হীরালাল সেন

হাসান হাবিব ১:১১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

print
চলচ্চিত্র ও হীরালাল সেন

বর্ণ লেখার আগে মানুষ ছবি এঁকেছিল, তার আগে ছবি নিয়ে কল্পনা করেছে, স্বপ্ন দেখেছে। একদিন এই কল্পনা এবং স্বপ্নকে প্রকাশ করার জন্য মানুষ ছবি আঁকলেন ঠিকই- সেটি যন্ত্রস্ত এবং বহুদর্শী হলো হাজার বছর পরে। এ সময় সেই কল্পনা এবং স্বপ্নকে মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে না রেখে বিলিয়ে দিল অপার জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি ও দার্শনিক বিচারের জন্য। আর সেটিকে আমরা হয়তো বললাম চলচ্চিত্র।

এ মাধ্যমটি ভারত উপমহাদেশে ফরাসিরা যখন আমদানি করেছিল তখন এটিকে ‘শতাব্দীর বিস্ময়’ বলা হয়েছিল। এ ‘বিস্ময়’ ভারতীয়দের জন্য এসেছিল নন্দন শিল্পের এক অনবদ্য মাধ্যম হিসেবে। এই মাধ্যমটি ইউরোপে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বিকাশ লাভের বছর কয়েকের মধ্যেই ভারতে আগমন ঘটে। আসলে ইংরেজ শাসন ভারত উপমহাদেশকে যেমন পরাধীন করে তেমনি ব্যবসার ‘কহিনূরে’ এ উপমহাদেশটি এক সময় হয়ে পড়ে ‘সেলুলয়েডের’ কেন্দ্রবিন্দু।

১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই ভারত উপমহাদেশে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় আগস্ট লুই বোম্বের ওয়াটসন হোটেলে প্রথম ‘অ্যারাইভাল অব আ ট্রেন’ দিয়ে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু করেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন- ১৮৯৬ সালকে ভারতে চলচ্চিত্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রারম্ভের সময় বললেও তার আগে অর্থাৎ ১৮৯৪ থেকে ৯৫ সালের মধ্যে এখানে গতিময় প্রতিচ্ছবি নিয়ে পথিকৃৎ নিরীক্ষা হয়েছিল। যাকে ‘সমবারিক খরলিকা’ বা ‘যাদুর চেরাগ’ বলে অবিহিত করা হয়। জানা যায়, মহাদেও পট্রবর্ধন ও তার দুই পুত্র মিলে দুটো রঙিন প্লেটকে তিনটি স্লাইড প্রক্ষেপকের মধ্য দিয়ে প্রক্ষিপ্ত করে গতির বিভ্রম সৃষ্টি করে প্রদর্শনীর অয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার সঙ্গে পৃথক বর্ণনা ও সঙ্গীতের মাধ্যমে একটি গল্প বাধা হয়েছিল।

গতিময় প্রতিচ্ছবির চলচ্চিত্রের যাত্রাটি ইউরোপিয়ানদের হাতে শুরু হলেও ভারতীয় আবেগপ্রবণ হরিশচন্দ্র শখারাম ভাটভাদেকারদের মোহাচ্ছন্নতায় তা হয়ে ওঠে এদেশীয় নন্দনতত্ত্বের উপনিষদ; যা ভারতীয় ‘সাবিত্রীদের’ও গহনের ‘মিনিয়েচারে’ পৌঁছে। যদিও হরিশচন্দ্র শখারাম ভাটভাদেকারের ২১ মুদ্রার ক্যামেরার সঙ্গে উঠে আসে পালোয়ানদের কুস্তি প্রতিযোগিতা (দি রেসলার) অথবা বানর খেলার দৃশ্য (ম্যান অ্যান্ড মাঙ্কি)। এই ঐতিহাসিক রেঁনেসার উৎসারণে তৈরি হয় বাংলার হীরালাল সেন, যাকে বলা হয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জনক। মূলত হীরালাল সেনের চলচ্চিত্রক চিন্তাটি সে যুগের একটি নতুন উদ্ভাবনী ও উচ্চতর শৌখিন আকাক্সক্ষার প্রতিফলন বলা যায়। তবে হীরালাল সেনের এ ধরনের চিন্তার পরিসাধক হিসেবে কাজ করে তার ঐতিহ্যিক পরিবার ও পরিম-ল। হীরালালের দাদা গোকূলকৃষ্ণ সেন ছিলেন মানিকগঞ্জের বিখ্যাত জমিদার ও উকিল। হীরালালের বাবা চন্দ্রমোহন সেন ছিল গোকূলকৃষ্ণ সেনের যোগ্য উত্তরসূরি, যিনি ঢাকা কোর্টের উকিল নিযুক্ত হন। চন্দ্রমোহন বিয়ে করেন দিনাজপুরের বিখ্যাত সেরেস্তাদার শ্যাম চাঁদের মেয়ে বিধুমুখীকে। এই বিখ্যাত পরিবারেই জন্ম নেন হীরালাল সেন।

তরুণ হীরালালের পারিবারিক প্রতিপত্তি, সাংস্কৃতিক পরিম-লই তাকে আলোকচিত্র প্রীতিকে উৎসাহিত করে। এ বাড়িতে আয়োজন হতো কবিগান, কীর্তন, নৃত্য, সঙ্গীত চর্চা, পূজা ইত্যাদি। এখানে বলে রাখা ভালো যে, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লোকগাথা সংগ্রাহক ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন ছিলেন হীরালাল সেনের পিসতুতো ভাই ও সহপাঠী।

কিশোর বয়সে দীনেশ চন্দ্র সেন বনজুরি গ্রামে কাগজ কেটে রাম বনবাসের চিত্র তৈরি করে লন্ঠনের আলো ও কাপড়ের সাহায্যে ‘ছায়াবাজি’ খেলা দেখাতেন। তার এ ‘ছায়াবাজি’ যদিও ‘স্টার্ক ন্যাচারালিস্টিক লাইটিং’ থেকে অনেক দূরে, তবু এটিকে বলা যায় চলচ্চিত্রের আদি-আন্তিক ‘ভিজ্যুয়াল সেন্স’।

পরবর্তীকালে আমরা উপমহাদেশের যে চিত্রবিদ্যা, ফটোগ্রাফি, বায়োস্কোপ হীরালাল থেকে পেয়েছিলাম, সেটির অনুপ্রেরণা ছিল এই দীনেশ চন্দ্র সেনের ‘ছায়াবাজি’ খেলা। এ বিষয়ে হীরালাল সেন বলেছেন, ‘এই ঝোঁকের মূলে তুমি (দীনেশ চন্দ্র সেন), তুমি যে আমাকে লইয়া ছবি আঁকিতে, সেই সময় ইহার সূত্রপাত, তুমি যেদিন ছায়াবাজি দেখাইয়াছিলে, সেদিন যে আমার মনে যুগ উল্টিয়ে গিয়াছিল, তাহা তোমায় বলি নাই। কিন্তু সেই ছায়াবাজি দেখার কথা কৈশোর জীবনে প্রতিদিন আমার মনে পড়িয়াছে উহাই এই রয়াল বায়োস্কোপের ভিত্তি।’ এখানে স্পষ্ট যে, এই উপমহাদেশে ইউরোপিয়ানদের দ্বারা ১৮৯৬ সালে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কথা বলা হলেও এ বিষয়ে হীরালালের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়, তারও আগে।

এ সম্পর্কে গবেষক অনুপম হায়াত উল্লেখ করেছেন, ‘হীরালাল সেন যখন আলোকচিত্র চর্চা ও ব্যবসায়ে প্রসার লাভ করেন তখন ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিসে বায়োস্কোপ বা চলচ্চিত্র প্রদর্শন চালু হয়েছে।’ এ কারণেই, ১৮৯৬ সালে ভারত উপমহাদেশে ইউরোপিয়ানদের দ্বারা প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পরে হীরালাল সেনের ১৮৯৮ সালে কলকাতায় ‘রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠাকে তার ‘বায়োস্কোপিক’ মূল ভিত্তি না বলে তার ‘এইচএল সেন অ্যান্ড ব্রাদার্স : অমরাবতী ফাইন আর্ট অ্যাসোসিয়েশন’-কে ইউরোপিয়ানদের ‘যন্ত্রপাতির’ বায়োস্কোপিক রূপান্তর বলাটাই সমীচীন হবে। কারণ ১৮৯৬ সালে বোম্বের ওয়াটসন হোটেলের ‘শতাব্দীর বিস্ময়’ বায়োস্কোপ যখন (একই সালে) কলকাতার স্টার থিয়েটারে ইংরেজ স্টিফেন দেখাল, হীরালাল সেটি দেখে সেই বায়োস্কোপের যন্ত্রপাতি ইউরোপ থেকে জোগাড় করলেন এবং ১৮৯৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে ‘এইচএল সেন অ্যান্ড ব্রাদার্স : অমরাবতী ফাইন আর্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর বায়োস্কোপিক রূপান্তরটির নাম হলো ‘রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি’।

অবিভক্ত ভারতের কলকাতা ছিল শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। ফলে সহজে ধারণা করা যায়, ১৮৯৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হীরালাল সেনের কলকাতার ‘রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা ছিল মানিকগঞ্জের বনজুরি গ্রাম থেকে আগত ‘এইচএল সেন অ্যান্ড ব্রাদার্স : অমরাবতী ফাইন আর্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর উৎকর্ষতার দ্বিতীয় রূপ। তার আগেই তিনি ঢাকা বা মানিকগঞ্জেই ছায়াবাজির ‘বায়োস্কোপিক’ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন সন্দেহ নেই।

এই সালেই তিনি ভোলার এসডিওর বাংলোতে বায়োস্কোপ দেখান। তার তোলা স্থির চিত্র ভারতীয় শিল্প ও কৃষি প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক লাভ করে। এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, হীরালাল সেনের ‘মুভি শটে’ ১৯০১ সালে অমরেন্দ্র নাথ, নৃপেন্দ্র বসু, কুসুম কুমারী (প্রথম চিত্র নায়িকা), প্রমদা সুন্দরীদের অভিনয় যখন ভ্রমর, আলী বাবা, হরিরাজ, দোল লীলা, যুদ্ধ, সীতারাম ইত্যাদি উঠে আসে তখন ভারতের প্রতিবেশী চীনে মাত্র অপেরা অথবা মঞ্চাভিনেতারা ‘টিং-চুন মাউনটেন’-এ দাঁড়িয়ে ছিল (এমনকি চীনা চলচ্চিত্রের অ্যান হুর বিখ্যাত ‘শ্যাডো ম্যাজিকে’র মাধ্যমে জানা যায়, ১৯১১ সালের আগের একটি পটভূমি- যেখানে একজন বিদেশি বেইজিং এসে শুরু করেন ছায়াবাজি, যা চীনাদের কাছে ছিল একেবারে নতুন। চীনে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় ভারত উপমহাদেশের কিছুটা পরে; সেটি ‘টি হাউসে’ ১৮৯৬ সালের ১১ আগস্ট)।